শুরুটা হয়ে গিয়েছিল নদিয়ার কালীগঞ্জের উপনির্বাচনের পরেই। সেখান থেকে নিয়েছিলেন শিক্ষা! ওই ‘অ্যাসিড পরীক্ষা’র পরেই বুথগুলিকে পাখির চোখ করেছিলেন মনোজকুমার অগ্রবাল। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক।
দ্বিতীয় দফার ভোট মিটে যাওয়ার পরে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল, রাজ্যে ‘শান্তিপূর্ণ’ ভাবেই মিটেছে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন। মূল কৃতিত্ব অবশ্যই তাদের। কিন্তু এক দিনে সেই কৃতিত্বের অধিকারী হয়নি কমিশন। বরং নেপথ্যে রয়েছে প্রায় ১০ মাসের পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতি। কমিশন সূত্রে খবর, ২০২৫ সালের জুন মাসে কালীগঞ্জ উপনির্বাচনের পরেই মাঠে নেমে পড়েছিলেন ১৯৯০ ব্যাচের আইএএস মনোজ। নিশ্ছিদ্র করেছিলেন বুথগুলির নিরাপত্তা।
কালীগঞ্জে উপনির্বাচনের আগেই রাজ্যের সিইও-র দায়িত্ব পেয়ে গিয়েছিলেন মনোজ। ওটাই ছিল ঠান্ডা মাথা, ক্ষুরধার বুদ্ধিসম্পন্ন মনোজের ‘প্র্যাকটিস ম্যাচ’। কমিশন সূত্রে খবর, কালীগঞ্জে ভোটগ্রহণের সময় নজর রাখা হয়েছিল, কী ভাবে ইভিএমে টেপ বসানো হতে পারে। কী ভাবে বুথের ভিতরে থাকা সিসি ক্যামেরা ঘুরিয়ে দেওয়া হতে পারে। সে সব মাথার ভিতর ছকে নেন মনোজ। কমিশন সূত্রে খবর, তখনই সিইও সিদ্ধান্ত নেন, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন বুথের মধ্যে কোনও রকম গন্ডগোল হতে দেওয়া যাবে না। ছাপ্পা বা বুথ জ্যামিংয়ের মতো কিছু করতে দেওয়া যাবে না। ইভিএমে গন্ডগোল বা ভোট লুট করার সুযোগও দেওয়া যাবে না।
কালীগঞ্জের উপনির্বাচনেও ওয়েবক্যাম ব্যবহার করা হয়েছিল। কমিশন সূত্রে খবর, ওই নির্বাচন থেকে শিক্ষা নিয়েই স্থির করা হয়, ক্যামেরার লেন্সে সেলোটেপ লাগানো বা মুখ বন্ধ করার সুযোগ বিধানসভা নির্বাচনে কোনও ভাবেই দেওয়া চলবে না। এমনকি, বুথের ১০০ মিটারের মধ্যে কোনও বিশৃঙ্খলা তৈরি হতেও দেওয়া যাবে না বলে স্থির করেন মনোজ।
সেই মতোই পরিকল্পনা তৈরি করতে শুরু করেন মনোজ। সূত্রের খবর, তিনি সিদ্ধান্ত নেন, বিধানসভা নির্বাচনে কেন্দ্রীয় বাহিনীর দায়িত্বে বুথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পরিকল্পনা মতো ভোটের আগের দিন বুথে ভোটকর্মীরা এবং জওয়ানেরা চলে যান। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ উঠেছে, ভোটের আগের দিন ওই কর্মী বা জওয়ানদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা হয়। ভোটের আগের দিন বুথে গিয়ে ইভিএমে টেপ লাগানো, ক্যামেরার মুখ ঘুরিয়ে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। কমিশন সিদ্ধান্ত নেয়, বিধানসভা নির্বাচনে ভোটগ্রহণের আগের দিন থেকেই ইভিএম, সিসি ক্যামেরা পাহারা দেবে বাহিনী। তাদের আওতায় আনা হয় ভোটের যন্ত্র, পরিকাঠামো। সেই সংক্রান্ত কোনও অভিযোগ এলে, তার দায় থাকবে বাহিনীর, বুঝিয়ে দেওয়া হয় সে কথাও।
কমিশন স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে জানায়, বুথের ১০০ মিটারের মধ্যে কেউ যাতে অবৈধ ভাবে প্রবেশ করতে না পারেন, তা-ও নিশ্চিত করতে হবে বাহিনীকে। সেই মতো বুথের অদূরে ভোটার সহায়তা কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বুথের প্রবেশের আগে ওই কেন্দ্রে যাচাই করা হয় যে, ভোটার বৈধ কি না। ভোটার সহায়তা কেন্দ্র ছাড়পত্র দিলে তার পর সেই ভোটার বুথের লাইনে গিয়ে দাঁড়াতে সমর্থ হন।
কালীগঞ্জ উপনির্বাচনের পরে কমিশন বুঝতে পারে, বুথে যদি নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা রাখা যায়, তা হলেই নির্বাচনে অশান্তি ঠেকানো যেতে পারে। সেই মতোই চলতি বিধানসভা নির্বাচনে কড়া নিরাপত্তায় মুড়ে ফেলা হয় বুথ। কমিশন সূত্রে খবর, বুথে এমন ব্যবস্থা রাখা হয়, যাতে কোনও ব্যক্তি, তিনি যে কোনও রাজনৈতিক দলেরই হোন না কেন, বুথের ভিতরে প্রবেশ করে ছাপ্পা দেওয়ার চেষ্টা করলে, ধরা পড়ে যাবেন। তাঁকে চিহ্নিত করা যাবে সহজে। নির্ধারিত সংখ্যার অতিরিক্ত কেউ বুথে প্রবেশ করলে চিহ্নিত করার জন্য রাখা হয় এআই (কৃত্রিম মেধা) প্রযুক্তি। ইভিএমের সামনে এক জনের বেশি থাকলেই কন্ট্রোল রুমে জানান দেয় সেই প্রযুক্তি।
বুথে প্রবেশ করতে না পারলে ‘দুষ্কৃতকারী’ বা কারচুপিতে অভিযুক্তেরা ভোটারদের হুমকি দিতে পারে বলে আশঙ্কা ছিল কমিশনের। তারা যাতে ভোটারদের হুমকি দিতে না পারে, সে জন্য কুইক রেসপন্স টিম মোতায়েন করা হয়। টহল চলে জওয়ানদের। নতুন হেল্পলাইন নম্বরও চালু করে কমিশন, যেখানে ফোন করে অভিযোগ জানানো যায়। কমিশনের একটি সূত্র বলছে, বুথে এমন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে যে, বেআইনি ভাবে কেউ প্রবেশই করতে পারেননি। শুধু বুথে নয়, বুথের বাইরেও কোথাও অশান্তি হতে পারেনি।
দ্বিতীয় দফার ভোট শেষের পরে কমিশনের দেওয়া পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ এমন একটি বিধানসভা নির্বাচন দেখল, যে বার ভোটের দিন তো নয়ই, প্রচারপর্বেও কোনও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। অথচ পাঁচ বছর আগে ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে ২৪ জনের প্রাণ গিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। তার পাঁচ বছর আগে ২০১৬ সালে সাত জন নির্বাচনী হিংসার বলি হয়েছিলেন। এ বার সে সংখ্যা শূন্য। ভোটের দিন কোথাও কোনও বোমাবাজির ঘটনাও ঘটেনি। দু’দফাতেই ভোটের হার ৯০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- রবিবার মধ্যরাত থেকে শুরু হয়েছিল। রাজ্যের বেশ কয়েক জন আমলা এবং পুলিশ আধিকারিককে তাঁদের পদ থেকে অপসারণ করে নির্বাচন কমিশন। বুধবার রাত পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। সেই সব পদে নতুন আধিকারিকও নিয়োগ করে দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, কমিশন স্পষ্ট জানায়, যাঁদের অপসারণ করা হচ্ছে, তাঁদের এ রাজ্যে নির্বাচন সংক্রান্ত কোনও কাজে আপাতত আর নিয়োগ করা যাবে না!
- পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ক্ষেত্রে কমিশনের এই ‘সক্রিয়তা’ নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছে শাসকদল তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ ভাবে অপসারণের পদক্ষেপে অসন্তোষ প্রকাশ করে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠিও লেখেন। চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্য সরকারের সঙ্গে আগাম কোনও আলোচনা না-করে বা কোনও মতামত না-নিয়ে বদলি করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, অতীতে নির্বাচন চলাকালীন কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা আধিকারিককে সরানোর প্রয়োজন হলে কমিশনের পক্ষ থেকে সাধারণত রাজ্য সরকারের কাছে তিন জনের একটি প্যানেল চাওয়া হত। সেই তালিকা থেকে কমিশন নিজেই এক জনকে বেছে নিত। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, এ বার সেই প্রচলিত রীতির সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ঘটেছে। প্রার্থিতালিকা ঘোষণার আগেও কমিশনকে এ বিষয়ে তোপ দাগেন মমতা। নিশানা করেন কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকেও।
-
২৩:২৮
‘সব দলকে ইমেল করে জানানো হয়েছিল’! পোস্টাল ব্যালট নিয়ে তৃণমূলের অভিযোগ ওড়াল কমিশন -
২২:৪৩
প্রায় দু’মাস ধরে কলকাতায় ঘাঁটি গেড়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী ব্যবস্থাপনা মসৃণ রাখছেন শাহের প্রতিমন্ত্রী! গণনা মিটিয়ে ফিরবেন দিল্লিতে -
২২:০৭
ভোট গণনাকেন্দ্র দেখতেও জেলায় জেলায় যাবেন সিইও মনোজ! নির্বাচনের আগেও ঘুরেছিলেন প্রস্তুতি দেখতে -
২২:০৬
তিন জেলায় পুনর্নির্বাচন হচ্ছে না! বাকিগুলিতে স্ক্রুটিনির পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন, আলোচনা পুনরায় ভোট নিয়ে -
২০:২৮
স্ট্রংরুম-বিতর্ক: অবস্থানে কুণাল- শশী, পৌঁছোলেন বিজেপির তাপস-সন্তোষও