লোকসভা ভোটের আগে বিজেপির বিরুদ্ধে আক্রমণের ধার বাড়ানোর নির্দেশ দিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার কলকাতায় পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমানের প্রথম সারির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন দলনেত্রী। তৃণমূল সূত্রের খবর, বিজেপির বিরুদ্ধে আক্রমণের সুর যতটা চড়া হওয়া প্রয়োজন, পশ্চিম বর্ধমানে তা অনেক ক্ষেত্রেই হয় না বলে চর্চা রয়েছে দলেই। মুখ্যমন্ত্রী যে এই খামতি সম্পর্কে অবহিত, তা তাঁর এ দিনের নির্দেশে স্পষ্ট বলে মনে করেন জেলা তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশ। লোকসভা ভোটের প্রচারে বিজেপিকে নিশানা করার সময়ে শরীরী ভাষার বদল এবং বেশি করে জ্বালাময়ী বক্তৃতা করার উপরে জোর দিতে বলেন মুখ্যমন্ত্রী। এত দিন তা না হওয়ায় মুখ্যমন্ত্রী বৈঠকে উষ্মাপ্রকাশ করেন বলে তৃণমূলের একটি সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
তৃণমূল সূত্রের খবর, বৈঠকে দুর্গাপুর পূর্বের প্রাক্তন বিধায়ক বিশ্বনাথ পাড়িয়াল কিছুটা আক্ষেপের সুরে বলেন, তিনি এবং দলের অন্যতম রাজ্য মুখপাত্র ভি শিবদাসন ছাড়া জেলায় সভা-সমাবেশে বিজেপিকে কেউই কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন না। তখন এক বিধায়ককে বলতে শোনা যায়, তিনিও বক্তৃতায় বিজেপিকে নিশানা করেন।
তৃণমূল সূত্রের খবর, লোকসভা ভোটে আসানসোল কেন্দ্রে ফের শত্রুঘ্ন সিন্হাকেই প্রার্থী করা হবে বলে এ দিন দলের নেতাদের জানিয়ে দিয়েছেন দলনেত্রী। ওই কেন্দ্রে উপনির্বাচনে সাড়ে তিন লক্ষের বেশি ভোটে জয়ী হয়েছিলেন শত্রুঘ্ন। এই বিপুল ব্যবধান যাতে দলীয় নেতা-কর্মীরা মধ্যে আত্মসন্তুষ্টির জন্ম না দেয়, সে সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলেছেন তৃণমূল নেত্রী। উপনির্বাচনের সঙ্গে সাধারণ নির্বাচনের ফারাক যে বিস্তর, তা এ দিন দলের নেতাদের বুঝিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর স্পষ্ট নির্দেশ, গা ছাড়া মনোভাব বর্জন করে ভোটে নামতে হবে। এ নিয়ে কোনও শিথিলতা বরদাস্ত করা হবে না। যদিও, জেলা নেতৃত্ব এখনই এ নিয়ে কিছু বলতে চাননি।
২০১৪ এবং ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে আসানসোল আসনে জেতে বিজেপি। গত বিধানসভা ভোটের পরে আসানসোল শিল্পাঞ্চলের হিন্দিভাষী এলাকায় বিজেপির প্রভাব কিছুটা কমলেও লোকসভা ভোটের আগে ফের ‘গেরুয়া ঝড়’ উঠবে না, সে কথা বুক ঠুকে বলতে পারছেন না কোনও নেতাই। তাই ভোট ঘোষণার আগেই বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই তীব্র করার ডাক দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। পাশাপাশি, রাজ্য সরকারের প্রকল্পগুলির প্রচারে জোর দেওয়ার নির্দেশও দেন তিনি। তৃণমূল সূত্রে খবর, পশ্চিম বর্ধমানে গ্রামে কর্মসংস্থান ও রাস্তাঘাটের উন্নয়নকেই লোকসভা ভোটে পাখির চোখ করতে চাইছেন মুখ্যমন্ত্রী। এই দুই বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। রাস্তা সংস্কার, নতুন রাস্তা তৈরির কাজে সরকারি অর্থ বেশি করে খরচের নির্দেশও দিয়েছেন। পাশাপাশি, কেন্দ্রের বিরুদ্ধে একশো দিনের কাজ প্রকল্পের টাকা আটকে রাখার অভিযোগে যে আন্দোলন তৃণমূল শুরু করেছে, তা আরও তীব্র করার নির্দেশও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর পরামর্শ, এই আন্দোলনকে বুথ স্তরে নিয়ে যেতে হবে। প্রয়োজনে ধর্না কর্মসূচি করতে হবে বেশি করে।
তৃণমূল সূত্রে জানা গিয়েছে, জেলা সংগঠনকে চাঙ্গা রাখার জন্য মন্ত্রী মলয় ঘটক, প্রদীপ মজুমদার এবং জেলা সভাপতি নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। দলগত ভাবে পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমানের দায়িত্বে রয়েছেন বিদ্যুৎমন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। এ বারও তাঁকে কোর কমিটির মাথায় রেখেছেন মুখ্যমন্ত্রী। কোর কমিটিতে রাখা হয়েছে শিবদাসন, নরেন্দ্রনাথ, পূর্ব বর্ধমান জেলা সভাপতি রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ এবং দুই দলের জেলা সভাধিপতি।
প্রশসানিক বৈঠক করতে জেলা সফর শুরু করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। পূর্ব বর্ধমানেও সভা করেছেন তিনি। আসানসোলে তিনি প্রশাসনিক বৈঠক করতে পারেন, এমন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে তৃণমূল সূত্রে খবর। একই ইঙ্গিত মিলেছে জেলা প্রশাসন সূত্রেও। সার্কিট হাউসে যাওয়ার রাস্তার সংস্কার শুরু হওয়ায় মুখ্যমন্ত্রীর জেলা সফরের জল্পনা আরও তীব্র হয়েছে। যদিও প্রশাসন বা দল, কারও তরফেই প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করা হয়নি। মুখ্যমন্ত্রীও বৈঠকে এ নিয়ে কিছু জানাননি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)