E-Paper

অপরাধের আড়ালে

সাম্প্রতিক ঘটনায় জানা গিয়েছে, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের এক জন নিয়মিত ‘ক্রাইম থ্রিলার’ দেখত। খুন করার পদ্ধতিটিও সে শিখেছে সেখান থেকেই।

শেষ আপডেট: ১১ জুন ২০২৬ ০৮:২৪

নদিয়ার হস্টেলে সম্প্রতি যে হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে, তাকে নিছক ‘খুন’ বললে ঘটনাটির প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন করা যাবে না। যে ভাবে পরিকল্পনা করে ঠান্ডা মাথায় বছর ছয়েকের শিশুটিকে খুন করা হয়েছে, তা শুনলে পরিণত মস্তিষ্কের অপরাধী বলে ভ্রম হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা অপ্রাপ্তবয়স্ক, সেই হস্টেলেরই উঁচু ক্লাসের শিক্ষার্থী। প্রসঙ্গত, ২০১২ সালে দিল্লির গণধর্ষণ কাণ্ডে নাবালক অপরাধীর ভূমিকা দেশবাসীকে স্তম্ভিত করেছিল। তার পরিপ্রেক্ষিতে জনরোষের চাপে পূর্বের আইনটিকে সরিয়ে জুভেনাইল জাস্টিস (কেয়ার অ্যান্ড প্রোটেকশন অব চিলড্রেন) অ্যাক্ট, ২০১৫ প্রবর্তিত হয়। এই আইনে বলা হয়েছিল, নৃশংস অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত নাবালকের বয়স যদি ১৬ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে হয়, তবে তার বিচার এক জন প্রাপ্তবয়স্কের মতোই করা যাবে। প্রকৃতিগত দিক থেকে এই দু’টি ঘটনা সম্পূর্ণ পৃথক, নিঃসন্দেহে। সাম্প্রতিক ঘটনাটির ক্ষেত্রে অপরাধের ধরন, অভিযুক্তের মানসিকতা, হত্যার প্রকৃত কারণ, এ সবের উত্তর পাওয়া এখনও বাকি। কিন্তু সে সবের বাইরে যে কথাটি ভাবায়, তা হল— অপ্রাপ্তবয়স্করা কোন পারিপার্শ্বিক পরিবেশ দ্বারা চালিত হয়ে এ-হেন ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটাতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে।

সাম্প্রতিক ঘটনায় জানা গিয়েছে, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের এক জন নিয়মিত ‘ক্রাইম থ্রিলার’ দেখত। খুন করার পদ্ধতিটিও সে শিখেছে সেখান থেকেই। অস্বাভাবিক নয়। কিশোর-কিশোরীদের কাছে নেট-দুনিয়ার আকর্ষণ অত্যধিক বেশি, এবং প্রায়শই তারা মোবাইলে কী দেখছে, তার উপর অভিভাবকদের কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকে না। বয়ঃসন্ধির সংবেদনশীল মুহূর্তগুলিতে উপযুক্ত নজরদারির অভাব তাদের বিপথে চালিত হওয়ার সম্ভাবনাটিকে বৃদ্ধি করে। বিশেষজ্ঞরা এই কারণেই মোবাইলের অবাধ ব্যবহারে লাগাম টানার কথা বলেন। কিন্তু শুধুমাত্র নেট-আসক্তিকেই এ-হেন অপরাধের একমাত্র কারণ ভাবলে তা অতি সরলীকরণ হবে। খুনের পদ্ধতি সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হলেও খাতায়-কলমে তার প্রয়োগের ইচ্ছাটি স্বাভাবিক নয়। এই অ-স্বাভাবিকতার পিছনে এই সমাজের দায় অনেকখানি। সমাজের প্রতিটি স্তরে বর্তমানে হিংসার আজ বাড়বাড়ন্ত, সামান্য অজুহাতে মাত্রাতিরিক্ত অসহিষ্ণুতা প্রদর্শন, একটু অ-মিল হলেই ব্যক্তিগত আক্রমণ, কুকথা, শারীরিক নির্যাতন এখন দৈনন্দিনতায় পরিণত। বড়দের আচরণ দেখেই ছোটরা শিক্ষালাভ করে।

তদুপরি, প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন হস্টেলের পরিবেশ বিষয়েও। পরিজন, পরিবার ছেড়ে দূরে থাকা এমনিতেই এক ধরনের নিরাপত্তাবোধের অভাব সৃষ্টি করে ছোটদের মনে। সেই শূন্যতাকে পূরণ করার জন্য যে শিশুবান্ধব পরিবেশ থাকা প্রয়োজন, ক’টি হস্টেলে তেমন আছে? যে হস্টেলে একটিমাত্র ঘরে বিভিন্ন বয়সিকে একত্রে রাখার ব্যবস্থা থাকে, সেখানকার পরিবেশকে কি আদৌ শিশুবান্ধব বলা চলে? স্কুলপড়ুয়াদের সাহায্যার্থে প্রতিটি স্কুলে কাউন্সেলর রাখার প্রয়োজনীয়তা বহু আলোচিত। সেই কার্যকর ব্যবস্থাও কি সর্বত্র আছে? শিক্ষার্থীরা কোন পরিস্থিতিতে যেন তেন প্রকারেণ আবাসিক স্কুল ছাড়তে চায়, খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। নয়তো আগামী দিনে হস্টেলের বন্ধ দরজার আড়ালে আরও বহু অপ্রীতিকর ঘটনা অপেক্ষায় থাকবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Nadia

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy