Advertisement
E-Paper

সমাজের শিক্ষা

হ রিপালের কলেজের সাম্প্রতিক ঘটনাটি আর এক বার প্রমাণ করিল, এ রাজ্যে এখনও দলই প্রশাসন, দলই আইন। বাম জমানায় লোকাল কমিটি সর্বশক্তিমান হইয়াছিল, এই জমানাতেও সেই অনাচার সমানে চলিতেছে।

শেষ আপডেট: ১৭ ডিসেম্বর ২০১৫ ০০:২২

হ রিপালের কলেজের সাম্প্রতিক ঘটনাটি আর এক বার প্রমাণ করিল, এ রাজ্যে এখনও দলই প্রশাসন, দলই আইন। বাম জমানায় লোকাল কমিটি সর্বশক্তিমান হইয়াছিল, এই জমানাতেও সেই অনাচার সমানে চলিতেছে। অভিযোগ, কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দিন এলাকার পাঁচ হাজার টাকা চাঁদা দেওয়া মাতব্বরটি কলেজ ছাত্রীর সহিত অভব্যতা করিয়াছিল। স্বাভাবিক ভাবেই ছাত্রী ও তাঁহার অভিভাবক পুলিশে রিপোর্ট করিয়াছেন। এবং হুমকি শুনিয়াছেন। হুমকিদাতাদের ভাবখানা হইল, এই সব তো হইতেই পারে, হইলে আলাপ-আলোচনায় দলের মধ্যস্থতায় রফা করিয়া লওয়াই দস্তুর, অন্তত পশ্চিমবঙ্গে। পুলিশ, আইন, এই সব আবার কী কথা! মহাশান্তির রাজ্যে পুলিশ সর্বদা হাত গুটাইয়াই থাকিবে, আর সব কিছু দলের মধ্যস্থতায় চলিবে, ইহাই তো দস্তুর। বিশেষত, যাঁহারা মোটা চাঁদা দেন, তাঁহাদের বিরুদ্ধে কি কথা চলে?

ঘটনাটি অপর এক দিক দিয়াও বিচার্য। এলাকার স্থানীয় মানুষেরা আগে যে দৃষ্টিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে দেখিতেন, এক্ষণে আর সে ভাবে দেখেন না। আগে কোনও অঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গঠিত হইলে এলাকাবাসীরা দলমতনির্বিশেষে তাহাকে কেন্দ্র করিয়া এলাকার সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবেশের উন্নয়ন ঘটাইতে চাহিতেন। প্রতিষ্ঠানটিকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসাবে গড়িয়া তোলা হইত। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে একটি ইংরাজি প্রবন্ধে পাঠাগার আন্দোলনের কেন্দ্র হিসাবে স্থানীয় বিদ্যালয়-পরিসর ব্যবহারে সচেষ্ট হইয়াছিলেন। তাঁহার মত ছিল, স্থানীয় বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে গ্রন্থ রাখা যাইতে পারে, বিদ্যালয়ের নির্ধারিত সময়ের বাহিরে ওই কক্ষ পাঠাগার হিসাবে ব্যবহৃত হইতে পারে। দেশভাগের পর উদ্বাস্তুদের কলোনিগুলিতে একটি করিয়া বিদ্যালয় থাকিতই, দেশহারা মানুষ প্রাণ পণ করিয়া তাহা গড়িয়া তুলিতেন। সেই দিন গত। এখন এলাকার ক্লাব আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দুইই ক্ষমতা দখলের কেন্দ্র ও মাধ্যম। রাজনৈতিক দলগুলি পাড়ার ক্লাব ও শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলি দখল করিয়া জনমতকে কিনিয়া লইতে উদ্যোগী। ইহা এক বিষচক্র। এলাকার অর্থবান দুর্বিনীত বাহুবলীরা এই চক্রের অন্যতম পাণ্ডা। বিদ্যালয়-মহাবিদ্যালয়ের তহবিলে মোটা টাকা চাঁদা প্রদান করিয়া তাঁহারা সর্বেসর্বা গোছের হইয়া উঠিয়াছেন। যথেচ্ছাচার তাঁহাদের মজ্জাগত হইয়াছে।

এই সামাজিক প্রবণতাটি চরম ক্ষতিকর। বস্তুত, ইহাই সর্বনাশের মূল। এই ব্যাধিগ্রস্ত সমাজই ব্যাধিগ্রস্ত দল উৎপাদন করিয়াছে। যে সমাজ শিক্ষাক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আমোদের প্রাঙ্গণ হিসাবে দেখে, সেই সমাজের অবক্ষয় সম্বন্ধে আর কোনও সংশয় থাকে না। পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষাক্ষেত্রে যে ষোলো আনা পশ্চাদ্‌গামী, ইহা তাহার প্রমাণ। পরিত্রাণের উপায় হইল জনমত গড়িয়া তোলা। নামী প্রতিষ্ঠানে কিছু ঘটিলে আন্দোলন হয়, কিন্তু এলাকার ছোট প্রতিষ্ঠানে কিছু হইলে সকলেই চুপ করিয়া থাকেন। ইহা চলিতে পারে না। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরই মর্যাদা রহিয়াছে, স্থানীয় মানুষদের শিক্ষা-সংস্কৃতির মানোন্নয়নে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলিকে খাটো করিলে বা যেমন চলিতেছে চলুক বলিয়া ছাড়িয়া দিলে চলিবে কেন? নানা এলাকায় এখনও সচেতন মানুষ একেবারে হারাইয়া যান নাই। তাঁহাদের উচিত এই চাঁদা ও নৈরাজ্যের শিক্ষা-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা। কঠিন কাজ। জরুরিও।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy