আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় এক দিন আমাদের ছাত্রকালের প্রেসিডেন্সি কলেজের মতো জগদ্বিখ্যাত হবে। ১৯৬১ সালে এই কলেজে ফিজিক্স অনার্স নিয়ে বি এসসি পড়তে এসেছিলাম। অধ্যাপকরা অনেকেই প্রথম সারির। তাঁদের মধ্যে এক জন, অমল রায়চৌধুরী মহাশয় জগদ্বিখ্যাত, রায়চৌধুরী ইকুয়েশন, পরের কালে পেনরোজ, হকিংয়ের বিশ্বজয়ী আবিষ্কারের ভূমিকা। অজানাকে জানবার নেশা মজ্জায় মজ্জায় ধরিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরা। অর্থবিদ্যা, বাংলা, ইংরেজি, অঙ্কশাস্ত্র, দর্শন, সব বিভাগে উৎকর্ষের অনায়াস লীলা। তার পরে ছিল প্রেসিডেন্সি ডিবেট। অধ্যাপকরা অংশ নিতেন। বিশেষত ইতিহাসবিদ অশীন দাশগুপ্ত। তখন বুঝতাম না, ইংরেজিটা পাক্কা কেমব্রিজ। পরে বুঝলাম ও দেশে পৌঁছে।
১৯৬৪ সাল, বয়স তখনও কুড়ির নীচে। বিদেশে পাড়ি দিলাম। বাংলায় ফিরে এলাম ১৯৮৪ সালে। কুড়ি বছর কেটে গেছে। স্বপ্নের দিনগুলি অস্পষ্ট স্মৃতির কবলে। এরই মধ্যে নকশাল আন্দোলন, মারধর, খুনখারাবি নিত্যনৈমিত্তিক। ও দিকে সিপিএমের আপ্রাণ চেষ্টা বড় বড় কোম্পানিকে ‘বুর্জোয়া’ বলে বাংলা থেকে ভাগানো। ‘প্রতিক্রিয়াশীল নিপাত যাক’, ‘ডাউন উইথ ক্যাপিটালিজ্ম’, এই সব স্লোগানে বাঙালি ওস্তাদ হয়ে উঠেছে।
রাজনীতির দাপটে ক্রমে সেই প্রেসিডেন্সি অত্যন্ত সাধারণ, প্রায় নগণ্য অবস্থায় নেমে এল। সিপিএম আমলে সেন্টার অব এক্সেলেন্স হল বুর্জোয়ামির লক্ষণ। চোখা চোখা অধ্যাপকদের আনতাবড়ি মফস্সলে বদলি করে দেওয়া হল। ছাত্ররা কেউ কেউ প্রেসিডেন্সি ছেড়ে সেন্ট জেভিয়ার্স, আর বহু ছাত্র দিল্লিমুখো হল। ভাল ভাবেই ভাঙন ধরল।
সেই নীচে নামার মুখে, তখনকার মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রেসিডেন্সিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা দিলেন। কিন্তু বলা হল, যা জায়গা আছে, যা ল্যাবরেটরি আছে, তাই দিয়েই চালিয়ে নিতে হবে। নতুন জমি, নতুন বাড়ি— বিশ্ববিদ্যালয়ের যেটা নিতান্তই প্রয়োজন, সেটা কিছু করা যাবে না। একটু অবাক হলাম। সুন্দর, কিন্তু ছোট শহরকে কি রাতারাতি রাজধানী করা যায়? টাকার যদি অত অভাব, তা হলে এত আড়ম্বর, এত উচ্চাকাঙ্ক্ষারই বা কী দরকার? তারই মধ্যে ‘সেন্টার অব এক্সেলেন্স’ ‘সেন্টার অব এক্সেলেন্স’ করে বাঙালি লাফালাফি শুরু করে দিল। এটা যেন একটা ম্যাজিক!
মেন্টর গ্রুপ হল আবার গভর্নিং কাউন্সিলও হল। মেন্টর গ্রুপ বাইরে থেকে মেন্টর করতে থাকল, তারাই আবার গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্যও হল। আজব ব্যবস্থা! এর পর ঘন ঘন উপাচার্য পরিবর্তন হতে থাকল একটা আইন থেকে আর একটা আইনের ছুতোয়। পরিস্থিতিতে সর্বদা একটা ক্ষণস্থায়ী ভাব। আমার পরম বন্ধুবর অধ্যাপক সব্যসাচী ভট্টাচার্য মহাশয় এলেন। নয় মাসে পে ফিক্সেশন হয়ে উঠল না। এটা কী? টাটা ইনস্টিটিউট-এর বেতন প্রেসিডেন্সিতে পাবেন না, সেটা জেনেই অধ্যাপক ভট্টাচার্য এসেছিলেন। বেশ আরও কয়েক জন অধ্যাপক ইস্তফা দিয়ে চলে গেলেন, ছাত্ররা স্লোগানের মাত্রা একটু বাড়াল।
আসলে রাজনীতির দানব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর ঢুকে পড়েছে। আমাদের সময়ে আমরা যে রাজনীতি করিনি, সেটা ভুল বলা হবে। কিন্তু সেই রাজনীতি ইডিয়োলজিকে ভিত্তি করে। এবং তার কতকগুলো সহবত ছিল। কী বামপন্থী এসএফআই, কী উল্টো দিকের পিসিসিপি (প্রেসিডেন্সি কলেজ ছাত্র পরিষদ), বাইরের নেতারা ভুল করেও কলেজে ঢুকতেন না। সে সব কোথায় উধাও হয়ে গেল!
এর ফলে শান্তিময় পরিবেশ, যেটার অত্যন্ত প্রয়োজন, সেটা বিদায় নিল। গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে এক বার ছাত্রদের বলেই ফেলেছিলাম যে, বিপ্লব, বিদ্রোহ, স্লোগান, ঘেরাও না করলে তোমাদের বোধহয় রুচিতে বাধে, তাই না? বাজারে নাম খারাপ হয়— চেঁচামেচি, ঘেরাও, আজকের দিনে এ সব না করলে সমাজে মর্যাদা থাকবে না রে, বাজারে নাম খারাপ হবে!
রাজ্য জুড়েই এখন এই এক দৃশ্য। দেখে মন ভেঙে যায়। এত মেধা এই পোড়া দেশে! কিন্তু সেই মেধা এই নেতির আগুনে পুড়ছে। সেই একই কথায় ফিরে আসতে বাধ্য হই: আমরা কি ব্যর্থ রাজ্য?