E-Paper

মান ও রক্ষা

পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পরে পুরনো নানা মামলায় এবং তোলাবাজি, অত্যাচার-সহ ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে একাধিক নেতাকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। সে কাজটি যেমন সঙ্গত, পুলিশের হাতেই অভিযুক্তদের মর্যাদাহানিও ততটাই অসঙ্গত।

শেষ আপডেট: ১০ জুন ২০২৬ ০৭:৫৮

একটা সময় ছিল, যখন পুলিশকে বলা হত শান্তিরক্ষক। শান্তি ও সুরক্ষার সঙ্গে সামাজিক শৃঙ্খলা ওতপ্রোত— সমাজে যখন কোনও ঘটনা ঘিরে বিশৃঙ্খলার পরিস্থিতি তৈরি হয়; যখন কোনও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অনেক মানুষ উত্তেজিত ও মারমুখী হয়ে ওঠে, আইন নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে নিজেরাই বিচার করতে চায়— পুলিশ সেই উত্তেজনা প্রশমিত করে, আইন ভঙ্গ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে সামাজিক স্থিতি ফেরাবে— এমনটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের নানা জায়গায় পুলিশের যে রূপ চোখে পড়ছে তা স্বস্তিদায়ক নয়। অভিযুক্তের কোমরে দড়ি ও হাতকড়া পরিয়ে, অনেক ক্ষেত্রে অন্তর্বাস-পরা অবস্থাতেই তাঁকে রাস্তায় হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে থানায় বা আদালতে, কিংবা অপরাধমূলক ঘটনার পুনর্নির্মাণে— অগণিত মানুষের চোখের সামনে। প্রশ্ন উঠছে, অভিযুক্ত মাত্রেই যে অপরাধী নয়, বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকারশাস্ত্রের এই সারসত্যটি পুলিশ ভুলছে কী করে।

পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পরে পুরনো নানা মামলায় এবং তোলাবাজি, অত্যাচার-সহ ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে একাধিক নেতাকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। সে কাজটি যেমন সঙ্গত, পুলিশের হাতেই অভিযুক্তদের মর্যাদাহানিও ততটাই অসঙ্গত। অভিযুক্তকে হাতের সামনে পেয়ে জনতার ‘চোর চোর’ ধ্বনি বা ডিম, ঢিল, জুতো ছোড়া যে তাদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ তা নিয়ে সন্দেহ নেই, সেই বহিঃপ্রকাশ বিশৃঙ্খলায় পর্যবসিত হলে তার প্রশমনও পুলিশেরই দায়িত্ব— কিন্তু পুলিশ নিজেই উত্তেজিত জনতার সামনে দিয়ে অভিযুক্তকে কোমরে দড়ি বেঁধে বা হাফপ্যান্ট-গেঞ্জি পরিয়ে ঘোরাবে, এই ঘটনা কখনওই অভিপ্রেত নয়। লক্ষণীয়, পুলিশের এমন কাজ ও আচরণের বিরুদ্ধে কলকাতা হাই কোর্টে হওয়া জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে মাননীয় বিচারপতিদের ডিভিশন বেঞ্চ বলেছে, পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে পারে, আইন মেনে তাঁর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতে পারে, কিন্তু গ্রেফতারের নামে ইচ্ছাকৃত ভাবে অভিযুক্তদের সম্মানহানি করতে পারে না। পাশাপাশি রাজ্য মানবাধিকার কমিশনও আদালতে অভিযোগ দায়ের করেছে, অভিযুক্তের সঙ্গে এহেন আচরণের পিছনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তদন্তও করছে।

অভিযুক্তই হোক বা নিরপরাধ, নাগরিকের সঙ্গে পুলিশের আচরণের বিরুদ্ধে জনমনে যে বিস্তর অভিযোগ, তা নিয়ে কি পুলিশ কখনও ভাবে? কিংবা, প্রশাসনের অন্য অঙ্গগুলির মতোই পুলিশেরও আসল দায়িত্ব যে নাগরিকের ‘রক্ষা’য় কাজ করা, তা নিয়ে? মানবাধিকার রক্ষাও এই ‘রক্ষণ’-এর এক অবিসংবাদিত অঙ্গ: কোনও নাগরিক যদি অপরাধমূলক কাজে অভিযুক্ত হয়ে অন্য অগণিত সহনাগরিকের ক্ষোভের মুখে পড়েন, এমনকি সেই ক্ষোভ যদি সঙ্গতও হয়, তখনও পুলিশের দায়িত্ব পাল্টে যায় না। অভিযুক্ত মাত্রেই অপরাধী নয়, এবং গণতান্ত্রিক ভারতরাষ্ট্রের সংবিধানে অভিযুক্ত ও অপরাধীর মানবাধিকারও সমভাবে স্বীকৃত, এই সত্য মনে রেখে পুলিশকে কাজ করতে হবে— উত্তেজিত জনতার ক্রোধের অংশীদার বা সদ্য-ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের দলদাস হিসেবে নয়। নয়তো আজ যাকে কোমরে দড়ি বেঁধে ঘোরানো হচ্ছে, কাল আইন ও বিচার তুড়িতে উড়িয়ে তাকে এনকাউন্টারে নিকাশ করাও এ-বঙ্গে ‘নিয়ম’ হয়ে দাঁড়াবে, যেমন দেখা যাচ্ছে অন্যত্র।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Police West Bengal government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy