গাড়ি থেকে নামছেন যেন রায়বাহাদুর! পিছনে ছত্রধর। রায়বাহাদুর ধীর পায়ে এগোচ্ছেন। সামনে হাতজোড় করে অনুগতের দল।
এক্কেবারে একই কায়দায় শনিবার নিজের নির্বাচনী কেন্দ্র রায়দিঘিতে ‘ভোট দেখলেন’ দেবশ্রী রায়। কালো কাচে ঢাকা ইনোভা থেকে তাঁর পা বাইরে পড়া মাত্র প্রতিবারই পড়িমরি করে পিছনের গাড়ি থেকে ছুটেছেন তাঁর দলের কর্মীরা! তৃণমূলের প্রতীক আঁকা ছাতা ধরা হয়েছে ‘দিদি’র মাথায়। কখনও দামী সিল্ক শাড়ির আঁচল সামলে, কখনও মন্দিরের প্রসাদী জবা হাতে একদা-নায়িকা এগিয়েছেন বুথের দিকে। সামনে জনতাকে দেখলে প্রশ্ন করেছেন, ‘ভোট দেওয়া হয়েছে?’ উত্তরে ‘হ্যাঁ’ শুনলে হাসিমুখে বলেছেন, ‘‘গুড!’’ আর উত্তর ‘না’ হলে পাল্টা প্রশ্ন, ‘‘এখনও যাওনি কেন? কী ব্যাপার তোমাদের?’’ প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ কিছু না বলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকেছেন। অনেকে আবার দল বেঁধে চটাপট হাততালি দিয়ে উঠেছেন।
হাততালি দিলেন কেন? দেবীপুরের এক মধ্যবয়সী গৃহবধূ বললেন, ‘‘ওমা, হাততালি দেব না? সেই কবে ‘ভালবাসা-ভালবাসা’ বই-য়ে দেখেছিলাম! তখনও হাততালি দিয়েছি!’’
তার পরে আর দেখেননি? কয়েক মুহূর্ত ভেবে জবাব, ‘‘হ্যাঁ, আগের বার ভোট চাইতে এসেছিলেন তো!’’ ভোটে জেতার পরে আর আসেননি? প্রশ্নটা শুনতে পেয়েই বোধ হয় চলতে চলতে একটু থমকে গেলেন দেবশ্রী। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। তাকালেন তাঁর সঙ্গীরাও। ব্যাস! প্রৌঢ়ার আর জবাব দেওয়া হল না।
বাংলা ছবির জনপ্রিয় অভিনেত্রী এবং এক বারের বিধায়ককে ঘিরে এ দিন রায়দিঘির বেশির ভাগ এলাকায় উৎসাহে কমতি ছিল না। কিন্তু সেই উৎসাহ কতটা রুপোলি পর্দার নায়িকাকে দেখার আর কতটা স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কাছাকাছি পৌঁছনোর, সেই প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে বার বার। দেবশ্রী নিজে অবশ্য দাবি করেছেন, ‘‘বিরোধীরা যাই রটাক না কেন, এখানকার মানুষ আমাকে নিজেদের এক জন বলেই মনে করেন।’’
তাই যদি সত্যি হবে, তা হলে এলাকার পর এলাকা জুড়ে সকাল থেকেই কেন পোস্টারে, ব্যানারে শুধু একটাই লাইন, ‘তোমার দেখা নাই’? কেন বহু জায়গায় তৃণমূলের পোস্টারে দেবশ্রীর নামের ওপরে সাদা পোঁচ? কেন শুধু বিরোধীরা নন, নিজের দলের লোকেরাও তাঁকে ডাকেন ‘ভোটপাখি’ বলে? কেনই বা কান পাতলে দলীয় কর্মীদের মুখেই শোনা যায় তাঁর প্রতি নানা ‘অভিমান’-এর কথা? তবে কি যে ভাবে গত পাঁচ বছর বিধানসভায় তাঁর উপস্থিতি কার্যত বোঝাই যায়নি, সে ভাবেই রায়দিঘির মানুষেরও ‘নিজের লোক’ হয়ে উঠতে পারেননি তিনি?
দেবশ্রীর জবাব, ‘‘দেখুন, বিরোধীরা
অনেক কথাই বলবে। সব ব্যাপারে কান দিতে গেলে চলে না। এখন আর দলে কোনও অভিমান-টভিমান নেই। এক সংসারে ঘটি-বাটিতে ঠোকাঠুকি লাগে। তার পর সব ঠিক হয়ে যায়। এখানেও এখন সব ঠিকঠাক।’’
সত্যিই কি তাই? সকাল সাড়ে আটটা। ভোট শুরুর দেড় ঘণ্টা পরেও তৃণমূলের কেন্দ্রীয় অফিসে তালা! ভোটের দিনেও কেউ নেই? স্থানীয় দোকানিরা জানালেন, বেশির ভাগ সময় কেউ থাকেন না। বেলা আরও বাড়লে হয়তো কেউ না কেউ আসবেন।
ফোন করা হল দেবশ্রীকে। জানালেন, তখনও রায়দিঘি পৌঁছতেই পারেননি। কলকাতা থেকে জায়গাটা ‘অনেকটা দূর’ বলে আগের রাতে ডায়মন্ড হারবারে ছিলেন। সেখান থেকে পৌঁছতেও এত দেরি? তা হলে এলাকায় সময় দেন কী ভাবে? উত্তর, ‘‘সেটা এলাকার মানুষ বলবেন। পানীয় জল, রাস্তা-সবই তো করেছি। কিছু তো বাকি থাকেনি।’’
১০টা বাজার কিছু আগে দেবীপুর ঢুকল তাঁর ইনোভা। সিল্কের শাড়ি। চোখে সবুজ ফ্রেমের রোদচশমা। ফ্যাশনেবল খোঁপা। একের পর এক বুথ ঘোরা শুরু হল। পাশ থেকে দলের এক কর্মী ফিসফিস করে বললেন, ‘‘এজেন্টদের সঙ্গে একটু কথা বলুন।’’ বললেন, ‘‘কী আর বলব? আপনারা জল খান বেশি করে।’’ কর্মীদের মুখ চাওয়াচাওয়ির মধ্যেই বুথ থেকে বেরিয়ে সোজা এসি গাড়ির ঠান্ডায়।
পরের বুথের বেশ কিছুটা দূরে গাড়ি থামল। রাস্তা এত সরু, গাড়ি এগোবে না। হেঁটে বুথের দিকে এগোতে এগোতেই এক কর্মীকে ডেকে বললেন, ‘‘ওই মন্দির দু’টোয় আগে ঢুকব।’’ দু’টি মন্দিরের একটি রাধামাধবের। অন্যটি কালীর। দুটি মন্দিরেই প্রণাম করে এক টাকার কয়েন প্রণামী দিয়ে প্রসাদী জবা নিয়ে পরের বুথের দিকে এগোলেন। কী প্রার্থনা করলেন? সহাস্য জবাব, ‘‘সেটা বলা যাবে না। আমি খুবই ঈশ্বরবিশ্বাসী। আগের বার ভোটের সময়েও এই মন্দিরে এসেছিলাম। এ বারেও এলাম।’’ একই ফলের আশায়? উত্তর এল না। নায়িকা গাড়িতে উঠলেন।
রায়দিঘির যে ক’টি এলাকা তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি বলে চিহ্নিত, তারই একটি নালুয়া। সেখানেও বেশির ভাগ জায়গা এ বার লাল পতাকায় ছেয়ে গিয়েছে। বুথ থেকে বেরোনোর সময়ে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, জেতার ব্যাপারে কতটা আশাবাদী? দেবশ্রী বললেন, ‘‘১০০ শতাংশ।’’ পরের প্রশ্ন, তা হলে যে রায়দিঘিতে স্লোগান উঠছে, ‘শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা/ কান্তি গাঙ্গুলিই ভরসা’? সামান্য থতোমতো হয়েও সামলে নিয়ে বললেন, ‘‘আমি তো অন্য স্লোগান শুনছি। শীত-বর্ষা-বসন্ত/ দেবশ্রী রায়কেই পছন্দ!’’
পাশে ভিড় করা জনতা এ বারও হাততালি দিল। এ বার হাততালি কেন? বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এক বৃদ্ধার জবাব, ‘‘ওমা, হাততালি দেব না? কী সুন্দর ছড়া কাটছেন উনি!’’