Advertisement
E-Paper

এত দিনে মুক্তি হল

মুক্তি হল কেটি-র। রবীন্দ্রনাথেরও। ঘড়ার জল দিঘির জলে ভাগাভাগি হয় না, জেনেও তিনি ভাগ করেছিলেন। সে ছিল তাঁর জবাবদিহি। নিজের কাছে।প্রা য় ৮৭ বছর বাদে রবীন্দ্রনাথের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-আত্মমোক্ষণের কারাগার থেকে মুক্তি পেল কেটি মিত্তির। শেষের কবিতা উপন্যাসে তার জায়গা অল্পই। উপন্যাসের শেষ দিকে জানা যায়, অক্সফোর্ডে থাকার সময় অমিত রায় তার আঙুলে আংটি পরিয়েছিল।

গৌতম চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ২৩ অগস্ট ২০১৫ ০০:০২
সুমন মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘শেষের কবিতা’ ছবির দৃশ্য

সুমন মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘শেষের কবিতা’ ছবির দৃশ্য

প্রা য় ৮৭ বছর বাদে রবীন্দ্রনাথের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-আত্মমোক্ষণের কারাগার থেকে মুক্তি পেল কেটি মিত্তির। শেষের কবিতা উপন্যাসে তার জায়গা অল্পই। উপন্যাসের শেষ দিকে জানা যায়, অক্সফোর্ডে থাকার সময় অমিত রায় তার আঙুলে আংটি পরিয়েছিল। চূড়ান্ত পরিচ্ছেদে জানা গেল, কেটি বন্ধুদের বলেছে, তাকে কেতকী নামে ডাকতে। নৈনিতালের সরোবরে অমিত তাকে পড়ে শোনায় রবি ঠাকুরের কবিতা। লাবণ্যর প্রতি ‘সেক্সুয়াল জেলাসি’ থেকে ভোলবদল? লেখক জানিয়েছেন, এটি অমিত রায়েরই কীর্তি: ‘এতদিন অমিত মূর্তি গড়বার শখ মেটাত কথা দিয়ে, আজ পেয়েছে সজীব মানুষ।’ পুরুষই তো মেয়েদের গড়েপিটে নেবে!

সুমন মুখোপাধ্যায়ের সিনেমায় এই গড়ে-তোলা প্রকল্প নেই। সেখানে শুরুতেই অক্সফোর্ডে অমিত আর কেটি। বাঙালি অবশ্য জানে, শেষের কবিতা মানেই অমিত-লাবণ্য। ‘পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি’ বা ‘কেতকী আমার ঘড়ায় তোলা জল, প্রতিদিন তুলব, ব্যবহার করব, আর লাবণ্য আমার দীঘি, ঘরে আনার নয়, মন তাতে সাঁতার দেবে’। কেটি এত দিনে সেই ছায়া থেকে মুক্তি পেল। লাবণ্যর আঙুলে অমিতের আংটি দেখে সিনেমায় তার থমকে-যাওয়া কান্নায় দর্শকও গুম্ মেরে যায়। বুঝতে পারে, ভালবাসা কেটিরও কম নেই। ও ভাবে ঘড়া আর িদঘির জলে ভাগাভাগি করা যায় না।

এই ভাগাভাগি রবীন্দ্রনাথের নিজের কাছে জবাবদিহি। ‘শেষের কবিতা’র জন্ম ১৯২৮ সালে। দার্শনিক ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের কুন্নুরের বাড়িতে। রবীন্দ্রনাথ সে বার অক্সফোর্ডে হিবার্ট লেকচারের আমন্ত্রণ পেয়েছেন, শরীর খারাপ বলে যেতে পারেননি। সদ্য শেষ করেছেন ‘যোগাযোগ’। জার্মান পত্রিকায় লিখতে হচ্ছে ভারতীয় বিয়ে নিয়ে প্রবন্ধ। তিনি জানেন, বিয়ে মানে পরস্পরকে আঁকড়ে ধরা নয়। দিতে হয় নিজস্ব পরিসর। ব্রজেন্দ্রনাথ সে সময় একটু অবাক হয়েছিলেন। মানুষের ধর্ম নিয়ে অক্সফোর্ডে বক্তৃতা দিতে হবে, তার বদলে রবীন্দ্রনাথ এখন হালকা প্রেমের গল্প ভাবছেন কেন?

দার্শনিকেরা অনেক কথাই জানেন না। এখনকার ছেলেমেয়েরা প্রেম-ট্রেম বোঝে না এমনটা গত দু’তিন বছর ধরেই ভাবছেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯২৬ সালে নরওয়ে সফরে রানী মহলানবীশকে সে কথাই বলেছিলেন: আধুনিক ছেলেমেয়েরা রোমান্স জানে না। এই ব্যর্থতা কী ভাবে এড়ানো যায়, একটি ছেলে ও একটি মেয়ে পরস্পরকে পেয়েও কী ভাবে আজীবন রোমান্টিক প্রেম বজায় রাখবে, সেই রাস্তাও বাতলেছিলেন তিনি। িদঘির দু’দিকে দু’খানা বাড়ি, তার ওপরে সাঁকো। মেয়েটির কাছ থেকে অনুমতি না পেলে ছেলেটি এ দিকে আসবে না। এ নিয়ম তারা নিজেরাই করে রেখেছে। আকাশে জ্যোৎস্না, মেয়েটি তার হাতের বীণায় ঝঙ্কার দিতে দিতে বাজছে, এই বুঝি ছেলেটা এল!

এটিই তাঁর আধুনিক প্রেম। কবিতাগুলি নিয়ে বুদ্ধদেব বসু সাফ জানিয়েছিলেন, নিবারণ চক্রবর্তী রবীন্দ্রনাথেরই এক্সটেনশন। ‘নাই আমাদের কনকচাপার কুঞ্জ/বনবীথিকায় কীর্ণ বকুলপুঞ্জ’ গোছের লাইন কল্লোল, প্রগতি পত্রিকায় কেউ লিখবে না। কিন্তু ৬৭ বছরের রবীন্দ্রনাথ দমবেন কোন দুঃখে? অন্য প্রজন্মের সঙ্গে পাঞ্জা কষাতেই তাঁর প্রতিভা। যৌবনে কাবুলিওয়ালা গল্পে মিনির বাবার উপন্যাসের কথা লিখেছিলেন: ‘প্রতাপসিংহ তখন কাঞ্চনমালাকে লইয়া অন্ধকার রাত্রে কারাগারের উচ্চ বাতায়ন হইতে নিম্নবর্তী নদীর জলে ঝাঁপ দিয়া পড়িতেছেন।’ কিন্তু পূর্বসূরি বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে যে ভাবে লড়া যায়, উত্তরকালের সঙ্গে সে ভাবে নয়।

পরবর্তী প্রজন্মের সঙ্গে লড়াই ও প্রেমের পরিসর খোঁজার এই প্রেক্ষিত তিনি কোথায় খুঁজে পাবেন, শিলং ছাড়া? ১৯২৩ সালে শিলঙে প্রায় দেড় মাস কাটিয়েছিলেন কবি। সঙ্গে পুত্র রথীন্দ্রনাথ, বউমা প্রতিমা দেবী, কন্যা মীরা, দৌহিত্রী নন্দিতা ছাড়াও কাশীর ফণিভূষণ অধিকারীর মেয়ে রাণু। সে মেয়েকে আজ টানা ছয় বছর ধরে নিয়মিত চিঠি লেখেন ভানুদাদা। ১৯১৯ সালে প্রথম বার শিলঙে এসেও রাণুকে জানিয়েছিলেন, রাস্তায় কী কী বিপর্যয় ঘটেছিল।

কত বছরে মেয়েরা পূর্ণ হয়? রবীন্দ্রনাথের নিজের বিয়ের সময় স্ত্রীর বয়স ছিল দশ। বারো বছর বয়সে প্রথম সন্তান। আজ শিলং-এর ঝর্নার ধারে, পাইনবনে ঘুরে বেড়ান ৬২ বছরের রবীন্দ্রনাথ আর ১৭ বছরের রাণু। অমিত আর লাবণ্য শিলং পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায় কী ভাবে? ‘কিছু দূর যেতে যেতে দু জনের হাত মিলে গেল, ওরা কাছে কাছে এল ঘেঁষে। অমিত লাবণ্যর মাথা টেনে নিয়ে তার মুখটি উপরে তুলে ধরল।’ শিলং-এ তখন রাণু ও ভানুকে নিয়ে চাপা স্ক্যান্ডাল। বাস্তবে ১৯১৮ সালেই রাণুর অনেক চিঠিতে ‘আপনাকে চুমু দিচ্ছি, আদর দিচ্ছি’ ইত্যাদি প্রতিশ্রুতি। রাণুকে লেখা চিঠিতে এ জাতীয় লাইন নেই ঠিকই, কিন্তু চিঠিতে চুমু পাঠাতে কবি বাধাও দেননি।

শিলং থেকে ফের জোড়াসাঁকো হয়ে বারাণসীতে বাবার কাছে ফিরে যাওয়া। কয়েক দিন পরে রবীন্দ্রনাথ সপ্তদশী কিশোরীকে চিঠিতে কাশীর পেয়ারার বর্ণনা দিলেন: ‘আমার রাণুরই মতো। কোথাও কাঁচা, কোথাও শ্যামল, কোথাও বা কঠিন, কোথাও কোমল।’

পরের বছর কবির চিনযাত্রার আমন্ত্রণ। রবীন্দ্রনাথের চিঠি: ‘যাকে চিন ডেকেছে, আমার মধ্যে তাকে দেখে খুশি হও রাণু।... তোমার কাছে থাকার দ্বারাই তুমি যে আমাকে বেশি পাবে সে তোমার ভুল। আমাকে জগতের লোকের মধ্যে ছড়িয়ে পাও যদি, তাহলেই তুমি সবচেয়ে বেশি পাবে।’ রাণু কি চেয়েছিলেন, চিনের বদলে কবি কাশীতে তাঁদের বাড়িতে যান? এই চিঠিই যেন শেষের কবিতার পূর্বসুরি: মোর লাগি করিও না শোক/আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।

রাণুর ৫০টি চিঠি আজও পাওয়া যায় না। কিন্তু ১৯২৪ সালের নভেম্বরে লেখা চিঠিটা? ‘আপনি তো কতবার বলেছেন, আমাদের সত্যিকারের বিয়ে হয়ে গেছে।... আমার সমস্ত শরীর ছেয়ে সে আদর আমার মনকে ভরে দিয়েছিল, সে ভাবনাটুকু কেড়ে নেবার সাধ্য এ পৃথিবীতে কারও নেই ভানুদাদা, আপনারও না।’ আর রবীন্দ্রনাথ? চিঠির উত্তর নেই। কিন্তু বিয়ের আগে রাণুকে লিখলেন, ‘আজ অগ্নিস্নানে পবিত্র হয়ে তুমি বিশুদ্ধ নির্মল স্বরূপে তোমার সংসারে আত্মোৎসর্গের বেদী রচনা করো।’ আরও জানালেন, ‘যখন আসবে, আমার সমস্ত চিঠি সঙ্গে করে এনো। সকলের ইচ্ছা, সে চিঠিগুলি রক্ষা করা হয়।’ তরুণ প্রজন্মকে রোমান্সের অ-আ-ক-খ শেখাতে চাওয়া রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করেন, বিয়ের পর মেয়েরা শুধুই আত্মোৎসর্গের বেদী রচনা করবে। থাকবে না বিবাহপূর্ব কোনও বন্ধু। রাণুর বিয়ের পর ভানুদাদার চিঠির সম্বোধনও গেল বদলে, ‘তোর চিঠি পেয়ে খুশি হলাম।’

কেটির দিক থেকে শুরু তাই চমৎকার! অমিত রায় বড় বড় কথা বলেছিল, কেটি ক্ষমা করে দিয়েছিল।

ঋণ: রবীন্দ্রনাথ, রাণু ও শেষের কবিতা, অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy