Advertisement
E-Paper

দক্ষিণী নায়কদের মতো গাড়ির স্রোতে শক্তিপ্রদর্শন সিপিএমের ‘বিড়িওয়ালা’র! হাজি সাহাবুদ্দিন কে? খোঁজ নিচ্ছেন প্রাক্তন মন্ত্রীও

সাহাবুদ্দিন পুরনো সিপিএম। ১৯৯৩ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দলের সদস্যপদ ছিল। মাঝে ২০০৩ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন পঞ্চায়েত সমিতির পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ। কিন্তু বামেরা ক্ষমতা থেকে যাওয়ার আগের বছরই দলীয় সদস্যপদ ছেড়ে দিয়েছিলেন।

শোভন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ১০:১৬

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

তাঁর বিড়ির ব্র্যান্ডের নাম ‘তারা’। আর তিনি লড়ছেন যে প্রতীকে, তা হল কাস্তে-হাতুড়ি-তারা!

আকাশে উড়ন্ত ড্রোন থেকে তোলা ছবি দেখলে মনে হচ্ছে রাজধানী নয়াদিল্লির রাস্তায় তীব্র যানজট। শ’য়ে শ’য়ে গাড়ি আটকে রয়েছে। পরক্ষণেই ক্যামেরা কাছ থেকে ধরলে বোঝা যাচ্ছে, প্রতিটি গাড়ির বনেটের সামনে উড়ছে লালপতাকা। তা হলে কি কেরল সিপিএমের কোনও গাড়ি-মিছিল? নাহ্, এ ঘটনা ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গে। এ হল উত্তর দিনাজপুরের কর্ণদিঘির ছবি। যে ছবি এবং ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই ভাইরাল সমাজমাধ্যমে। এমনই তার অভিঘাত যে, বাম জমানার এক প্রাক্তন মন্ত্রী সোমবার রাতে একাধিক পরিচিতকে ফোন করে জানতে চেয়েছেন, ‘‘ওই ছবিগুলো কি সত্যি? কে এই হাজি সাহাবুদ্দিন?’’

সচরাচর এমন দৃশ্য দেখা যায় দক্ষিণী সিনেমার তারকাদের রাজনৈতিক মিছিলে। যা করেছেন কর্ণদিঘির সিপিএম প্রার্থী সাহাবুদ্দিন। পারিবারিক বিড়ির ব্যবসা আছে তাঁর। স্বয়ং বিমান বসু তাঁকে ‘বিড়িওয়ালা’ বলে সম্বোধন করেন বলে জানিয়েছেন তিনি নিজেই। কিন্তু সেই ‘বিড়িওয়ালা’ সাহাবুদ্দিন কি হঠাৎ করে ‘গাড়িওয়ালা’ হয়ে উঠলেন? তাঁর দাবি, তিনি কিছুই জানতেন না। তিনি শুধু এলাকার ছ’জন গণ্যমান্যের থেকে ‘দোয়া’ চাইতে গিয়েছিলেন মনোনয়ন জমা দেওয়ার আগে। যে দিন মনোনয়ন, সে দিন সকালে জানতে পারেন, গাড়ির মেলা লেগে গিয়েছে। কিন্তু এ তো আনুষ্ঠানিক দাবি। সিপিএম সূত্রে খবর, আগে থেকেই সব বন্দোবস্ত করা ছিল। সে দিন শুধু ছবি উঠেছে।

Advertisement

সাহাবুদ্দিন পুরনো সিপিএম। ১৯৯৩ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দলের সদস্যপদ ছিল। মাঝে ২০০৩ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন পঞ্চায়েত সমিতির পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ। কিন্তু বামেরা ক্ষমতা থেকে যাওয়ার আগের বছরই দলীয় সদস্যপদ ছেড়ে দিয়েছিলেন। ছিলেন শুধু ‘সমর্থক’ হয়ে। কী ভাবে তাঁকে প্রার্থী করল সিপিএম? সাহাবুদ্দিনের স্পষ্ট কথায় কষ্ট নেই। বলে দিলেন, ‘‘কংগ্রেসের সঙ্গে জোট হওয়ার কথা ছিল সিপিএমের। অনেক দিন ধরেই এলাকার লোকজন আমায় বলছেন ভোটে দাঁড়াতে। আমি তখন সিপিএম-কংগ্রেসকে বলেছিলাম, তোমরা জোট করো, তার পর দেখব।’’ সাহাবুদ্দিন কথাও বলেন দক্ষিণী ছবির তারকার মতো। বলেন, ‘‘আমি এ-ও বলেছিলাম, জোটটা আগে করো। প্রতীক নিয়ে ভাবতে হবে না।’’ অর্থাৎ, তিনি দাঁড়াবেন। সে ‘হাত’ প্রতীকে হোক বা ‘কাস্তে-হাতুড়ি-তারা’। জোট হয়নি। কিন্তু তা-ও সাহাবুদ্দিন লড়ছেন। লড়ছেন কাস্তে-হাতুড়ি-তারার হয়ে।

এই ছবি এবং ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই ভাইরাল সমাজমাধ্যমে।

এই ছবি এবং ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই ভাইরাল সমাজমাধ্যমে।

কত শ্রমিক কাজ করেন তাঁর বিড়ির কারখানায়? সংখ্যা বলতে চাইলেন না সাহাবুদ্দিন। তবে নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া তাঁর হলফনামা দেখে বোঝা যাচ্ছে, তিনি ‘কিংসাইজ’ বিড়ি ব্যবসায়ী। সাধারণ ভাবে শ্রমিকদের মজুরি নগদে মেটাতে বিড়ি ব্যবসায়ীদের হাতে নগদ টাকা থাকা বেশি রাখতে হয়। নগদের পরিমাণ দেখে বোঝা যায় কে কত বড় ব্যবসায়ী। কমিশনে জমা দেওয়া সাহাবুদ্দিনের হলফনামা বলছে, তাঁর হাতে নগদই রয়েছে ১২ লক্ষ টাকা। তাঁর স্ত্রীর হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ ২৩ লক্ষ টাকা। মনোনয়নে শত শত গাড়ির মিছিল করলেও সাহাবুদ্দিনের কিন্তু নিজের কোনও গাড়ি নেই। হলফনামা বলছে, তাঁর স্ত্রীর নামে একটি গাড়ি রয়েছে। সেটির বাজারমূল্য ২৪ লক্ষ টাকার সামান্য বেশি। যেটি কেনা হয়েছিল ২০২২ সালে। তাঁর যে জমিতে বাড়ি, সেটির আয়তন প্রায় ১২ হাজার বর্গফুট। পারিবারিক সূত্রে আরও জমিজমা রয়েছে।

গাড়ি-মিছিলের এ হেন শক্তি প্রদর্শনের পরেই কর্ণদিঘির ভোটের অঙ্ক নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই আসনে ৩৭ হাজার ভোটে জিতেছিলেন তৃণমূলের গৌতম পাল। তৃণমূল ভোট পেয়েছিল ৫৪ শতাংশের বেশি (১ লক্ষ ১৬ হাজার)। দ্বিতীয় স্থানে ছিল বিজেপি। পদ্মশিবিরের ভোট ছিল ৩৭ শতাংশের মতো (প্রায় ৮০ হাজার)। অর্থাৎ ব্যবধান ছিল ১৭ শতাংশের। সেই ভোটে কংগ্রেস সমর্থিত বামেদের ফরওয়ার্ড ব্লক প্রার্থী পেয়েছিলেন ৯ হাজার ভোট। কিন্তু লোকসভা নির্বাচনে সেই সমীকরণ উল্টে যায়। লোকসভায় বাম সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী হিসাব রায়গঞ্জে লড়েছিলেন আলি ইমরান রামজ (ভিক্টর)। করণদিঘিতে বাম-কংগ্রেস জোট প্রার্থীর ভোট চার বছরের ৯ হাজার থেকে বেড়ে হয় ৫৫ হাজার। বিজেপির ভোটও সামান্য বৃদ্ধি পায়। ৮০ হাজার থেকে বেড়ে হয় ৮৬ হাজার। তৃণমূলের ভোট গোত্তা খেয়ে ১ লক্ষ ১৬ হাজার থেকে নেমে আসে সাড়ে ৬৪ হাজারে। তৃণমূলের জেতা আসনে ‘লিড’ পেয়ে যায় বিজেপি।

বিধানসভা এবং লোকসভার তুলনামূলক হিসাব কষলে দেখা যাচ্ছে, বামের ভোট রামে যায়নি। বরং তৃণমূলের ভোট কমেই বৃদ্ধি পেয়েছিল বাম-কংগ্রেস জোটের ভোট। এ বার বাম এবং কংগ্রেসের জোট না-হলেও কর্ণদিঘিতে সিপিএমের ভোট রয়েছে। বিশেষত সংখ্যালঘুদের মধ্যে। সাহাবুদ্দিন নিজে সংখ্যালঘু অংশের। নামের আগে ‘হাজি’ রয়েছে। অর্থাৎ, তিনি হজ করে এসেছেন। স্থানীয় স্তরের অর্থনীতিতেও তাঁর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

জিতবেন কি না কেউ জানেন না। কিন্তু ভোটের আগে এই সূচকগুলির সঙ্গে উত্তর দিনাজপুরের রাজনৈতিক মহলের আলোচনায় জুড়ে যাচ্ছে ‘বিড়িওয়ালা’র গাড়ি-মিছিল।

CPIM CPM Candidate Nomination Karandighi
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy