আরও বেশি করে নজর দিতে হবে বুথে। আরও বেশি করে পৌঁছোতে হবে মহিলা, মতুয়া, কৃষকদের কাছে। রাজ্যে কেন ‘শিল্প হচ্ছে না’, তা বোঝাতে হবে রাজ্যবাসীকে। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফার নির্বাচনের ন’দিন আগে বিজেপির সকল বুথ স্তরের কর্মীকে ছয় ‘দাওয়াই’ দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, এমনটাই বলছে বিজেপির একটি সূত্র। সেই সূত্রেই জানা গিয়েছে, দিল্লিতে বসে ওই কর্মীদের সঙ্গে ভার্চুয়াল মাধ্যমে মঙ্গলবার বৈঠক করেন মোদী। বাছাই করা পাঁচ কর্মীর থেকে শোনেন পরামর্শ। তার পরে রাজ্যে ভোটে জেতার জন্য তিনিও দেন পরামর্শ।
মঙ্গলবার নমো অ্যাপের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের বুথ স্তরের কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করেন মোদী। বিজেপি সূত্রে খবর, আগে থেকেই কর্মীদের বলা হয়, কোনও পরামর্শ থাকলে তা যেন নমো অ্যাপের মাধ্যমে পাঠানো হয়। প্রধানমন্ত্রী সেই পরামর্শ দেখে নির্বাচিত পাঁচ জনের সঙ্গে কথা বলেন। সেই পাঁচ জন হলেন— কসবা বিধানসভার বুথ স্তরের কর্মী রিনা দে, ফাঁসিদেওয়া বিধানসভার জুরা কিন্ডো, বাঁকুড়া বিধানসভার নীলোৎপল বন্দ্যোপাধ্যায়, শালবনি বিধানসভার চন্দন প্রধান এবং শান্তিপুর বিধানসভার রাকেশ সরকার। এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে বৈঠক।
বিজেপি সূত্রে খবর, বৈঠকের শুরুতে মোদী নিজে বুথ স্তরের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন। তার পরে একে একে তাঁদের কথা শোনেন। সূত্রের খবর, প্রথম কথা বলেন কসবার কর্মী রিনা, যিনি পেশায় এক জন গৃহশিক্ষিকা। মোদী তাঁকে প্রশ্ন করেন, ‘‘রাজ্যে মহিলাদের উপরে নির্যাতন নিয়ে কী মনে হচ্ছে? আপনি কিছু পরামর্শ দিন।’’ এর পরে একে একে বাকি চার বুথ স্তরের কর্মীদেরও পরামর্শ শোনেন তিনি। সূত্রের খবর, ওই কর্মীরা মূলত দাবি করেছেন, রাজ্যে দুর্নীতি চলছে। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার টাকা পাচ্ছেন না মানুষ— বলে দাবি করেছেন তাঁরা। ওই কর্মীরা চা বাগান সংক্রান্ত ‘দুর্নীতি’র কথাও বলেছেন। তাঁরা দাবি করেছেন, বাগানের জমির মালিকানা দেওয়া হচ্ছে না।
আর এ সব শোনার পরেই প্রধানমন্ত্রী দেন ছয় দাওয়াই।
এক, বিজেপি সূত্র বলছে, কর্মীদের বুথে নজর দেওয়ার কথা বলেন মোদী। তাঁর কথায়, ‘‘বুথে সর্বশক্তি লাগিয়ে দিন। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বুথেই দিন।’’ মোদী কর্মীদের আরও বলেন, ‘‘মানুষের কাছে যান। দলের কথা তুলে ধরুন। বিজেপির চার্জশিট, ইস্তাহারে যা যা রয়েছে, তা ভোটারদের কাছে গিয়ে তুলে ধরুন।’’
দুই, বিজেপির ইস্তাহারে মহিলা এবং যুবসমাজের জন্য বিভিন্ন সুবিধার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে মহিলাদের মাসে ৩০০০ টাকা করে দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। ভার্চুয়াল বৈঠকে মোদী বলেন, ‘‘মহিলা এবং যুবসমাজের সঙ্গে বেশি করে কথা বলুন।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘মহিলাদের সঙ্গে বৈঠক করুন। একটা বাড়িতে গিয়ে ২০-২৫ জন মহিলাকে নিয়ে আলোচনায় বসুন। সন্দেশখালি, আরজি করের ঘটনা, ল’কলেজের ঘটনা নিয়ে ভিডিয়ো তৈরি করে মানুষকে মনে করান।’’ এর পরেই মোদী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘‘তৃণমূল আজ মাথা নিচু করে ভোট চাইতে আসছে, ক্ষমতায় এলে অন্য রকম হবে।’’ তিনি কর্মীদের ইস্তাহার বিশদে পড়ারও পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘মহিলাদের, যুবকদের জন্য কী সুবিধা, ইস্তাহারে তা দেখে মানুষকে বোঝান।’’
তিন, সূত্রের খবর, মোদী বৈঠকে জানান, বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিজেপি কর্মীদের তুলে ধরতে হবে, কেন এ রাজ্যে কল-কারখানা হচ্ছে না। কেন ব্যবসা হচ্ছে না। প্রশ্ন তুলতে হবে, কেন এ রাজ্যের তরুণ-তরুণীদের ভিন্রাজ্যে যেতে হচ্ছে? মোদীর নির্দেশ, রাজ্যের ভোটারদের বোঝাতে হবে, যেখানে ভয়ের পরিবেশ থাকে, হিংসা হয়, সেখানে কোনও ব্যবসা-বাণিজ্য হয় না। মোদী বলেন, ‘‘(তৃণমূল) সরকারই এই রাজ্যের সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ। তাদের সরাতে হবে। কথায় কথায় দাঙ্গা হলে, ছুরি-চাকু চললে ব্যবসা হতে পারে না। এগুলি ব্যবসার পরিবেশের পরিপন্থী।’’
চার, মতুয়া এবং নমশূদ্রদের কাছে যেতে কর্মীদের পরামর্শ দিয়েছেন মোদী, এমনটাই বলছে সূত্র। মোদী বৈঠকে বলেন, ‘‘মতুয়াদের বাড়িতে যান। নমশূদ্রদের কাছে যান। কারণ, তৃণমূল মতুয়াদের কাছে গিয়ে বলছে, আপনাদের নাম কেটেছে (মোদী সরকার)। দেশে থাকতে পারবেন না। ভয় দেখাচ্ছে। অনুপ্রবেশকারীদের বলছে, তোমাদের ভয় নেই।’’ এর পরেই প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘যাঁদের এ দেশে থাকার অধিকার নেই, তাঁদের আশ্বস্ত করছে ব্যবস্থা করে দেবে (তৃণমূল)। যাঁরা নিজেদের লোক, তাঁদের বলছে ব্যবস্থা করে দেবে। আপনারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলুন, তৃণমূল যতই ভয় দেখাক, সিএএ-র মাধ্যমে এ দেশে মতুয়াদের রাখার ব্যবস্থা করা হবে। ভীত হতে বারণ করুন।’’
আরও পড়ুন:
পাঁচ, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির শুধু জয় নয়, জয়ের ব্যবধান বৃদ্ধি নিশ্চিত করতেও কর্মীদের বার্তা দিয়েছেন মোদী। তিনি বলেন, ‘‘একটা জিনিস মনে রাখবেন, জয়ের ব্যবধান যত বড় হবে, পশ্চিমবঙ্গ তত স্বস্তি পাবে। আমার বিশ্বাস, এ বার তৃণমূল যাচ্ছে, বিজেপি আসছে। ব্যবধান বাড়িয়ে সেই জয় আরও নিশ্চিত করুন।’’
ছয়, বৈঠকে মোদী কর্মীদের আরও বেশি করে কৃষক এবং আলুচাষিদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘কৃষক এবং আলুচাষিদের সঙ্গে কথা বলুন। গিয়ে বলুন, সিন্ডিকেটওয়ালারা ২ টাকা কেজি দরে আলু নিচ্ছে, দাম বাড়লে ২৫ টাকা দরে বিক্রি করছে। যিনি ফসল ফলালেন, তিনি দাম পাচ্ছেন না, যে লুট করল, সে লাভ পাচ্ছে।’’
সবশেষে মোদী জানিয়েছেন, বিজেপির ‘চার্জশিটে’ ছ’টি গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে। সেটাই এখন কর্মীদের কাছে ‘রোডম্যাপ’। বিজেপি সূত্রে খবর, কর্মীদের নিজের এলাকায় যে অপরাধ ঘটেছে, তার তালিকা তৈরি করতে বলেছেন মোদী। লোকের কাছে সেই তালিকা তুলে ধরার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। জানিয়েছেন, মানুষকে বোঝাতে হবে, যে ‘অপরাধীদের মাথায় তৃণমূলের আশীর্বাদ’ রয়েছে। থানাতেও গুন্ডারা বসে রয়েছে। ভোটারদের সে সবই বোঝাতে হবে।