Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৭ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

অন্নপূর্ণার পায়ে ভরসা খুঁজব, না বিশ্বস্ত থাকব নিজের প্রতি

আত্মপতনের বীজ

কৌশিক সেন ২০ মে ২০১৮ ০০:০০

কবিতার কথা’ বলতে গিয়ে জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন, ‘‘ভিড়ের হৃদয় পরিবর্তিত হওয়া দরকার, কিন্তু সেই পরিবর্তন আনবে কে? সেই পরিবর্তন হবে কি কোনো দিন? যাতে তিন হাজার বছর আগের জনসাধারণের কিংবা আজকের এই বিলোল ভিড়ের মতো জনসাধারণ থাকবে না আর?...’’

ভিড় ভালও বাসে, ভিড় এক জন শিল্পীকে মাথায় তুলে প্রাপ্যের চেয়েও বেশি মর্যাদা দেয়। তা হলে সেই ভিড়কে এত সন্দেহের চোখে দেখা কেন? বহু বছর পর আর এক কবি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, এক জন কবির কাছে সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ‘জনরুচি’। শঙ্খ ঘোষ মহাশয়ের এই লেখাও আমাদের সংশয়ে ফেলে দেয়— সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত, তাঁদের ভাল লাগার কি তবে কোনও মূল্য নেই? কোনও সন্দেহ নেই আমরা যখন ‘সাধারণ মানুষ’ শব্দটা উচ্চারণ করি, তখন বহু ক্ষেত্রেই ‘সাধারণ’ শব্দটার যথার্থ মানেটা তলিয়ে ভাবি না। কখনও আমার কবিতা, নাটক, গান, চিত্র— এই সব ‘সাধারণ মানুষ’-এর সমাদর পাচ্ছে মনে করে অপার্থিব আনন্দে বুঁদ হয়ে থাকি, আবার সেই সৃষ্টি ‘সাধারণ’-এর দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হলে গভীর হতাশায় সেই ‘ভিড়’কে অন্য অর্থে, নিন্দার্থে, ‘সাধারণ’ বলে গাল পেড়ে জ্বালা জুড়াই।

আসলে সাধারণের বা অসাধারণের সংস্পর্শে আসাটাই একটি কবিতা বা একটি পেন্টিং বা একটি নাটকের একমাত্র ভবিতব্য নয়। অবশ্যই এক জন শিল্পীর সমঝদারের প্রয়োজন, কিন্তু সেই ‘রসিকজন’কে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াবার চেয়ে বড় ভুল আর কিছুতে হতে পারে না। একটি সৃষ্টি যত তুচ্ছই হোক, তা সৃষ্ট হয় এমন একটা নিষ্পাপ তাড়না থেকে যে, শেষ পর্যন্ত তা কত জন গ্রহণ করলেন, কত জন বর্জন করলেন, সেই হিসেব গৌণ হয়ে পড়ে। সন্দেহ নেই বাজারের পর্যালোচনায় ব্যর্থতার জ্বালা বড়ই যন্ত্রণাদায়ক। তা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। কিন্তু আমার ভাবনা, আমার উদ্দেশ্য, সাফল্য-ব্যর্থতা সম্পর্কে আমার মূল্যায়নের কোনও গুরুত্বই নেই। ‘বাজার’ সেই সবের তোয়াক্কা করে না। ফলে ‘ভিড়’কে নিয়ে সংশয়ও বাড়তে থাকে। বুঝে উঠতে পারি না ‘ভিড়’-এর চরিত্র। বুঝে উঠতে পারি না দর্শক পরিপূর্ণ প্রেক্ষাগৃহ মানেই কি সাফল্য? না, যেখানে ভিড়, সেখানেই সবটা ‘তরল’ হয়ে গেল, যেন বেশিসংখ্যক মানুষের আগমন মানেই সরস্বতীর মুখ ভার।

Advertisement

জীবনানন্দ লিখেছেন, ‘‘যদি কোনো শেষ বৈকালিক ইন্দ্রজালে আজকের এই সভ্যতার মোড় ঘুরে যায়, তা হলে কবিকে কিছুই করতে হবে না আর। তার নিজের প্রতিভার কাছে তাকে বিশ্বস্ত থাকতে হবে শুধু কতিপয়ের হাতে তার কবিতার দান অর্পণ করে; যে কতিপয় হয়তো ক্রমে ক্রমে বেড়েও যেতে পারে।’’

অর্থাৎ নিশ্চয়তা নেই। যে দেশে প্রতি মুহূর্তে ক্ষমতা, টাকা, লোভের কুৎসিত উল্লাস সেখানে আমার গান কবিতা নাটক ইত্যাদির যথার্থ মূল্যায়ন কার্যত অসম্ভব, তাই এ নিয়ে মনের ভিতর তিক্ততা পুষে রাখা অনুচিত। তবু তো শিল্পীরাও মানুষ। হতাশা, ব্যর্থতার জ্বালা, সমাজের একটা বড় অংশের প্রত্যাখ্যানের মন-খারাপ-করা বোধ নিয়ে কী ভাবে বেঁচে থাকবে সে? কী ভাবে আঁকবে, গাইবে, লিখবে, অভিনয় করবে?

জীবনানন্দ লিখছেন, এই সব সময়ে এক জন প্রকৃত শিল্পী চলে যাবেন ‘‘প্রকৃতির সান্ত্বনার ভিতরে— সেই কোন আদিম জননীর কাছে যেন, নির্জন রৌদ্রে ও গাঢ় নীলিমার নিস্তব্ধ কোনো অদিতির কাছে...।’’

ভিনসেন্ট ভ্যান গখ-এর আঁকা ছবি যখন লোকে কিনছে না, মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, তাঁর একটা ক্যানভাসও কোথাও কল্কে পাচ্ছে না, হুহু করে বিকোচ্ছে ক্লদ মোনে-র আঁকা সৃষ্টিগুলো, সেই সময়েতেও শিল্পী আশ্রয় নিচ্ছেন প্রকৃতির মাঝে। ভাই থিয়োকে একটি চিঠিতে লিখছেন শিল্পী,
‘‘...প্রকৃতির সঙ্গে বেশ কিছুকাল যুদ্ধ করার পর, আমি অনুভব করেছি, ‘সে’ আমার কাছে ধরা দিচ্ছে, শুনছে সে আমার কথা। গভীরে ঢুকে আমি বুঝতে পারছি, প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই নয়, তাকে জয় করতে হয় হৃদয় দিয়ে, কারণ প্রকৃতি সত্যিই অননুভবনীয়...।’’

সমাজের মূলস্রোত এই সব মানুষকে তাঁদের সময়কালে বুঝতে পারেনি, বুঝে অথবা না বুঝে নিদারুণ অবহেলা করেছিল। তবু জীবনানন্দ লেখেন কবিকে যেতে হবে শহরে, বন্দরে, জনতার স্রোতের ভিতর। ভ্যান গখ এঁকে চলেন খনিশ্রমিকদের ক্লান্ত পরিশ্রান্ত পদক্ষেপ, আলুচাষিদের জীর্ণ, ক্ষুধার্ত মুখ, এঁকে চলেন গমখেত আর রোদ্দুরের রূপকথা।

আর আমরা যারা অতীব সাধারণ নাট্যকর্মী, আমরা ভয় পাই, যখন আমাদের শহরে বসে, এই সময়ের সবচেয়ে প্রজ্ঞাবান মানুষ, অসামান্য কবি শঙ্খ ঘোষকে অসম্মান করে ‘ক্ষমতা’। ক্ষমতা কী সুচতুর ভাবে তার নানান মুখগুলোকে ঠিক ঠিক সময়ে সামনে এগিয়ে দেয়! শঙ্খ ঘোষকে আক্রমণ করে ক্ষমতার এমন একটা মুখ যাকে পরবর্তী সময় বলে দেওয়া যাবে, ‘আরে ও তো এমন বলেই থাকে, ওকে এত গুরুত্ব দেওয়া কেন?’ গুণীর অসম্মানও হল, সবাইকে সতর্ক করাও হল, অথচ এমন একটা ভাব করা হল, যেন ব্যাপারটা অতীব সামান্য। কতকগুলো দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা-নেত্রী যখন প্রকাশ্যে টাকা নিয়ে মানুষের সামনে ধরা পড়ে, আর তাদের গুন্ডাবাহিনী ‘চক্রান্ত হচ্ছে’ বলে রাজপথে আন্দোলন করে শহরটায় শোরগোল ফেলে দেয়, তখন শঙ্খ ঘোষের অসম্মানে আমরা এই রাজ্যের সাংস্কৃতিক কর্মীরা কী করতে পারি? পাল্টা স্লোগান? মিছিল? প্রেস কনফারেন্স? পাল্টা গালাগাল?

কিছু কাল আগে অমর্ত্য সেনকেও অসম্মান করেছিলেন আর একটি রাজনৈতিক দলের নেতা। তসলিমা নাসরিন আজও এই শহরে ঢুকতে পারেন না। এত দীনতা নিয়ে কী ভাবে চলবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড? ‘ভিড়’ চুপ করে আছে, ‘ভিড়’ ভোট দিতে পারলেই খুশি, ‘ভিড়’ জড়ো হচ্ছে উৎসবে, আইপিএল ক্রিকেট-সার্কাসে, বইমেলায়, খাদ্যমেলায়, ‘ভিড়’ শাস্তি দিচ্ছে প্রেমিকপ্রেমিকাদের, ‘ভিড়’ সিনেমা দেখছে, ‘ভিড়’ সিরিয়াল দেখে চোখের জলে ভাসছে, ‘ভিড়’ ভাবছে আজকের দিনটা পার করে দিতে পারলেই অনেক।

‘ভিড়’ যে শুধু ক্ষমতার পক্ষে থাকা মাছির মতো ভনভন করে তা নয়, ‘বিরোধী স্বর’-এরও একটা ‘ভিড়’ আছে। শাসক যেমন চায় তার পক্ষ নিয়েই গলা ফাটাক ‘ভিড়’, উল্টো দিকে বিরোধিতারও একটা ছক-কাটা এক্কা-দোক্কা খেলার উঠোন আছে। সেই ‘ফেসবুক’ নামক ছক-কাটা উঠোনের ‘ভিড়’ বিরোধিতার ভাষা অন্য রকম হলেই মেঘের আড়াল থেকে তির ছুড়তে শুরু করে দেয়। কোনও সন্দেহ নেই বামফ্রন্টের বিরোধিতায় যে বিশিষ্ট জনেরা প্রকাশ্যে আন্দোলন করেছিলেন, এখন তাঁদের অনেকেরই হিরণ্ময় নৈঃশব্দ্য খুবই লজ্জার, কিন্তু যখন দেখি তাঁদের ঠিক ভাবে সমালোচনা করার বদলে কিছু মানুষ সেই সব বিশিষ্ট জনের যাবতীয় গুণাবলি অস্বীকার করে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেন, তখন বুঝতে পারি শাসকের বাঁধাধরা বুলির যে হিংস্রতা, তার উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে বিরোধী কণ্ঠস্বরেরও একটা বাঁধা গৎ আছে, এবং সেটাও ভয়ঙ্কর। সেই ‘ভিড়’টাও অতীব বিপজ্জনক।

আমিও— এক সতর্ক, অক্ষম নাট্যকর্মী, ভাবছি ভিড়ে ভিড়ব কি না, অন্নপূর্ণার পায়ের কাছে বসে ভরসা খুঁজব কি না— সন্তানের দুধেভাতে থাকার ভরসা। তবু তো জীবনটা শেষমেশ ‘গমখেত’ আর ‘রোদ্দুরের গল্প’। একটা পাগলামো, একটা অস্থিরতা তবু তো আমাদের তাড়া করে বেড়ায়, নিয়ে যেতে চায় ভিনসেন্ট-এর কাছে, কিংবা দন কিহোতে-র কাছে— যখন দিনকর অনেক আগেই অস্তমিত, লা-মান্‌চার অলিন্দ, চত্বর অন্ধকারাবৃত, তখন দন কিহোতে সেই দুর্যোগে প্রহরারত। যে দন কিহোতে বিশ্বাস করে নিজেকে বলে, ‘‘তুমি যা, তাকে ভালবেসো না, তুমি যা হতে পারো, তাকেই ভালবাসো...।’’

সকল সাংস্কৃতিক কর্মীর সঙ্গে আমার কথা ভাগ করে নেওয়ার স্পর্ধা আমার নেই, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে থাকা সাধারণ-অসাধারণ নাট্যশিল্পী ও কর্মীদের বলতে পারি ভরসা করে, প্রকাশ্যে প্রতিবাদ, মিছিল না করুন, ক্ষমতার অলিন্দের ভিতরে দাঁড়িয়েও জেগে থাকা যায়, অস্বীকার করা যায় বাস্তবকে। অন্তত প্রতিরোধ তো একটা গড়ে তোলাই যায়। যে শঙ্খ ঘোষ যে কোনও রঙের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কবিতা লিখেছেন, অসুস্থ শরীরে মিছিলে হেঁটেছেন, তাঁর বিরুদ্ধেও— স্বার্থে ঘা পড়লেই— যারা হিংস্র দাঁতনখ বার করেছে, সেই ‘ক্ষমতাবান’রা আমাদের ভরসা হতে পারে না। অতীতেও ছিল না, বর্তমানেও নয়, ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসার জন্য যারা উঠেপড়ে লেগেছে, তারাও না।

আমাদের ভরসা জোগায় আমাদেরই কাজ, তা সে যত সামান্যই হোক না কেন। নিজের প্রতিভার কাছে বিশ্বস্ত থেকে, নিজের বিশ্বাসের কাছে দায়বদ্ধ থেকে গিয়ে দাঁড়াতেই হবে কোনও মহৎ সৃষ্টির সামনে— সেটা হতে পারে কোনও কবিতা, কোনও নাটক, কোনও একটা ছবি, কোনও একটা গান— যা আমার চেয়ে অনেকটা বড়, যার নাগাল পেতে গেলে কেটে যেতে পারে একটা গোটা জন্ম। ক্ষমতার সঙ্গে গাঁটছড়া ছিন্ন করতে না পারলে শিল্পীর বাঁচা অসম্ভব। শঙ্খবাবুর ভাষাতেই বলা যায়, ‘‘...চেতাবনি ছিল ঠিক, তুমি আমি লক্ষই করিনি/ কার ছিল কতখানি দায়/ আমরা সময় বুঝে ঝোপে ঝোপে সরে গেছি/ শৃগালের মতো/ আত্মপতনের বীজ লক্ষই করিনি।’’

আরও পড়ুন

Advertisement