×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

০৮ মে ২০২১ ই-পেপার

প্রধানমন্ত্রিত্ব নিয়ে বিবাদ বিরোধী ঐক্যের যাত্রা ভঙ্গ করতে পারে

আশায় বুক বাঁধার মরসুম

জয়ন্ত ঘোষাল
১৫ অগস্ট ২০১৮ ০০:২৮

ছোটবেলায় দাদামশায়ের সঙ্গে স্টার থিয়েটারে এক মজার নাটক দেখেছিলাম: আমি মন্ত্রী হব। মনে পড়ে, শুরুতেই ছিল, বিছানায় ঘুমোচ্ছেন অভিনেতা জহর রায়। স্ত্রী ঘুম ভাঙাতেই তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, গিন্নি, এত মধুর স্বপ্নটা ভেঙে দিলে? মন্ত্রী হয়েই গিয়েছিলাম, আর একটু পরেই শপথ নেওয়ার কথা! এ দেশের বহু রাজনেতারই অবস্থা এখন জহর রায়ের মতো।

ভারতের বিপুল জনসমাজের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক কৌতূহল: কৌন বনেগা প্রধানমন্ত্রী? আবার নরেন্দ্র মোদী? না কি রাহুল গাঁধী? মমতা? মায়াবতী? চন্দ্রবাবু? পওয়ার? দেবগৌড়া?

২০১৪ সালের ভোটটা মোদী আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মতো করে করলেও, ৬৫ বছর ধরে এ দেশে যে ভোটপর্ব চলেছে তা কিন্তু মূলত সংখ্যার লড়াই। বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যা যে দল বা জোট অর্জন করে, সেই দল বা জোট প্রধানমন্ত্রী ঠিক করে। তা হলে? সংখ্যাই শেষ কথা? ন্যায় অন্যায়? ঠিক বেঠিক? সংখ্যার প্রভুত্বে সে-সবই নিরুদ্দিষ্ট হয়? মহাভারতে কৌরবের ছিল অনেক বেশি সেনা, পাণ্ডবদের হাতি ঘোড়া সৈন্য অঙ্ক কষে অনেক কম। কিন্তু ন্যায়ের প্রশ্নে জিতেছিল পাণ্ডবরা!

Advertisement

২০১৯-এর ভোটে কী হবে?

প্রাথমিক পরিস্থিতিটা জানাতে দুটো কথা বলব। ২০১৪’য় মোদীর পক্ষে যে ঝড় ছিল সেটা আজ আর নেই। আর্থিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে চাকরিবাকরি নেই। দলিত আর চাষিরা বিদ্রোহ করছে নানা রাজ্যে। কিন্তু এত কিছুর পরেও মোদীর জনপ্রিয়তা নেই, এমনটা বলা যাবে না। আর ভোটে জেতার জন্য লাগে যে নির্বাচনী মেশিন, সেটার নাম অমিত শাহ। তিনি তাত্ত্বিক নন, প্রধান কারিগর।

তবু বিরোধীরা আশায় বুক বাঁধছে। কেন? ২০১৪’য় বিজেপি ২৮২টা আসন পেয়েছিল ৩১ শতাংশ ভোট নিয়ে। আসনসংখ্যায় এ রকম স্পষ্ট গরিষ্ঠতা ১৯৮৪ সালে ইন্দিরার মৃত্যুর পর এবং ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার পর হয়েছিল। ৩০ বছর পর এত কম ভোট পেয়ে বিজেপি একা এত আসন পেয়েছিল কারণ বিরোধীরা ছত্রভঙ্গ ছিল।

এ দেশে একদা ছিল কংগ্রেসের আধিপত্য। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রজনী কোঠারি নাম দিয়েছিলেন: কংগ্রেস সিস্টেম। বিজেপি-পন্থী তাত্ত্বিকরা বলছেন, গৈরিক সিস্টেম শুরু হয়েছে। গত বার প্রায় ২০০টা আসনে কংগ্রেস শতকরা এক ভাগেরও কম ভোট পায়। এই আসনগুলো প্রধানত হিন্দি বলয়ে। ১০০-র নীচে আসন পাওয়া কংগ্রেসের ইতিহাসে এই প্রথম। ’৭৭ সালে, জরুরি অবস্থার পরেও কংগ্রেস ১৫০টা আসন পায়।

২০০টি আসনে কংগ্রেস এবং বিজেপি, দুই সর্বভারতীয় দলের লড়াই। এই রাজ্যগুলোয় বিজেপি প্রায় সব আসন দখল করে বসে আছে। তাই প্রকৃতির নিয়ম মানলে এখানে কংগ্রেসের ভাল ফল করাটাই প্রত্যাশিত। সাদা চোখে।

মমতা শিবির ভাবছে, কংগ্রেস গত বার ছিল ৪৪। বিরোধী দলের মর্যাদা পর্যন্ত পায়নি। সেখানে মমতার হাতে ৪২ আসনের মধ্যে ছিল ৩৪টি। এ বার আরও সংখ্যা বাড়বে বলে প্রবল আত্মবিশ্বাসী তিনি। আর তখন, কিংমেকার কেন, মমতা নিজেই হবেন ‘কিং’। কর্নাটক মডেল। কংগ্রেস ১০০-১২৫ আসন নিয়ে নিজে সরকার গঠন করবে না! রাহুল বলবেন, দিদি প্রধানমন্ত্রী হন। অন্য আঞ্চলিক দলগুলি বলবে, আমরা চাই না, ছেড়েই দিতে রাজি আছি সুসভ্যতার আলোক? স্বপ্নকল্পনা হলেও মধুর। মুশকিল হল, কর্নাটক ছিল শুধু কংগ্রেস আর জেডিএস-এর দ্বিপাক্ষিক ব্যাপার। কিন্তু ২০১৯ লোকসভায় অনেক নেতা অনেক দল। তখন মমতা একশো শতাংশ আসন পেলেও, প্রশ্ন উঠবেই: ১০০ তো ৪২-এর চেয়ে বেশি। তৃণমূল কি আশা করছে কংগ্রেসের সংখ্যা ৪০-এরও নীচে যাবে? লালুপ্রসাদ, চন্দ্রবাবু বা এমনকি ডিমএকে-র চেয়ে মমতার আসন বেশি হতেই পারে, কিন্তু সবাই তখন তাঁকে সমর্থন করবেন তো? দিল্লি এক ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রনগরী।

সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে মমতার আর একটি সমস্যা আছে। দিল্লি ভারত নয়, তবু, দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, এখানকার কুশীলবদের ধারণা বা দৃষ্টিভঙ্গি জাতীয় রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। মমতাকে দিল্লি আজও কিঞ্চিৎ ‘জ়েনোফোবিক’ চরম মনোভাবাপন্ন বাঙালি নেত্রী বলে মনে করেন। প্রণববাবু যে অর্থে সর্বভারতীয় ব্যক্তিত্ব, মমতা তা নন। সাবঅল্টার্ন দিদি তাই আজও শাহি দিল্লির স্বাভাবিক নাগরিক নন। পওয়ার, চন্দ্রবাবু এমনকি দেবগৌড়া দিল্লিতে পরবাসী নন। ষড়যন্ত্রনগরীতে এঁরা সবাই ঘোলা জলে মাছ ধরতে ভালবাসেন। শতকরা ভোট প্রাপ্তিতে তৃতীয় হয়েও মায়াবতী উত্তরপ্রদেশে একটা আসনও পাননি। এ বার যদি তিনি শাপমুক্ত হন, তবে মহিলা দলিত প্রধানমন্ত্রী তো তিনিও হতে পারেন! এমনকি, অতীতের স্টাইলে বিজেপি যদি মায়াকে বাইরে থেকে সমর্থন জানায়?

এবার চলুন বিজেপি শিবির। মোদী কী করছেন? মোদী এবং মমতা দু’জনকেই খুব কাছ থেকে বহু বছর দেখেছি। এই দুই নেতার মতাদর্শগত ফারাক যতই হোক না কেন, দু’জনেরই খুব শক্তিশালী বাস্তববোধ আছে। কোথায় কোথায় নিজের সীমাবদ্ধতা, সেটা দুজনেই বোঝেন। দু’জনেই স্বনির্মিত নেতা। মোদী তা জানেন বলেই সবচেয়ে জোর দিয়েছেন— বিরোধী ঐক্যকে ছত্রভঙ্গ করে দিতে হবেই! তার জন্য মমতা-মায়াবতী এমনকি কেসিআর-এর স্বপ্নে সুড়সুড়ি দাও। শুধু রাহুল কেন? এ তো প্রধানমন্ত্রী বনাম আরও দশ জন প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থীর লড়াই!

রাজনাথ সিংহ অথবা নিতিন গডকড়ীর অনুগামীরাও ভাবছেন, মোদীকে সরিয়ে এদের কাউকে প্রধানমন্ত্রী করলে অতিরিক্ত শরিক পেতে সুবিধা হতে পারে। মমতা থেকে চন্দ্রবাবু। বিজেপি একা না পারলে শরিকদের নিয়েও সরকার গঠন করতে চাইছে না।

তবে মোদী শিবির বলছেন. ওঁকে এত বোকা ভেবো না। স্বপ্ন কে কে দেখছেন তিনি সব খবর রাখেন। আশায় বাঁচে চাষা কিন্তু অনেক সময় আশায় চাষা মরেও।

পাঁচ বছর একটা শাসক দলের আধিপত্যকামিতা আমরা দেখলাম। দেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতিকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে শাসক প্রভুর দল। এ অবস্থায় কৌন বনেগা প্রধানমন্ত্রী— এ প্রশ্নের জবাব কিন্তু সহজ নয়।

এক সাংবাদিক চরণ সিংহকে প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি প্রধানমন্ত্রী হতে চান কেন? জবাবে কৃষক নেতাটি বলে ছিলেন, তুমি তো রিপোর্টার. তুমি সম্পাদক হতে চাও না? মানতেই হবে এই যুক্তি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রিত্ব নিয়ে প্রকাশ্য বিবাদে নিজের নাক কেটে বিরোধী ঐক্যের যাত্রা ভঙ্গ না হয়ে যায়।

Advertisement