নি রুপায় সিদ্ধান্তকে ‘নীতি’ বলা অনর্থক। মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষকদের চাকরির মেয়াদ সত্তর বৎসর হইল। কারণ, যত শিক্ষকের পদ, তত শিক্ষক নাই। ইহার পরেও সব পদ পূরণ না হইলে হয়তো পঁচাত্তর কিংবা আশি বৎসরও সীমা বলিয়া নির্ধারিত হইতে পারে। ইহার যথার্থতা বা কার্যকারিতা লইয়া বিবাদ করিয়া কী হইবে? মেডিক্যাল কাউন্সিল কলেজ-হাসপাতাল চালাইতে যে অনুপাতে শিক্ষকের বিধান দিয়াছে, সরকারকে তাহা দেখাইতে হইবে। কেবল এ রাজ্যই নহে, ডাক্তারের অভাবে কেন্দ্রও ক্রমাগত শিক্ষক-চিকিৎসকদের অবসরের বয়স বাড়াইতেছে। ২০১৩ সালে দিল্লির ‘এইমস’-এর ডাক্তারদের অবসর বাষট্টি হইতে পঁয়ষট্টি বৎসর হইয়াছিল, এ বৎসর ফের সাতষট্টি হইয়াছে। পশ্চিমবঙ্গ এক ধাক্কায় অবসরের বয়স সত্তর বৎসরে তুলিয়া আগাম কাজ সারিয়াছে। মেডিক্যাল কলেজে শিক্ষকের সংখ্যা এত কম হইবার কারণ একটা নহে। বাম আমলে দীর্ঘ জাড্যের কারণে নূতন মেডিক্যাল কলেজ তৈরি হয় নাই, আসন সংখ্যাও বাড়ে নাই। ফলে ডাক্তার তৈরি হইয়াছে কম। তদুপরি, শিক্ষক-চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিসের প্রথা উঠিয়া যাওয়ায় শিক্ষকতা আকর্ষণ হারাইয়াছে। অপর দিকে, আংশিক সময়ের শিক্ষকদের মান্যতা দিতে মেডিক্যাল কাউন্সিল নারাজ। ফলে শিক্ষকতায় এমন একটি ফাঁক তৈরি হইয়াছে, যাহা পূরণ করিতে বর্তমান শিক্ষকদের জোর করিয়া ধরিয়া রাখা ব্যতীত সরকারের উপায় নাই। সত্তর বৎসরে অবসর সরকারি সিদ্ধান্ত নহে, সিদ্ধান্ত লইবার অক্ষমতায় সরকারি সিলমোহর।
কিন্তু সেই অক্ষমতা কেবল শিক্ষকের সংখ্যা নিশ্চিত করায় সীমিত নহে। সরকারি হাসপাতালে শিক্ষক ও চিকিৎসকদের নিয়মানুবর্তিতা ও তাঁহাদের কাজের মান নিয়ন্ত্রণেও অক্ষমতাও এক রকম মানিয়া লইতেছে সরকার। স্বাস্থ্য দফতরের মনোভাব এখন— একেই ডাক্তার নাই, তাহাতে হাসপাতালে উপস্থিতি বা কাজের মান লইয়া কড়াকড়ি করিলে আরও ডাক্তার মিলিবে না। যাঁহারা আছেন, যেন তেন প্রকারেণ তাঁহাদের ধরিয়া রাখিতে হইবে। তাহার ফলে চৌম্বক কার্ডে চিকিৎসকদের উপস্থিতি রেকর্ড করিবার পদ্ধতি শুরু করিয়াও কার্যত বাতিল করিতে হইয়াছে। যদিও সরকারি কর্তারাই স্বীকার করেন, অতি অল্প শিক্ষক-চিকিৎসক নির্দিষ্ট সময় হাসপাতালে থাকেন। জেনেরিক ওষুধ লিখিবার প্রথাও সম্পূর্ণ বহাল করা সম্ভব হয় নাই, যাঁহারা সরকারি নির্দেশ অমান্য করিতেছেন, তাঁহাদের শাস্তিরব্যবস্থা করাও সম্ভব হয় নাই। সর্বাপেক্ষা সমস্যা, যাঁহারা রোগীর মৃত্যু বা হয়রানিতে অভিযুক্ত, তাঁহাদের বিষয়ে তদন্ত শুরু হইলেও শেষ হইতেছে না। দালালপোষণ হইতে অবহেলায় শিশুমৃত্যু, কোনও তদন্তের ফল ঘোষিত হয় নাই। স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব জবাবদিহির দায়, কোনও কিছুই নিশ্চিত করিতে রাজি নয় সরকারি ব্যবস্থা। ডাক্তার জোগাড় করা এবং ধরিয়া রাখাই তাহার কাজ।
ইহার সবটাই কি জনস্বার্থ? না কি জনস্বার্থের খড়ের বাছুর দেখাইয়া জনসম্পদ দোহন করিবার অপচেষ্টা? আরও সরকারি ডাক্তার প্রয়োজন ঠিকই, কিন্তু সরকারি ডাক্তারদের চিকিৎসার মানের উন্নতিও সমান প্রয়োজন। অচিকিৎসার পরিবর্তে অপচিকিৎসা, ডাক্তারের অনুপস্থিতির জায়গায় ডাক্তারের অবহেলা রোগীদের নিকট অধিক গ্রহণযোগ্য নহে। সাঁইত্রিশ হইতে সত্তর, সকল বয়সের চিকিৎসককে তৎপর, দায়বদ্ধ রাখিবার কাজটিও সরকারের।