বর নাই কনে নাই, তবু ব্যান্ড পার্টি দামামা বাজাইয়া গেল— মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অননুকরণীয় খেদোক্তিটির মধ্যে কিন্তু অনেকখানি প্রকৃত বিস্ময়ের উপাদান আছে। মুখ্যমন্ত্রী বা রাজ্য সরকারের কেহ, কিংবা হাইকোর্টের কোনও প্রতিনিধি ছাড়াই, কেবল প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত বলিয়াই যে কলিকাতা হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চের উদ্বোধন হইয়া যেতে পারিল, তাহার একমাত্র কারণ এখন চারি দিকে ভোটঋতুর প্রকোপ। কে কী করিতেছে, তাহার হিসাব এখন কেবল কত প্রতিদ্বন্দ্বীকে টেক্কা দেওয়া গেল সেই নিরিখে। হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চ যে প্রধানমন্ত্রীর মহিমা প্রচারের বিষয় নয়, দস্তুরমতো প্রাদেশিক বিচারবিভাগের বিষয়, তাহাও তাই বিস্মৃত হইবার উপক্রম হইল। বর্তমান ভারতে শাসন, বিচার সকল প্রতিষ্ঠানই এই ভাবে দ্রুত দলীয় প্রচারের বিষয় হইয়া উঠিতেছে। সরকারি কোষাগার দলীয় প্রচারের জন্য উন্মুক্ততর হইতেছে। কেন্দ্রে রাজ্যে সর্বত্র সরকারের জায়গায় ছড়ি ঘুরাইতেছে রাজনৈতিক দল। ভুলাইয়া দেওয়া হইতেছে যে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সরকার আসলে দলোর্ধ্ব অস্তিত্ব হইবার কথা ছিল। প্রায় সব দলই এই অপরাধে অপরাধী। তবু নরেন্দ্র মোদীর কথা আলাদা ভাবে না বলিয়া জো নাই। এত নিয়মিত ভাবে তিনি সরকারি সম্পদ ব্যবহার করিয়া নিজের ও দলের আক্রমণাত্মক প্রচার সারিয়া চলিয়াছেন, যাহার নিদর্শন বলিতে গেলে দুই হাতের কর গনিয়া শেষ হইবে না। প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর একটি গুরুতর উদাহরণ। রাষ্ট্রের প্রধান প্রশাসক বিদেশে গিয়া প্রতিদ্বন্দ্বী দলের নিন্দামন্দে অধিক সময় ব্যয় করিতেছেন, ইহা কেবল অশোভন নহে, চূড়ান্ত অনৈতিক। তাহার সঙ্গে যোগ দিয়াছে সরকারি প্রকল্পগুলির বিজ্ঞাপনে প্রধানমন্ত্রীর অনিঃশেষ গুণগান। 

সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন একটি মামলার প্রাথমিক মতামত হিসাবে বহুজন সমাজবাদী পার্টির নেত্রী মায়াবতীকে সরকারি কোষাগারের টাকায় নিজের দলের প্রতীক হাতির মূর্তি ও সঙ্গে অসংখ্য নিজের মূর্তি প্রতিষ্ঠার শাস্তি হিসাবে এই কাজের সমুদয় ব্যয়ভার বহনের কথা শোনা গেল। বিষয়টি গুরুতর। বিএসপি যতই হাতির বৃহত্তর গুরুত্বের কথা মনে করাইয়া দিক, কেন যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রাণীর মধ্যে হাতিকেই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতী বাছিয়া লইয়াছিলেন মূর্তি প্রতিষ্ঠার কাজে, বুঝিতে অসুবিধা হয় না। ইহা কেবল অনৈতিক নহে, আইনগত ভাবে অপরাধ। সুপ্রিম কোর্ট তাহাদের চূড়ান্ত রায়ে এই বার্তা দিলে তাহা ভারতীয় রাজনীতিতে দৃষ্টান্তযোগ্য ঘটনা হইয়া থাকিবে। 

মূর্তি প্রতিষ্ঠা ছাড়াও নেতানেত্রীর মূর্তি ও অবয়বকে অন্য নানা ভাবে কাজে লাগাইবার ব্যবস্থা বিষয়েও ভাবা জরুরি। এই যেমন, চলচ্চিত্র উৎসবে চলচ্চিত্রের পরিচালকবৃন্দ অপেক্ষা মুখ্যমন্ত্রীর ছবি কেন বেশি থাকিবে, ইহাও ভাবিতে হইবে বইকি। ‘বেশি’র মাত্রাটিও এ ক্ষেত্রে বিচার্য। মুখ্যমন্ত্রীর একটি-দুইটি ছবি থাকা, আর সমস্ত শহরের রাস্তাঘাট ছবিতে ঢাকিয়া দেওয়া, রবীন্দ্রনাথ নজরুল বিবেকানন্দ সুভাষচন্দ্র সকল নামের সঙ্গেই উদ্দিষ্ট ব্যক্তির ছবির জায়গায় মুখ্যমন্ত্রীর ছবিটিকে বেশি প্রকট করিয়া দেখানো, এই সব কিছুই শোভনতা ও নৈতিকতা দুইয়ের সীমা অনেক দিন অতিক্রম করিয়া গিয়াছে। যে কোনও সামাজিক বা প্রশাসনিক কাজে এখন নেত্রীর ‘অনুপ্রেরণা’ শতসহস্র বার উল্লিখিত হয়, স্থানীয় নেতার বদান্যতার দিকেও বহু বার দৃষ্টিআকর্ষণ করা হয়। তবে পশ্চিমবঙ্গ একাকী নহে। দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি এ ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক বলা চলে, এবং বিজেপি-শাসিত উত্তর ও মধ্য ভারতের রাজ্যগুলি তাহাদের নবোত্থিত প্রতিদ্বন্দ্বী। সব মিলাইয়া ভারতীয় রাজনীতি এই মুহূর্তে একটি আত্মবিজ্ঞাপনের বিকারে আচ্ছন্ন, আত্ম-ও দল- মহিমার প্রচারে সীমাবিদারণকারী। মায়াবতীর হাতি-সঙ্কট সেই বিকারটির প্রতিকার-আলোচনার একটি অবকাশ আনিয়া দিল।