Advertisement
E-Paper

তারা এ দেশ ভাগ করেনি

অমিত শাহের মন্তব্যের ‘সাম্প্রদায়িকতা’ নিয়ে যত শোরগোল উঠেছে, বিষাক্ত জাতীয়তাবাদ নিয়ে তার এক শতাংশও নয়। প্রতিবেশীর অপমান নিয়ে আমরা বিচলিত নই। আমরাও মনে করি, ‘ওরা দুশমন, নাগালে পেলে এমন মারব না!’অমিত শাহের মন্তব্যের ‘সাম্প্রদায়িকতা’ নিয়ে যত শোরগোল উঠেছে, বিষাক্ত জাতীয়তাবাদ নিয়ে তার এক শতাংশও নয়। প্রতিবেশীর অপমান নিয়ে আমরা বিচলিত নই। আমরাও মনে করি, ‘ওরা দুশমন, নাগালে পেলে এমন মারব না!’

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০১৫ ০০:৩৭
দৈনন্দিন। ওয়াগা সীমান্তে ভারত ও পাকিস্তানের সৈনিকরা।

দৈনন্দিন। ওয়াগা সীমান্তে ভারত ও পাকিস্তানের সৈনিকরা।

এক গল্প বার বার বলা ঠিক নয়, জানি। কিন্তু শ্রীযুক্ত অমিত শাহের ভাষণ শুনে এতটাই মনে পড়ে গেল, না বলে পারছি না। প্রায় দু’দশক আগে কলকাতায় এক সভায় নিজের অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছিলেন সম্ভবত দক্ষিণ ভারতের এক প্রবীণ সাংবাদিক। কিছু দিন আগেই স্থানীয় কিছু ছেলেমেয়ের সঙ্গে পাকিস্তান নিয়ে কথা বলছিলেন তিনি। তারা সবাই পাকিস্তানের লোকদের ওপর বেজায় খাপ্পা: ‘ওরা আমাদের দুশমন। শয়তান সব। নাগালে পেলে এমন মার মারব না!’ ভদ্রলোক বললেন, ‘তাই? আচ্ছা দেখ তো এই ছবিগুলো।’ কিছু দিন আগে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন তিনি, সেখানে অনেক ছবি তুলেছিলেন, খুব সাধারণ মানুষের আটপৌরে ছবি। নানা বয়সের মানুষ, নানা পরিবেশ, নানান মুড। তো, ছবিগুলো একটা করে ছেলেমেয়েদের হাতে তুলে দেন আর জিজ্ঞাসা করেন, ‘একে মারবে?’ ওরা দেখে, পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে, ফের দেখে, তার পরে বলে, ‘নাঃ, একে মারব না, এ ভাল।’ ছবি ফুরিয়ে গেল, কাউকে আর মারা হল না।

অমিত শাহ বালক নন। গিরিরাজ সিংহ, সাক্ষী মহারাজ প্রমুখ সতীর্থদের সঙ্গেও তাঁর অনেক তফাত— ঘটে বুদ্ধি আছে, জিভে লাগাম। ‘দুশমন’ কিংবা ‘এমন মার মারব’ গোছের সাদাসিধে শব্দ প্রকাশ্যে তাঁর মুখে উচ্চারিত হওয়ার প্রশ্নও ওঠে না। একটা কথার পেটে আর একটা কথার পুর দিয়ে কী ভাবে পরিবেশন করতে হয়, তাঁর বিলক্ষণ জানা আছে। তিনি কেবল বলেছেন, ‘বিহারের নির্বাচনে বিজেপি হেরে গেলে পাকিস্তানে বাজি ফাটানো হবে।’ সঙ্গে সঙ্গে নিন্দা-প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে, নির্বাচন কমিশনের কাছেও নালিশ গিয়েছে। সমালোচকদের বক্তব্য: এই উক্তি সাম্প্রদায়িক, এতদ্দ্বারা ভারতীয় জনতা পার্টির সভাপতি বিরোধীদের অপমান করেছেন, মুসলমানদেরও। জবাবে অমিত শাহ চোখের পাতা না ফেলে ঠান্ডা গলায়
বলেছেন: কী আশ্চর্য, ভারতীয় মুসলমানদের সম্পর্কে তো কিছুই বলা হয়নি, তিনি কেবল মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, বিজেপি হল আসল জাতীয়তাবাদী, তাকে পাকিস্তান ভয় পায়।

গত লোকসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশে বিজেপি’র অসামান্য সাফল্যের পিছনে অমিত শাহের ভূমিকা বহুচর্চিত। জানা ছিল, নরেন্দ্র মোদী বিহারের মহাযুদ্ধে তাঁকে দলের সেনাপতি করে পাঠাবেন। জানা ছিল, উত্তরপ্রদেশের মতো বিহারেও হিন্দু ভোট এককাট্টা করার উদ্যোগ জমে উঠবে। আবার কত মানুষ সেই উদ্যোগের বলি হবেন, তা নিয়ে ভয়ও ছিল; মুজফফরনগরের স্মৃতি এখনও দগদগে। এখনও অবধি অন্তত তেমন কিছু ঘটেনি, সে জন্য নিশ্চয়ই বিহারের মানুষকে অভিবাদন জানাতে হবে। কিন্তু রাজনীতির সওদাগররা ভোট মেরুকরণের চেষ্টা করবেন না, তা-ও কি হয়? অতএব, এক দিকে বিজেপি’র নেতারা ইয়াসিন ভাটকল ও ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন-এর প্রসঙ্গে নীতীশ কুমারকে (ইসলামি) সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক বলে প্রচার করছেন, অন্য দিকে আসাদউদ্দিন ওয়াইসি মুসলমানদের ‘একমাত্র মুখপাত্র’ হিসেবে বিহারে অবতীর্ণ হয়েছেন। এই বাজারে অমিত শাহ পাকিস্তানে বাজি ফাটাবেন, সে তো নিতান্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। এবং বিরোধী শিবির থেকে তাঁর বক্তৃতার যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তাতে তাঁর দলের লাভই লাভ। ‘পাকিস্তানের নাম করে আসলে মুসলমান-বিরোধিতা’র অভিযোগ ষোলো আনা সত্যি, কিন্তু তাতে মেরুকরণই প্রশ্রয় পায়। এখানেই নরেন্দ্র মোদীর যোগ্য সহযোগীর মগজাস্ত্রের মহিমা।

এ অস্ত্র প্রতিহত করতে হলে আগে ওঁদের জাতীয়তাবাদের মায়াজালটিকে ছিন্ন করা দরকার। অমিত শাহ সুকৌশলে সেই জালই রচনা করেছেন। তাঁর কথাটার নিহিত অর্থ সহজ ও স্পষ্ট: পাকিস্তান ভারতের দুশমন, বিজেপি সাচ্চা জাতীয়তাবাদী, তাই বিজেপি হারলে পাকিস্তানের উল্লাস। খুব ভালই জানি, ওঁরা এই ব্যাখ্যা মানবেন না, বলবেন, পাকিস্তানে যে ভারতবিরোধীরা আছে, বিশেষ করে যারা সন্ত্রাসের কারিগর, বিজেপি হারলে তারা খুশি হবে— দলনেতা শুধু এটাই বলতে চেয়েছেন। মুশকিল হল, দলনেতা যতটা বাক্পটু, পারিষদরা ততটা নন, তাঁরা ক্রমাগত ভেতরের কথাটা ফাঁস করে দিয়ে চলেছেন। ‘যারা মোদীজিকে ভোট দেবে না, তারা পাকিস্তানে চলে যাক’ কিংবা ‘গোমাংস খেতে হলে পাকিস্তানে যাও’ ইত্যাদি সুবচন তো আছেই, বিহারে নির্বাচনী জনসভায় দাঁড়িয়ে রাজ্য বিজেপির এক নম্বর নেতা সুশীল মোদী ঘোষণা করেছেন: নরেন্দ্রভাইকে (চিন ও) পাকিস্তান ভয় পায়, (তাই) বিজেপিকে ভোট দিন। একটা গোটা দেশকে দুশমন হিসেবে খাড়া করে সেই নিক্তিতেই নিজের জাতীয়তাবাদ প্রমাণ করার এই ধারণা বেজায় সংক্রামক— ডেঙ্গি তো শিশু, ইবোলার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে।

দিচ্ছেও। অমিত শাহের মন্তব্যের ‘সাম্প্রদায়িকতা’ নিয়ে যত প্রতিবাদী শোরগোল উঠেছে, সেই উক্তির বিষাক্ত ও বিপজ্জনক ‘জাতীয়তাবাদ’ নিয়ে তার এক শতাংশও শোনা যায়নি। বিরোধী রাজনৈতিক দল কিংবা দলের বাইরে যাঁরা বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবারের সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে পঞ্চমুখ, তাঁরাও এই ‘পাকিস্তান নিপাত যাক’ মার্কা জিগির নিয়ে বিশেষ কিছু বলেননি। যাঁরা অন্য রকম ভাবেন তাঁরাও হয়তো ভয় পেয়েছেন যে, মুখ খুললে ‘দেশদ্রোহী’ সাব্যস্ত হতে হবে। কিন্তু তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরেও অনেকেই হয়তো মনে মনে এমনটাই ভাবেন। জঙ্গি জাতীয়তাবাদ সত্যিই বড় সংক্রামক। ভারতীয় মুসলমানের অপমান, বিরোধী দলের অপমান নিয়ে আমরা সঙ্গত কারণেই ক্রুদ্ধ, কিন্তু পাকিস্তান নামক প্রতিবেশীর অপমান নিয়ে মোটেও বিচলিত নই। কারণ আমরাও মনে করি, ‘ওরা দুশমন, নাগালে পেলে এমন মারব না!’ দক্ষিণ ভারতের ওই শিশুরা পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের ছবি দেখে মত পালটেছিল। আমরা শিশু নই, আমাদের হৃদয় জাতীয়তাবাদের আঁচে পুড়ে ঝামা হয়ে গেছে, হাজার ছবি দেখালেও আমাদের মত পালটাবে বলে ভরসা হয় না। বাজি ফুটুক না ফুটুক, আমাদের এই দুর্ভাগা উপমহাদেশে সমবেত যুযুত্‌সুদের ছুটি নেই।

তার চেয়ে বরং ফিরে যাওয়া যাক তেরো বছর আগে। হ্যাঁ, ২০০২। গুজরাতের গণহত্যার কিছু কাল পরে প্রকাশিত হয়েছিল কবীর সুমনের গানের নতুন সংকলন: আদাব। তারই একটি আশ্চর্য গানে দুই প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত-প্রহরী দুই সেপাইয়ের কথা ছিল। সুমন লিখেছিলেন: ‘একটা থালায় চারটে রুটি একটু আচার, একটু ডাল/ একই থালায় দুজন খাবে, যুদ্ধ হয়তো আসছে কাল।’ এক গান তো আমরা বার বার গেয়েই থাকি।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy