E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: বিরল এক মিলনমেলা

খনও বুকের উপর সদ্য কেনা প্রিয় বই রেখে মনে হয়, সেখান থেকে এক মায়াবী গন্ধ উঠছে, সবুজ ঘাসের মতো টাটকা। আজকের কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার সুদীর্ঘ পথপরিক্রমা সত্যিই অভাবনীয়।

শেষ আপডেট: ০১ মার্চ ২০২৬ ০৫:২২

রাতুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘বইয়ের মেলা, মনের মেলা’ (রবিবাসরীয়, ১-২) পড়তে পড়তে হারিয়ে গিয়েছিলাম অতীতে। ১৯৭৬ সাল। তখন সদ্য স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে পা রেখেছি। নতুন বইয়ের প্রেমে পড়েছি তখনই। আজও প্রৌঢ়ত্বের সীমান্তে এসে ১৯৭৬ সালের প্রথম বইমেলার আনন্দ ভুলতে পারিনি। বই কেনার শখ পেয়েছিলাম আমার স্বাধীনতা সংগ্রামী বাবার কাছ থেকেই। সেই সময় থেকেই একটু-আধটু কবিতা লেখা, দেওয়াল পত্রিকা থেকে ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখার আনন্দ— সব মিলিয়ে এক অন্য রকম উন্মাদনা।

স্মৃতির পাতায় সেই জলরং এখনও ভাসে। এখনও বুকের উপর সদ্য কেনা প্রিয় বই রেখে মনে হয়, সেখান থেকে এক মায়াবী গন্ধ উঠছে, সবুজ ঘাসের মতো টাটকা। আজকের কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার সুদীর্ঘ পথপরিক্রমা সত্যিই অভাবনীয়। এ প্রসঙ্গে আরও কিছু তথ্য সংযোজন করতে চাই। জানা যায়, বঙ্গীয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ (ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশন)-এর উদ্যোগে ১৯১৮ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতার কলেজ স্ট্রিট চত্বরে প্রথম পুস্তক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এই ঐতিহাসিক প্রদর্শনীটি ছিল ‘জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ’-এর অঙ্গ, এবং একে ভারতের প্রথম বইমেলা বা পুস্তক প্রদর্শনী হিসাবে গণ্য করা হয়। স্বদেশি আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে বিভিন্ন নামী প্রকাশক অংশ নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিপিনচন্দ্র পাল ও নীলরতন সরকারের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এই আয়োজনে যুক্ত ছিলেন। এমন মিলনমেলা সত্যিই বিরল।

তবে বইমেলা কর্তৃপক্ষের কিছু বিশেষ বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি। দুর্ভাগ্যের বিষয়, বিশেষ ভাবে সক্ষম শিশুদের, অটিজ়ম বা অন্যান্য সিনড্রোমে আক্রান্ত সন্তানদের জন্য বইমেলার স্টলে প্রবেশ, বই দেখা বা কেনার ক্ষেত্রে এখনও পর্যাপ্ত ও সুসংগঠিত ব্যবস্থা নেই। এই বিষয়ে আলাদা করে পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রশাসন ও বইমেলা কর্তৃপক্ষ যদি এ দিকে আরও মনোযোগী হন, তবে একটি স্বাচ্ছন্দ্যময়, অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। বইমেলা তো কেবল বইয়ের নয়, মানুষেরও মেলা। সেখানে সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত হওয়াই কাম্য।

সব্যসাচী পড়ুয়া, কলকাতা-৭৫

ফিরে পাওয়া

রাতুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘বইয়ের মেলা, মনের মেলা’য় পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়ার অংশটির সূত্রে জানাই, এ বারের বইমেলায় আমিও খুঁজে পেয়েছি আমার শৈশবের স্বপ্নসুন্দরী ‘সুলেখা’-কে। তার আভিজাত্য ছিল আকাশছোঁয়া! মনের নাগাল পাওয়া তো দূরের কথা, স্পর্শ করার সৌভাগ্যও ঘটেনি। শুধু দেখেছি, পুস্তক আর কাগজের উপর তার এঁকে যাওয়া সুবিন্যস্ত আখর ও আলপনা। সুদূর অতীতে তার স্নিগ্ধ আঁচড়ে পল্লবিত হয়েছে বাংলা ও বাঙালির সাহিত্যসম্ভার।

এক সময় লেখার জন্য ছিল ‘বড়ি-কালি’। দাম দুই বা তিন পয়সা। দোয়াতে জল দিয়ে গুলে কালি বানাতে হত। লেখার জন্য বরাদ্দ ছিল সরু, শৌখিন কাঠের তৈরি নিব-হ্যান্ডেল, নয়তো কঞ্চির কলম। দোয়াতে বার বার ডুবিয়ে লিখতে হত। দামি কালি-কলম পাওয়া ছিল ভাগ্যের বিষয়! ক্লাসে পরীক্ষার সময় প্রশ্নোত্তরের খাতার সঙ্গে দেওয়া হত এক টুকরো ব্লটিং পেপার। খাতায় বেশি কালি পড়ে গেলে ওই ব্লটিং দিয়ে শুষে নিয়ে খাতাকে আপাত পরিচ্ছন্ন রাখা যেত।

আমার অধরা সুলেখা কিন্তু রক্তমাংসে গড়া কোনও মানবী নয়! পড়াশোনার অবিচ্ছেদ্য উপকরণ, উন্নত মানের ‘কালি’। সে সময় দাম ছিল পঁচিশ পয়সা। মায়ের কাছে বায়না করেছিলাম, পাইনি। অভাবী, একান্নবর্তী পরিবারের বিবেচক মা বেশ ঝাঁঝালো স্বরেই বলেছিলেন, “বাড়ির সকল ভাইবোন বড়ি-কালিতে লিখছে, তুমিও তাই করবে।”

প্রাপ্তির প্রাচুর্যকে মানুষ সহজেই ভুলে যায়; কিন্তু অপ্রাপ্তি অজানতেই মনের কোণে ঠাঁই নেয়। যদিও বিগত পাঁচ দশকের ব্যবধানে ভুলেই গিয়েছিলাম আমার কাঙ্ক্ষিত সুলেখার কথা। অথচ এ বারের বইমেলায় অলৌকিক ভাবে ধরা দিল সুলেখা! চেহারায় বেশ পরিবর্তন, দোয়াতে কালির পরিমাণও প্রায় দ্বিগুণ। সংগ্রহ করলাম আর পুনরায় শিহরিত হলাম।

ভানুপ্রসাদভৌমিক, ডানকুনি, হুগলি

সদিচ্ছা জরুরি

“সব স্কুলে দিতে হবে স্যানিটারি ন্যাপকিন, ঋতুকালীন স্বাস্থ্য মৌলিক অধিকার” (৩১-১) শীর্ষক প্রতিবেদন প্রসঙ্গে জানাই, এই রায় অবশ্যই যুগান্তকারী।

গ্রামীণ ভারতে ঋতুকালীন সমস্যায় জর্জরিত অধিকাংশ কিশোরী। অত্যন্ত অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে তাদের এই সময়টা কাটে। লজ্জায় বিষয়টি আড়াল করতে গিয়ে অনেকেই নানা শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়। ঋতুকালে বহু মেয়ে স্কুলে যেতে পারে না; ফলত স্কুলছুটের সংখ্যাও বেড়ে যায়। অথচ অভিভাবকেরা যদি খোলাখুলি ভাবে ছোটদের সঙ্গে ঋতুচক্র নিয়ে আলোচনা করেন, তা হলে অনেক সমস্যাই এড়ানো সম্ভব। স্কুলছুটের হারও কমতে পারে।

এখন দেখার বিষয় হল, রাজ্য সরকার ও স্কুল কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে কতটা সদিচ্ছা দেখায়। এখনও এমন বহু স্কুল রয়েছে যেখানে মেয়েদের জন্য উপযুক্ত শৌচাগারের ব্যবস্থা নেই। কোথাও বা শৌচাগার থাকলেও তা ব্যবহারযোগ্য নয়; পর্যাপ্ত জলের ব্যবস্থা নেই, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থাও করা হয় না। সুতরাং এমন পরিস্থিতিতে ঋতুকালীন সময়ে ছাত্রীদের সমস্যায় পড়তেই হবে। এই চিত্র বদলাতে হলে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সচেতনতার প্রসার জরুরি।

অতীশচন্দ্র ভাওয়াল, কোন্নগর, হুগলি

অতীতের কারণে

বামফ্রন্ট জমানার অন্যতম পদক্ষেপ ছিল ‘সরকারি কর্মচারী’র সংজ্ঞার ব্যাপক বিস্তৃতি। তৎকালীন প্রশাসন রাজ্যের শিক্ষা, পঞ্চায়েত এবং বিভিন্ন স্বশাসিত সংস্থার কর্মীদের রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের সমতুল্য মর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা প্রদানের যে নীতি গ্রহণ করেছিল, তা নিঃসন্দেহে নজিরবিহীন। এই নীতি যেমন লক্ষ লক্ষ কর্মচারীকে সামাজিক ও আর্থিক সুরক্ষা দিয়েছে, তেমনই দীর্ঘমেয়াদে রাজ্যের কোষাগারের উপর এক বিশাল আর্থিক ক্ষত সৃষ্টি করেছে।

বামফ্রন্ট সরকারের মূল দর্শন ছিল ‘সমকাজে সমবেতন’ এবং সামাজিক সুরক্ষা। সেই নীতির ভিত্তিতেই রাজ্য সরকার পোষিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সরাসরি সরকারি কর্মচারীদের কাঠামোর আওতায় আনা হয়। ফলে সরকারি কর্মচারীর পরিধি কেবল প্রশাসনিক দফতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; প্রসারিত হয়েছে স্কুল, কলেজ, পঞ্চায়েত ও পুরসভা পর্যন্ত। স্বাভাবিক ভাবেই রাজ্যের ‘ওয়েজ বিল’ বা বেতন বাবদ ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়।

এই অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির একটি বিপরীতমুখী অর্থনৈতিক প্রভাবও সুদূরপ্রসারী। পশ্চিমবঙ্গ সরকার বিপুল সংখ্যক শিক্ষক ও পঞ্চায়েতকর্মীকে সরকারি কর্মচারী হিসাবে গণ্য করে যে বেতন প্রদান করে, তার বর্ধিত অংশের দায় কেন্দ্রীয় সরকার বহন করে না। এই বিপুল ব্যয়ের চাপে রাজ্যের পক্ষে কেন্দ্রীয় হারে ডিএ প্রদান ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে।

অতএব, বামফ্রন্ট সরকারের এই নীতির ফলে এক দিকে, রাজ্যের মধ্যবিত্ত সমাজের একটি বৃহৎ অংশ, বিশেষত শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীরা এমন এক সামাজিক ও আর্থিক সুরক্ষা পেয়েছেন, যা ভারতের অন্য অনেক রাজ্যে বিরল। অন্য দিকে, এই বিপুল সংখ্যক কর্মীর বেতন ও পেনশনের দায় রাজ্যের নিজস্ব আয়ের উপর এক স্থায়ী ও ভারী চাপ সৃষ্টি করেছে।

আজ যে মহার্ঘ ভাতা-সংক্রান্ত সঙ্কট প্রকট হয়েছে, তা কোনও তাৎক্ষণিক ঘটনা নয়; বরং কয়েক দশক আগে গৃহীত একটি কাঠামোগত সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিণতি।

বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়, ভোলানাথ চক্রবর্তী সরণি, হাওড়া

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy