• অলখ মুখোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

কৃত্তিবাসের রামকথা

কৃত্তিবাসের পরে রচিত বাংলা রামায়ণে সহস্রবদন রাবণকে হত্যা করলেন করালবদন সীতা। রাম প্রণাম করলেন সীতাকে। আজ শেষ পর্ব।

Durga
গঙ্গা দিয়ে আসছে আর একটি নৌকা। বয়ে আনছে দুর্গার মূর্তি।অঙ্কন: কুনাল বর্মণ।

যে নৌকাটি ভাড়া করেছিলেন জয়গোপাল, তার ছই বেশ পোক্ত। গঙ্গার বাতাস, সৌন্দর্য চোখ জুড়িয়ে দেয়। অমল শরৎ। তর্কবাগীশ এসেছেন ঘাটে। জয়গোপাল কয়েক দিন থাকবেন না, তাঁর মন খারাপ। কোনও বিচ্ছেদ সহ্য করতে পারেন না এই মহাশয় পণ্ডিত। দু’জনে বসে রয়েছেন ঘাটের পাশে। গঙ্গা দিয়ে আসছে আর একটি নৌকা। বয়ে আনছে দুর্গার মূর্তি। কলকাতাও সেজে উঠছে আসন্ন দুর্গোৎসবের জন্য। বড়লোকেদের নাটমন্দিরে সমারোহ হবে। তর্কবাগীশ বললেন, ‘‘ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ভুল বলেননি। ‘কলিকাতা কমলালয়’-এ যে লিখেছেন, ‘যেসকল লোক দুর্গোৎসব করেন তাহাকে ঝাড় উৎসব, বাতি উৎসব, কবি উৎসব, বাই উৎসব, কিম্বা স্ত্রীর গহনা উৎসব ও বস্ত্রোৎসব বলিলেও বলা যায়।’ পরে ব্যঙ্গের কথা বললেও, এটাই বুঝি ভবানীচরণের মনের কথা হে!’’ 

তর্কবাগীশ বলে উঠলেন, ‘‘আচ্ছা, কৃত্তিবাসেই তো রয়েছে, রামের দুর্গাপুজোর সময়ে সেই ষষ্ঠী থেকে রোজ নৃত্যগীতের আসর বসেছিল। তাই গোড়া থেকেই দুর্গাপুজোর সঙ্গে সমারোহ সম্পৃক্ত রয়েছে বলো!’’ তার পরে তর্কবাগীশ জয়গোপালকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘কৃত্তিবাস দুর্গাপুজোর কথাটা পেয়েছিলেন কী করে? তোমার কী ধারণা?’’ জয়গোপাল বললেন, ‘‘তা হলে জানতে হবে, দুর্গাপুজো নিয়ে কৃত্তিবাস কী কী পড়ে থাকতে পারেন।’’ 

তর্কবাগীশ সাগ্রহে তাকালেন। জয়গোপাল বললেন, ‘‘বৈদিক সাহিত্য তো বটেই। মার্কণ্ডেয় পুরাণ, সেখানে দেবীমাহাত্ম্য যদি কিছু পরেও যুক্ত হয়ে থাকে, তা হলেও তা কৃত্তিবাসের অনেক আগে। কৃত্তিবাস চণ্ডীর মাহাত্ম্য খুব ভাল জানতেন। চণ্ডীর মন্ত্রশক্তির উপরে তাঁর খুব ভরসাও ছিল। যে কারণে, তাঁর কাব্যে হনুমান গিয়ে চণ্ডীর অক্ষর চেটে দিয়ে আসে। তার পরে, গড়ুর পুরাণে দুর্গার পূজাবিধি মেলে, অগ্নি পুরাণে গৌরীপ্রতিষ্ঠা, গৌরীপূজার কথা রয়েছে, তা কৃত্তিবাস নিশ্চয়ই পড়েছিলেন। কালিকাপুরাণ, বৃহন্নন্দিকেশ্বর এবং ভবিষ্যপুরাণও তিনি অবশ্য পড়েছিলেন। এ বার দেখো, রাম নিজে দুর্গার মূর্তি নির্মাণ করে পুজো করেছিলেন। দুর্গার এই প্রতিমা তৈরি করে পুজো করার কথা রয়েছে মিথিলার বাচস্পতি মিশ্রের ‘ক্রিয়াচিন্তামণি’ এবং ‘বাসন্তীপূজাপ্রকরণ’ গ্রন্থে। বাচস্পতি সম্ভবত কৃত্তিবাসের সমসাময়িক অথবা সামান্য আগে। বাচস্পতির রচনা কৃত্তিবাসের জানার কথা। তা ছাড়া, কৃত্তিবাসের বহু পূর্বেই শূলপাণি ‘দুর্গোৎসববিবেক’, ‘বাসন্তীবিবেক’ ও ‘দুর্গোৎসব-প্রয়োগ’ লিখেছিলেন, যেমন শূলপাণির সমসাময়িক জীমূতবাহন লিখেছিলেন ‘দুর্গোৎসব-নির্ণয়’। কৃত্তিবাস এ সব পড়েননি, তা হতে পারে না। তিনি যে ব্যাস, বশিষ্ঠ, চ্যবনের মত শিক্ষকের শিষ্য।’’

জয়গোপাল সহাস্যে তর্কবাগীশকে বললেন, ‘‘তবে একটা কথা, কৃত্তিবাসে রামের সামনে দেবী একা এসেছিলেন। কিন্তু বিদ্যাপতির ‘দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী’-তে ‘কালীবিলাসতন্ত্র’-এ কার্তিক, গণেশ, জয়া-বিজয়া (লক্ষ্মী-সরস্বতী), দেবীর বাহন সিংহ-সহ শারদীয়া পূজার বিবরণ মেলে। তাই তুমি ঠিকই বলেছো, দুর্গাপুজোর সঙ্গে সমারোহ বহু কাল থেকেই লেগে রয়েছে।’’

কিন্তু কথা সেখানেই শেষ নয়। বাংলা দেবীদের দেশ। জয়গোপাল বললেন, ‘‘তাই কৃত্তিবাস যখন দেবীর নানা নাম ব্যবহার করছেন, তখন বেশ একটি শৃঙ্খলা ধরে এগোচ্ছেন। তিনি খুব সচেতন ভাবে কখন কোন নাম ব্যবহার করবেন, তা ঠিক করে রেখেছিলেন।’’ তিনি ব্যাখ্যা করলেন, রাম-রাবণের যুদ্ধের শুরুতে দেখা যায়, দেবী ‘পার্বতী’ শিবের সঙ্গে কোন্দল করছেন। তিনি রাবণের পক্ষে। শিব বলছেন, বিধির বিধান তিনি বদলাতে পারবেন না। কিন্তু মহীরাবণের পূজিতা দেবী ‘মহামায়া’, যিনি মহীরাবণকে হত্যায় সাহায্য করছেন হনুমানকে। যুদ্ধের মধ্যে ব্যাকুল রাবণ যখন বুঝলেন, শিব তাঁকে ছেড়ে গিয়েছে, তিনি ‘অম্বিকা’র স্তব করলেন। সেই স্তবে তিনি দেবীকে যে যে নামে ডেকেছেন, সেগুলো হল, ‘কোথা মা তারিণি-তারা হও গো সদয়। দেখা দিয়ে রক্ষা কর মোরে অসময়।। পতিতপাবনি পাপহারিণি কালিকে। দীন-জননি মা জগৎ-পালিকে।।’ এই স্তবে ‘আর্দ্র হৈল হৈমবতীর মন উচাটন।’ এ বার ‘হৈমবতী’ নামটি কৃত্তিবাস সযত্নে রক্ষা করছেন। রাবণ রথে চড়ে যুদ্ধে গেলেন, ‘স্তবে তুষ্টা হয়ে মাতা দিলা দরশন। বসিলেন রথে, কোলে করিয়া রাবণ।।’ এ বার কৃত্তিবাস দেবীর রূপবর্ণনা করছেন, ‘অসিত-বরণী কালী কোলে দশানন। রূপের ছটায় ঘন তিমির নাশন।। অলকা ঝলকা উচ্চ কাদম্বিনী কেশ। তাহে শ্যামরূপে নীল সৌদামিনী বেশ।।’ রাম সেই রূপ দেখে হতবাক। তখন রাম ‘দেখিলেন রাবণের রথে হৈমবতী।। বিস্ময় হইয়া রাম ফেলে ধনুর্ব্বাণ।’

জয়গোপাল বললেন, ‘‘এর পরেই এল অকাল বোধনের কথা, ‘দেখিয়া রামের চিন্তা চিন্তে দেবগণ।। এ সময়ে হৈমবতী কি করিলা আর। দেবারিষ্ট বিনাশে ব্যাঘাত চণ্ডিকার।। বিধাতারে কহিলেন সহস্রলোচন। উপায় করহ বিধি যা হয় এখন।। বিধি কন বিধি আছে চণ্ডীআরাধনে। হইবে রাবণ বধ অকাল-বোধনে।। ইন্দ্র কন কর তাই বিলম্ব না সয়। ইন্দ্রের আদেশে ব্রহ্মা করিবারে যায়।। রাবণ বধের জন্য বিধাতা তখন। আর শ্রীরামের অনুগ্রহের কারণ।। এই দুই কর্ম্ম ব্রহ্মা করিতে সাধন। অকালে শরতে কৈলা চণ্ডীর বোধন।।’’’ 

তর্কবাগীশের কথায়, ‘‘অর্থাৎ, এখনও পর্যন্ত, মহেশ্বরী, পার্বতী, তারা, হৈমবতী, অম্বিকা এবং কালী রাবণের পক্ষে। রামের দিকে কেবল মহামায়া।’’ জয়গোপাল বললেন, ‘‘কিন্তু ব্রহ্মা রামকে বললেন, ‘অকালে বোধন করি পূজ দেবী মহেশ্বরী...।।’ মহেশ্বরীকে দলে টানতে এর পরে আসছে দুর্গার নাম। ‘পূজি দুর্গা রঘুপতি করিলেন স্তুতি নতি বিরচিল চণ্ডীপূজা সার।।’’’ জয়গোপাল বললেন, ‘‘এর মধ্যে ‘বিরচিল চণ্ডীপূজা সার’ কথাটা খেয়াল করো। এটা কৃত্তিবাসের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বাক্য।’’

তর্কবাগীশ বলেন, ‘‘বস্তুত, দেবী একটি শক্তিপুঞ্জ। যার সাহায্য রাম ও রাবণ দু’জনেই নিচ্ছেন। শক্তিপুঞ্জ বলেই দেবীর এত নাম, এত পরিচয়। সেই বহু পরিচয়কে কৃত্তিবাস একটি শৃঙ্খলায় ধরে বিন্যস্ত করতে চাইছেন।’’

দুই পণ্ডিত ভাবলেন, এই বার রাম দেবীর স্তবে দেবীকে কী কী নামে ডাকছেন, তার একটি তালিকা করা যাক, ‘শ্রীরাম করেন স্তব দেবী চণ্ডিকারে।। দুর্গে দুঃখহরা তারা দুর্গতি নাশিনী। দুর্গমে শরণি বিন্ধ্যাগিরি নিবাসিনী।। দুরারাধ্যা ধ্যানসাধ্যা শক্তি সনাতনী। পরাৎপরা পরমা প্রকৃতি পুরাতনী।। নীলকণ্ঠপ্রিয়া নারায়ণী নিরাকারা। সারাৎসারা মূলশক্তি সচ্চিদা সাকারা।। মহিষমর্দ্দিনী মহামায়া মহোদরী। শিব সীমন্তিনী শ্যামা সর্ব্বাণী শঙ্করী।। বিরূপাক্ষী শতাক্ষী সারদা শাকম্ভরী। ভ্রামরী ভবানী ভীমা ধূমা ক্ষেমঙ্করী।। কালীহ কালহরা কালাকালে কর পার। কুলকুণ্ডলিনী কর কাতরে নিস্তার।। লম্বোদরা দিগম্বরা কলুষনাশিনী। কৃতান্তদলনী কাল ঊরু বিলাসিনী।। ইত্যাদি অনেক স্তব করিলা শ্রীহরি।’ তাতে, ‘তুষ্টা হৈলা হৈমবতী অমর ঈশ্বরী।।’ 

তর্কবাগীশ হাঁফ ছেড়ে বললেন, ‘‘ওই তোমার হৈমবতী রামের পক্ষে ফিরল।’’ জয়গোপাল হেসে বললেন, ‘‘তোমার মনে পড়বে, ইন্দ্র ঋগ্বেদের বিখ্যাত যুদ্ধে বশিষ্ঠকে নিজের দলে টেনেছিল, এ যেন তেমনই।’’

এর পরে পদ্ম দিয়ে দেবীকে সন্তষ্ট করার পরে আরও একটি স্তব রয়েছে। তাতে এ বার নতুন কিছু নাম যুক্ত হচ্ছে, ‘ঈশানী ইন্দ্রাণী ঈশ্বরী... বগলা... দাক্ষায়ণী।।’’ জয়গোপাল বললেন, ‘‘এমন কড়ায় গন্ডায় নামের হিসেব রাখাটা নিশ্চয় খুব বড় কাজ। তবে আমার স্থির বিশ্বাস, এই সব নাম একা কৃত্তিবাসের নয়।’’

জয়গোপাল পাড়ের নৌকার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘‘আমার খুব করে মনে হয়, রাবণ না হয় রামের হাতে বধ হলেন, কিন্তু রামও নিষ্প্রভ হলেন দেবীর কাছে। রাম নিজেও যে বলছেন, ‘হের মা পার্ব্বতী, আমি দীন অতি, আপদে পড়েছি বড়। সর্ব্বদা চঞ্চল পদ্ম-পত্র-জল, ভয়ে ভীত জড়সড়।।’ এমন কথা উত্তর ভারতের কোনও রাম বলবেন না হে তর্কবাগীশ। রামের মহিমাকে কাজে লাগিয়ে দুর্গাকে জিতিয়ে দিলেন কৃত্তিবাস অথবা তাঁর নামের আড়ালে প্রচ্ছন্ন আরও অনেক কবি।’’ 

একটু থমকালেন জয়গোপাল। তার পরে বললেন, ‘‘কৃত্তিবাসের পরে বাংলায় যে রামায়ণ লেখা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে রামের চেয়ে দেবীর পরাক্রম বেশি। কাশীরাম দাসের সমসাময়িক জগৎরাম রায়ের কথা মনে করো। বাঁকুড়ার ভুলুইতে বসে তিনি রামায়ণ লিখেছিলেন। পরে তিনি রামের শরৎকালের দুর্গাপুজো অবলম্বনে ‘দুর্গাপঞ্চরাত্রি’ নামে একটি খণ্ডকাব্য লেখেন। তার ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমীর কথা লিখে ছেলে রামপ্রসাদকে নবমী ও দশমীর বিবরণ লিখতে বলেছিলেন।’’ জয়গোপাল বললেন, ‘‘আশ্চর্যের কথা হল, এই জগদ্রামী রামায়ণে সীতা সহস্রবদন রাবণকে বধ করেছেন। দশগ্রীবকে হত্যার পরে এই সহস্রবদন রাবণের কথা সীতাই সবাইকে জানিয়েছিলেন। রাম সেই রাবণকে হত্যা করতে গেলেন। সঙ্গে গেলেন সীতা। যুদ্ধে রাম এই রাবণের বাণে মূর্ছিত হয়ে পড়লেন। তাই দেখে সীতা ‘ত্যাগ কল্য নিজ মূর্ত্তি : দীর্ঘ জংঘা হল্যা মহাকালী।। হইলা বিকটাকর : ঘোর রূপা খরস্বরা : কোটরাক্ষি ভীমা মুণ্ডমালী ।।  অস্থির কিংকিনী জুতা : চতুর্ভুজা হল্যা সীতা ...ঘূর্ণিত হইছে নেত্র : কোপে কাঁপে সর্ব্বোগাত্র : ঘর্ঘর শব্দ ঘোর ধ্বনি।  কোটি সূর্য্য জিনি ছটা : ব্রহ্মাণ্ড ভেদিল জটা... মহিসুুতা মহাকায়া করাল বদনা। বিকট বদনা চক্র ভ্রমিত লোচনা।। প্রলয় মেঘের রব জেন ঘোর ধ্বনী। পদভরে পৃথ্বি হছ্যে পাতালগামিনী।। বিকট আকার হল জনক নন্দিনী।... হিহিহিহি করিয়া করেন অট্টহাস। সন সন ঝড় হেন নাসার নিশ্বাস।।’ তাঁর কোপে ‘রাবণের স্কন্ধে হত্যে মুণ্ড সব পড়ে। কালে পাকা তাল ভাদ্রে জেন পড়ে।।’’’ তর্কবাগীশ স্তব্ধবাক।

জয়গোপাল বললেন, ‘‘কৃত্তিবাসের সীতা কলার বাগুড়ির মত কাঁপে। আর এই সীতার রূপ দেখো। ‘প্রভু রামে দিব্যচক্ষু দিয়া নারায়ণী। পরম ঈশ্বর রূপ ধরেন আপনি।।’ তখন সীতাকে ‘প্রণমিয়া রামচন্দ্র কন প্রিয় বাণী। ভয়ঙ্করী বেশ ত্যেজ জনক নন্দিনী।।... মহাভয় হয় এই আকৃতি দেখিয়া।। পতিরে প্রসন্ন হৈয়া পরম প্রকৃতি। উগ্রবেশ ত্যাজি হৈলা পূর্বের আকৃতি।।’’’

যাওয়ার সময় এল। জয়গোপালের নৌকা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। তর্কবাগীশ অবাক হয়ে দেখলেন, ঘাটের পথ ছেয়ে রয়েছে অজস্র পদচিহ্নে। কিন্তু সব চিহ্নগুলোই যেন এক রকম।  

 

অঙ্কন: কুনাল বর্মণ)

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন