রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়াকে বারো পাতার ফর্ম ভরতে হয়। অন্নপূর্ণা ভান্ডারে দীর্ঘ ও জটিল আবেদনপত্র পূরণ করতে গিয়ে নাকাল হচ্ছেন মহিলারা। অধিকাংশই দ্বারস্থ হচ্ছেন কোনও দালালের, দরিদ্রের প্রাপ্য সুবিধার নাগাল পেতে টাকা খসাতে হচ্ছে। এই হয়রানি আরও বড় এক অন্যায়ের প্রতি ইশারা করছে। মহিলাদের বিশেষ আর্থিক অনুদানের জন্য যে সব প্রকল্প চালু হয়েছে সারা ভারতে, সেগুলির লক্ষ্য সামাজিক ন্যায়। তার মূলে রয়েছে এই উপলব্ধি যে পরিবার ও রাষ্ট্র মেয়েদের বেতনহীন গৃহশ্রমের যথেষ্ট মর্যাদা দেয় না। মেয়েদের হাতে খরচ করার মতো যথেষ্ট টাকা না থাকলে মেয়েদের তথা পরিবারের অত্যাবশ্যক নানা চাহিদা পূরণ হয় না, ফলে শেষ অবধি ঘাটতি থেকে যায় দেশের উন্নয়নে। মেয়েদের অনুদান প্রকল্পের পিছনে এই হল নৈতিক এবং অর্থনৈতিক যুক্তি। ‘অন্নপূর্ণা ভান্ডার’-এর আবেদন প্রক্রিয়াতেই সামাজিক ন্যায়ের লক্ষ্য ব্যাহত হল কি না, সে প্রশ্ন উঠছে অনেক দিক থেকে। প্রথমেই আসে পরিবারের প্রাধান্য-র কথা। ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পে আবেদনকারী মহিলাকে এক জন স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল। চাকরি, পেনশন, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, স্বাস্থ্যসাথী প্রভৃতি সরকারি সুবিধা, প্রভৃতি যত তথ্য চাওয়া হয়েছিল, সব মহিলার ব্যক্তিগত তথ্য। ‘অন্নপূর্ণা ভান্ডার’ সেখানে ‘পরিবারের প্রধান’-এর সঙ্গে আবেদনকারী মহিলার সম্পর্ক জানতে চেয়েছে। পরিবারে কে প্রধান, কে অপ্রধান, তা নির্ধারিত হবে কী উপায়ে? মহিলাদের ক্ষমতায়নের একটি প্রকল্প সমাজে সাবেক পিতৃতন্ত্র-অনুসারী চিন্তার উপর ফের দাগ বোলাচ্ছে। এই ক্ষতি কেবল টাকার অঙ্কে পূরণ হওয়ার নয়।
আবেদনপত্রে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের আধার নম্বর, এবং প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর, পেশা, চাকরি জানতে চাওয়া হয়েছে। পরিবারের জমি, জমির পড়চা, রেজিস্ট্রেশনের কপি চাওয়া হয়েছে। বাড়িতে ক’টি ঘর, পাকা ঘর কি না, চার চাকার গাড়ি রয়েছে কি না, তা-ও জানাতে হচ্ছে। তথ্য চাওয়ার এই আতিশয্য হল অন্যায়ের দ্বিতীয় দিক। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা দেওয়ার জন্য আবশ্যক শর্ত অবশ্যই রাজ্য সরকার নির্ধারণ করতে পারে, সে অধিকার সরকারের রয়েছে। কিন্তু সেই তথ্য হতে হবে প্রকল্পের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এক জন মহিলা সরকারি অনুদান পাওয়ার যোগ্য কি না, তার বিচার করতে গিয়ে পরিবারের প্রতিটি মানুষের আয়ের আন্দাজ চাইছে রাজ্য সরকার, চাইছে পারিবারিক সম্পদের হিসাব। তা থেকে কী বোঝা যাবে? পরিবার তার সম্পদ মেয়েদের সঙ্গে ভাগ করে নেয় না বলেই মেয়েদের জন্য বিশেষ সরকারি অনুদানের প্রকল্প চালু করতে হয়েছে। পরিবারের সম্পদের তথ্য এ ক্ষেত্রে কতটা অর্থপূর্ণ, কেনই বা? কী হবে সেই মেয়েদের, যাঁরা পরিবার-পরিত্যক্ত, অথবা যাঁদের পরিবারের সদস্যরা তথ্য দিতে রাজি নয়? আবেদনপত্রে এক-একটি বাড়তি শর্ত বঞ্চনার এক-একটি মাত্রা হয়ে দেখা দিতে পারে। তেমনই, কত শিশুর টিকাকরণ হয়েছে, সে তথ্য সংগ্রহের নির্ধারিত উপায় রয়েছে সরকারের হাতে। কেন ফের মেয়েদের থেকে তা দাবি করা হচ্ছে? তথ্যও সম্পদ, সুনির্দিষ্ট উপযোগিতা না থাকলে নাগরিকের কাছে তা চাইতে পারে না সরকার।
সর্বোপরি রয়েছেন সেই সাড়ে পাঁচ লক্ষ মহিলা, এসআইআর-এ যাঁদের নাম বাদ পড়েছে। এঁরা সকলেই বহিরাগত, অ-নাগরিক নন অবশ্যই। অনেকের পারিবারিক নথিপত্রে নানা অসম্পূর্ণতা, অসঙ্গতি থেকে গিয়েছে। আবার, সব নথিপত্র জমা দেওয়া সত্ত্বেও অনেক মেয়ের নাম ওঠেনি— পরিবারের অন্যরা স্থান পেয়েছেন, কেবল এক জন বাদ পড়েছেন। দরিদ্র, প্রান্তিক এই মেয়েদের সরকারি সহায়তার বাইরে রাখলে সামাজিক ন্যায়ের লক্ষ্য কী ভাবে পূরণ হবে? অসহায়কে অকারণে শাস্তি না দিয়ে, অন্নপূর্ণা ভান্ডারে এঁদের অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া খুঁজে বার করুক রাজ্য সরকার।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)