Advertisement
E-Paper

নেই টেক্কা, বিবি বা সাহেব-গোলাম! কবি-সাহিত্যিকের নামে তাস তৈরি করছেন যাদবপুরের গবেষকেরা

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের তরফে তৈরি করা হয়েছে ‘ক্রিপ লিট কার্ডস’। ব্রেল পদ্ধতিতে স্পর্শযোগ্য সঙ্কেত ব্যবহার করে তৈরি এই তাসগুলি বিশেষ ভাবে সক্ষমদের উৎসাহ দেবে।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৮
ব্রেল ও স্পর্শযোগ্য সংকেত ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে ‘ক্রিপ লিট কার্ডস’।

ব্রেল ও স্পর্শযোগ্য সংকেত ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে ‘ক্রিপ লিট কার্ডস’। নিজস্ব চিত্র।

পৃথিবীর রং ঠিক কেমন, জানতেন জন মিলটন। কিন্তু ৪৪ বছর বয়স হতেই দু’টি চোখে নেমে এল আঁধার। সে আঁধারে অবশ্য হারায়নি তাঁর নন্দনকানন। মিলটনের এক শতাব্দীরও বেশি আগে বাংলার ঘরে জন্মেছিলেন আর এক কবি— কৃষ্ণদাস কবিরাজ। পারিবারিক পেশা চিকিৎসা হলেও শেষ জীবনে অনেক কষ্ট করে কৃষ্ণদাস লিখেছিলেন মহাপ্রভুর জীবনবৃত্তান্ত— ‘চৈতন্য চরিতামৃত’। গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজে তা মহাগ্রন্থ। এ রচনা শেষ হওয়ার আগেই জ্বরাভারাতুর কৃষ্ণদাসের চোখের আলো নিভে এসেছিল।

আবার জাপানি লেখিকা ইয়োকো ওটা ৪২ বছর বয়সে সুস্থ শরীর-মনেই সহ্য করেছিলেন হিরোশিমার পারমাণবিক বিস্ফোরণটি। প্রাণে বেঁচে গেলেও অসুস্থতা দীর্ঘ দিন সঙ্গী ছিল তাঁর। থামেনি কলম। ১৯৪৫-এর অগস্ট মাশেই প্রকাশ পায় তাঁর ছোটগল্প ‘কাটেই নো ইয়ো না হিকারি’ (আ লাইট অ্যাজ় ইফ ফ্রম দ্য ডেপ্থস)। পারমাণবিক বিস্ফোরণ সংক্রান্ত প্রথম সাহিত্যনিদর্শন এটিই।

তাঁরই পাশে যেন আন্টিগুয়ান-আমেরিকান গায়িকা-লেখিকা আরিয়ানা রোজ় ফিলিপ। তিনি জন্মেছেন একবিংশ শতাব্দীতে। শৈশব কেটেছে সেরিব্রাল পলসি নিয়ে। প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে তিনি নজির সৃষ্টি করেছেন ফ্যাশন দুনিয়াতেও— এক জন সফল মডেল আরিয়ানা।

কৃষ্ণদাস কবিরাজ বা জন মিলটনের রং লাল, ইয়োকা ওটার রং সবুজ আর আরিয়ানার বেগনি। শুনতে অবাক লাগলেও এমনই কাণ্ড ঘটিয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। শুধু এঁরাই নন। সারা বিশ্বের নানা ভাষার এবং নানা সময়কালের ২৪ জন লেখকের নাম গবেষকেরা ধরে রেখেছেন লাল, নীল, সবুজ, হলুদ আর বেগনি রঙের তাসে। এ খেলা খেলবেন যাঁরা, তাঁরা কোনও দিন রং দেখেননি হয়তো চোখে, অথবা, ক্রমশ হারিয়ে গিয়েছে আলো। তাসের গায়ে হাত বুলিয়ে বুঝে নেবেন কোনটি কী রং— নির্দিষ্ট সঙ্কেতে। এ যেন তুরুপের তাস।

গবেষকের ছ’মাসের পরিশ্রমে রূপ পেয়েছে এই তাস।

গবেষকের ছ’মাসের পরিশ্রমে রূপ পেয়েছে এই তাস। নিজস্ব চিত্র।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের তরফে তৈরি করা হয়েছে ‘ক্রিপ লিট কার্ডস’। ব্রেল পদ্ধতিতে স্পর্শযোগ্য সঙ্কেত ব্যবহার করে তৈরি এই তাসগুলি বিশেষ ভাবে সক্ষমদের উৎসাহ দেবে। ২৪টি তাসেই রয়েছে এক এক জন লেখকের নাম, জন্ম বৃত্তান্ত এবং সাহিত্যকীর্তির উল্লেখ। এই লেখকেরা অনেকেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতায় ভুগেছেন, অথবা কোনও না কোনও দিক থেকে বিশেষ ভাবে সক্ষম।

জনা দশেক অধ্যাপক ও গবেষকের ছ’মাসের পরিশ্রমে রূপ পেয়েছে এই তাস। তৈরি হয়েছে ‘গ্লোবাল যাদবপুর ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই ফাউন্ডেশন’-এর সহায়তায়। সংগঠনের পরিচালক শুভদীপ গুয়াফ জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রাক্তনীরা সম্মিলিত ভাবে সাহায্য করেছেন প্রকল্পটিতে। তিনি বলেন, “দেশের বাইরেও যাতে এই তাস পৌঁছে দেওয়া যায়, আমরা সে চেষ্টাও করছি।”

প্রকল্প সহায়ক, শিক্ষক শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, যে কোনও মানুষ এই খেলায় যোগ দিতে পারবেন। কিন্তু মূলত দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষের জন্যই এই তাস বানানোর কথা ভেবেছিলেন তাঁরা। তাই তাস তৈরির পর পরীক্ষামূলক ভাবে দেখে নেওয়া হয়েছে তাঁরা আদৌ বুঝতে পারছেন কি না! গবেষক শালিনী সাহু বলেন, “চোখে না দেখতে পেলেও শুধু স্পর্শ করেই যে এমন খেলা যোগ দেওয়া যায়, ভাবতেই পারিনি। তার উপর ২৪ জন লেখকের জীবন সম্পর্কে জানতে পারা যাবে। ছোটদের খুব উপকার হবে।”

এ বিষয়ে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ঈশান চক্রবর্তী জানিয়েছেন, “এর আগে ব্রেল ম্যাপ-সহ অনেক কিছুই তৈরি করার কথা ভাবা হয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে। বিশেষ ভাবে সক্ষম মানুষেরা যেন সমাজে মূল স্রোতের বাইরে চলে না যান, সেটাই লক্ষ্য।” বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অমিতাভ দত্ত বলেন, “বহু লেখকের নাম আমরা জানি, অনেকেরই জানি না। আবার অনেক লেখকের বিশেষত্বের কথা জানা ছিল না। শিক্ষার্থীরা ২৪ জন লেখকের কথা জানতে পারবেন। সাধারণ পড়ুয়াদের সঙ্গে বিশেষ ভাবে সক্ষম পড়ুয়ারাও উপকৃত হবেন।”

ঈশান জানিয়েছেন, এই তাস তাঁরা বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের গ্রন্থাগারে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। যাতে খেলার ছলে সাহিত্যের রসাস্বাদন করতে পারেন পড়ুয়ারা।

Game
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy