অপরিকল্পিত উন্নয়ন, খনন কার্য, শিল্পায়ন ও নগরায়ণের চাপে আরাবল্লী পর্বতমালা ধীরে ধীরে ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অঞ্চলে বেআইনি খননকার্য বেড়ে চলেছে। মার্বেল, গ্র্যানিট ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ আহরণের ফলে পাহাড় কেটে ফেলা হচ্ছে নির্বিচারে। এর ফলে শুধু পাহাড়ের গঠনই নষ্ট হচ্ছে না, বরং মাটির উপরের উর্বর স্তরও ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে, বনভূমি উজাড় হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বহু বন্যপ্রাণী তাদের আবাসস্থল হারিয়ে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আরাবল্লী পর্বতমালা থর মরুভূমির বিস্তারকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করে রাখে। কিন্তু পাহাড় ধ্বংসের ফলে মরুভূমির বিস্তার দ্রুত গতিতে বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, জলসম্পদ ও মানুষের জীবনযাত্রার উপর। বহু অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ জলস্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে, ফলে পানীয় জলের সঙ্কট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে।
সংলগ্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার ক্ষেত্রেও আরাবল্লী পর্বতমালার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এই পর্বতমালা মৌসুমি বায়ুর গতিপথ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং বৃষ্টিপাতের ভারসাম্য বজায় রাখে। কিন্তু পাহাড় কেটে ফেলার ফলে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অতিবৃষ্টি ও খরার প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে। কোথাও হঠাৎ বন্যা, আবার কোথাও দীর্ঘ দিন বৃষ্টি না-হওয়ার ফলে চরম জলাভাব দেখা দিচ্ছে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন ক্রমশ কমছে, খাদ্য নিরাপত্তা সঙ্কটের মুখে পড়ছে।
শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশই নয়, আরাবল্লীর ধ্বংস সমাজের উপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে। পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী জনজাতি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী তাদের জীবিকা হারাচ্ছে। বনজ সম্পদ, পশুপালন ও ক্ষুদ্র কৃষির উপর নির্ভরশীল মানুষগুলো কর্মসংস্থানের অভাবে শহরমুখী হতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে শহরে জনসংখ্যার চাপ বাড়ছে এবং সামাজিক সমস্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভবিষ্যতে যদি এই ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত থাকে, তবে উত্তর ও পশ্চিম ভারতে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। মরূকরণ আরও বাড়বে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে, পানীয় জলের সঙ্কট তীব্র হবে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য সম্পূর্ণ ভাবে ভেঙে পড়বে।
সুপ্রিম কোর্ট আরাবল্লী পর্বতের পরিবর্তিত সংজ্ঞা সংক্রান্ত তার আগের নির্দেশগুলি আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অতঃপর আরাবল্লীকে রক্ষার জন্য কঠোর আইন প্রয়োগ, অবৈধ খনন বন্ধ, ব্যাপক বনায়ন এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নীতির প্রয়োজন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন অবশ্যই জরুরি, কিন্তু তা কখনও প্রকৃতির বিনাশের বিনিময়ে হওয়া উচিত নয়।
ইন্দ্রজিৎ পাল, গোশুম্বা, পূর্ব বর্ধমান
পাহাড় বাঁচাও
আরাবল্লী ভারতের উত্তর-পশ্চিম দিকের একটি প্রাচীন পর্বতশ্রেণি, গুজরাত থেকে হরিয়ানা, দিল্লি পর্যন্ত বিস্তৃত। মাউন্ট আবু এর অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। এই পর্বতশ্রেণিটি নানা খনিজ সম্পদ, যেমন— তামা, দস্তা, মার্বেলে সমৃদ্ধ। থর মরুভূমির বিস্তার রোধে প্রাকৃতিক বাধা হিসাবেও কাজ করে এই পর্বত। বর্তমানে এই পর্বতশ্রেণি অস্তিত্ব সঙ্কটে ভুগছে। আরাবল্লী রক্ষায় বৈজ্ঞানিক ম্যাপিং, খনন বন্ধ, বনসৃজন, জলাধার পুনরুদ্ধার এবং পরিবেশগত ভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলগুলির কঠোর সুরক্ষা-সহ একাধিক পদক্ষেপ করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ছিল, পুরো আরাবল্লীর বৈজ্ঞানিক ম্যাপিং (মানচিত্র তৈরি) করা, বন্যপ্রাণী করিডর, জলাশয় এবং অন্যান্য সংবেদনশীল অঞ্চলে খনন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, মূল্যায়ন শেষ না-হওয়া পর্যন্ত নতুন খনির ইজারা নেওয়া বন্ধ রাখা, পাথর ভাঙার ইউনিটগুলির উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা। আরাবল্লীকে রক্ষার বিভিন্ন কর্মসূচি এবং পরিবেশবাদীদের আন্দোলন অবৈধ খনন বন্ধ ও সুরক্ষার দাবিকে জোরালো করছে। ‘আরাবল্লী গ্রিন ওয়াল’ প্রকল্পের মাধ্যমে বনায়ন, জলাশয় পুনরুদ্ধার এবং জীববৈচিত্র বৃদ্ধি করে পরিবেশগত ভারসাম্য ফেরানোর চেষ্টা হচ্ছে। বেসরকারি উদ্যোগগুলিও আরাবল্লীকে বাঁচাতে সরব হয়েছে, যার মূল দাবি হল: পুরনো পরিবেশগত সংজ্ঞা বজায় রাখা, অবৈধ খনন বন্ধ করা, পাহাড় ও বনভূমিকে পূর্ণ আইনি সুরক্ষা দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করা।
পার্থপ্রতিম মিত্র, ছোটনীলপুর, বর্ধমান
প্রতিবাদী
সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রকের একটি কমিটির সুপারিশের পর সুপ্রিম কোর্ট আরাবল্লী পর্বত এবং পর্বতশ্রেণির একটি নতুন সংজ্ঞায় অনুমোদন দিয়েছিল। যে সংজ্ঞায় বলা হয়েছিল, ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০০ মিটার বা তার বেশি উঁচু জমিই ‘আরাবল্লী পাহাড়’ হিসেবে বিবেচিত হবে। এই সংজ্ঞা মানা হলে বর্তমান আরাবল্লী পর্বতের অধিকাংশই ‘পাহাড়’-এর সংজ্ঞা থেকে বাদ পড়ত। ভবিষ্যতে এখানে খনন বা অন্যান্য নির্মাণকাজ শুরু হলে এই পাহাড়গুলি পরিবেশবিধির আওতায় পড়ত না। কারণ, পশ্চিম ভারতের অনেক জায়গাতেই আরাবল্লী পর্বতশ্রেণির অংশ ১০০ মিটারের কম উচ্চতাসম্পন্ন। তবে অতি সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট তার পূর্বের সেই রায়ে স্থগিতাদেশ দিয়েছে। যদিও আরাবল্লী ধ্বংসের কাজ যে তাতে বন্ধ হবে না, তা অনুমান করাই যায়।
উল্লেখ্য, থর মরুভূমি থেকে উড়ে আসা বালি এবং ধূলিকণাকে রুখে দেয় এই অনুচ্চ পাহাড়গুলি। সঙ্গে বিভিন্ন রাজ্যের ৩৭টি জেলার বহু সম্প্রদায়ের প্রয়োজনীয় জ্বালানি কাঠ, পশুখাদ্য, ভেষজ গাছ আসে আরাবল্লীর বনভূমি থেকে। ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘পরিবেশগত মেরুদণ্ড’ হিসাবে কাজ করে এটি। এই কারণে অতীতের নানা সমীক্ষা অল্প উচ্চতার পাহাড়, সেগুলির ঢালু অংশ এবং সংলগ্ন ভূখণ্ডকেও আরাবল্লী পর্বতশ্রেণির অন্তর্গত বলে এসেছে।
সুতরাং, উত্তরপ্রদেশের পরিবেশ রক্ষা এবং সামগ্রিক ভাবে দেশের মানুষের স্বার্থে পুরো আরাবল্লীকে রক্ষা করা এখনই দরকার। তবে শীর্ষ আদালতের রায় যা-ই হোক, কেন্দ্রীয় সরকারের কর্পোরেট স্বার্থ উপেক্ষা করার ক্ষমতা তথা সদিচ্ছা শেষ পর্যন্ত বজায় থাকবে কি?
কুমার শেখর সেনগুপ্ত, কোন্নগর, হুগলি
শ্বাসরুদ্ধ
ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে স্বাগতম দাসের ‘সুখহীন নিশিদিন পরাধীন’ (২-১২) অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বর্তমানে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগে ছাত্রদের সংখ্যা ক্রমশই কমছে, মেধাবীদের বেশির ভাগই বিদেশে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ঔপনিবেশিক বাংলায় বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শিল্প চর্চা এক বিশেষ উচ্চতায় পৌঁছেছিল, সেই ধারা স্বাধীনোত্তর ভারতে প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক ও সামাজিক সঙ্কটের দরুন ১৯৬০ সালের পরবর্তী পর্যায়ে আমরা ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়তে থাকি। চরম দারিদ্র, খাদ্যসঙ্কট, পর পর কয়েকটি যুদ্ধ, ও উদ্বাস্তু সমস্যা আমাদের রৈখিক উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আমাদের প্রতিবেশী দেশ চিন অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছে, মূলত বনিয়াদি স্তরে প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষায় ব্যাপক সংস্কার এবং জাতীয় আয়ের অনেকটাই শিক্ষাখাতে খরচ করে। আমরা এ সব ক্ষেত্রে এখনও অনেকটাই পিছিয়ে। আমাদের দেশে জ্ঞানের মুক্ত হাওয়া ক্রমশই ম্রিয়মাণ, শিক্ষা ও গবেষণাকে অলাভজনক বিনিয়োগ হিসাবে গণ্য করার প্রবণতা কেন্দ্রীভূত ক্ষমতায়নে লক্ষ করা যাচ্ছে। সব কিছুই প্রায় আমলাতান্ত্রিক ঘেরাটোপে শ্বাসরুদ্ধ।
তা সত্ত্বেও দেশের শিক্ষক ও বিজ্ঞানীরা তাঁদের নৈতিক দায় এড়াতে পারেন না। বিজ্ঞান অ্যাকাডেমিগুলি নিশ্চুপ, সদস্য ফেলোদের মুকুটে পালক লাগাতেই ব্যস্ত, শিক্ষা ও গবেষণার সংস্কারে তাদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা চোখে পড়ে না।
শ্যামল ভদ্র, কলকাতা-৬৮
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)