কন্যাশ্রী, রূপশ্রী-র মতো আর্থিক ভাতার সরকারি প্রকল্প সত্ত্বেও নাবালিকা বিবাহের গ্রাস থেকে বেরোতে পারল না পশ্চিমবঙ্গ।
ষষ্ঠ জাতীয় স্বাস্থ্য পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা জানাল, পশ্চিমবঙ্গের ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সি মহিলাদের মধ্যে ৩৬.৪ শতাংশেরই ১৮ বছরের কম বয়সে বিয়ে হয়ে গিয়েছে। শহরে এই হার কিছুটা কম— ২১.৭ শতাংশ। কিন্তু গ্রামে এই হার যথেষ্ট বেশি— ৪১.৫ শতাংশ। এর আগে ২০১৯ থেকে ২০২১ সালে পঞ্চম জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা হয়েছিল। সে সময়ও দেখা গিয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গের ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সি মহিলাদের মধ্যে ৪১.৬ শতাংশেরই ১৮ বছরের কম বয়সে বিয়ে হয়ে গিয়েছে।
কৈশোরেই মেয়েদের সন্তানের জন্ম বা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার সমস্যাও পশ্চিমবঙ্গে যথেষ্ট। তাতেও উন্নতি হয়নি। স্বাস্থ্য সমীক্ষার সময় দেখা গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সিদের ১৬.৪ শতাংশই সন্তানের মা হয়ে গিয়েছে বা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছে। গ্রামে এই হার ২০.৩ শতাংশ। পঞ্চম স্বাস্থ্য সমীক্ষাতেও দেখা গিয়েছিল, ১৬.৬ শতাংশ কিশোরী হয় অন্তঃসত্ত্বা নয়তো মাহয়ে গিয়েছে।
কলকাতার গবেষক সাবির আহমেদের মতে, ১৮ বছরের কম বয়সে মেয়েদের বিয়ের হারের কিছুটা হলেও উন্নতি হয়েছে। এর আগের দুই স্বাস্থ্য সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, মেয়েদের বাল্যবিবাহের হার কমছেই না। গ্রামে এখনও বেশি হলেও এ বার সার্বিক ভাবে মেয়েদের বাল্যবিবাহ কমেছে। কিন্তু কৈশোরে সন্তানের জন্ম দেওয়া বা অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার হারে বিশেষ উন্নতি নেই। সেটা খুবই চিন্তার বিষয়। অথচ দেখা যাচ্ছে, প্রতি মহিলা পিছু পশ্চিমবঙ্গে সন্তানের হার মাত্র ১.৬, যা জাতীয় গড় ২.০-র থেকে কম। ফলে গোটা বিষয়টাই হেঁয়ালির মতো।
স্বাস্থ্য সমীক্ষা বলছে, পশ্চিমবঙ্গে হাসপাতালে সন্তান প্রসবের হার বেড়েছে। কিন্তু সরকারি হাসপাতাল বা সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সন্তান প্রসবের হার কমে গিয়েছে। ২০১৯-২১-এ ৯১.৭ শতাংশ সন্তান প্রসব হাসপাতালে হত। ২০২৩-২৪-এ তা বেড়ে ৯৪.৯ শতাংশে চলে গিয়েছে। কিন্তু সরকারি হাসপাতালে সন্তান প্রসবের হার ৭২.৪ শতাংশ থেকে কমে ৬৫.৮ শতাংশ হয়ে গিয়েছে। যার অর্থ বেসরকারি হাসপাতালে বা নার্সিং হোমে সন্তান প্রসবের হার বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে সিজ়ার করে সন্তান প্রসবের হারও। আগের স্বাস্থ্য সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, মাত্র ৩২.৬ শতাংশ সন্তান প্রসব সিজ়ার করে করা হচ্ছে। এখন তা বেড়ে ৪৪.৫ শতাংশ ছাপিয়ে গিয়েছে। শহরে এই হার ৫৫ শতাংশের বেশি।
এখানেও ‘হেঁয়ালি’ দেখছেন গবেষকরা। এক দিকে সিজ়ার করে সন্তান প্রসব বাড়ছে। আবার পশ্চিমবঙ্গে আধুনিক গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার ৬০.৭ শতাংশ থেকে কমে ৫৪.৯ শতাংশ হয়ে গিয়েছে। গোটা দেশেই এই হার কমেছে। তার বদলে পুরনো পন্থার গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার পশ্চিমবঙ্গে এক লাফে ১৩.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৪.৯ শতাংশ হয়ে গিয়েছে।
তবে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে একটি সন্তোষজনক বিষয় হল, পশ্চিমবঙ্গে স্বাস্থ্য বিমার আওতায় থাকা পরিবারের হার বিপুল হারে বেড়েছে। ২০১৯-২১-এ রাজ্যের মাত্র ৩৩.৭ শতাংশ পরিবার স্বাস্থ্য বিমার আওতায় ছিল। ২০২৩-২৪-এ তা বেড়ে ৮৮.২ শতাংশ ছুঁয়েছে। শহরের তুলনায় গ্রামে স্বাস্থ্য বিমার আওতায় থাকা পরিবারের সংখ্যা বেশি—৯০ শতাংশের উপরে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)