Advertisement
E-Paper

‘প্যাক-ফ্যাক’ আর টিটকিরি নয়, রাজনীতির শব্দ! নেশা, আদর্শ নয়, রাজনৈতিক গোয়েন্দাগিরি, পরামর্শ, দরকষাকষি হল চাকরি

এখন কয়েকশো লোক কাজ করেন আই-প্যাকের সল্টলেকের অফিসে। অধিকাংশেরই বয়স ২৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। সেটা যেন কলসেন্টার, ডেটা অ্যানালিসিস, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের এক মিলনস্থল।

স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০২
রাজ্যের শাসকদলের সাংগঠনিক কাঠামো আই-প্যাকের প্রভাবে আমূল বদলে গিয়েছে।

রাজ্যের শাসকদলের সাংগঠনিক কাঠামো আই-প্যাকের প্রভাবে আমূল বদলে গিয়েছে। গ্রাফিক: এআই সহায়তায় প্রণীত।

‘প্যাক-ফ্যাক বুঝি না’: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ডিসেম্বর ২০২৪।

‘আমার আই-প্যাক’: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফেব্রুয়ারি ২০২৫।

ইংরেজিতে বলে ‘কনসালট্যান্ট’। অর্থের বিনিময়ে তাঁরা পরামর্শ দেন। ব্যবসা-বাণিজ্যে খুব প্রচলিত। প্রযুক্তিতে তো বটেই। ‘কোয়েস্ট মল’ খোলার আগে সঞ্জীব গোয়েন্‌কা পরামর্শদাতাদের নিয়োগ করেন। তিনি একা নন, আইটিসি, ইমামি, এমনকি সেঞ্চুরি প্লাইউডের সঞ্জয় আগরওয়ালও অর্থের বিনিময়ে পরামর্শ নেন।

Advertisement

রাজনীতিও জীবনের বাইরে নয়। প্রথম আবির্ভাব মার্কিন মুলুকে। তিরিশের দশকে। জনসংযোগ, প্রচারকৌশল, বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা, ভাবমূর্তি নির্মাণ— এ সব কাজে ব্যবহার হয়েছিল। জন এফ কেনেডি, বারাক ওবামার মতো দাপুটে রাষ্ট্রপতিও পরামর্শদাতাদের সাহায্য নিয়েছিলেন। এঁদের দর বাড়ল বাইরেও। এমনকি, ট্রাম্প যে ট্রাম্প, যিনি বলতেন, তাঁর ভাবমূর্তি অন্য কেউ নির্মাণ করবেন, তা তিনি হতে দেবেন না, কয়েক মাস পরে তিনিও ভোল পাল্টে পরামর্শদাতাদের নিয়োগ করেছিলেন। ২০১৬ নির্বাচনী প্রচারের সময়।

এই পরামর্শদাতারা কী নিয়ে এলেন মক্কেলদের জন্য? ডেটা ম্যানেজমেন্ট’। ওবামার ২০০৮ সালের নির্বাচনে স্বেচ্ছাসেবকদের হাতে তাঁদের পাড়ার ভোটার তালিকা ধরিয়ে দিয়ে বলা হল, গিয়ে কথা বলো। কী বুঝলে জানাও। এটা চলতে থাকল নিয়মিত। কম্পিউটারে বিপুল পরিমাণ তথ্যের বিশ্লেষণ হয়ে যেত কেন্দ্রীয় ভাবে রাতারাতি। সেই অনুযায়ী কৌশল। সামাজিক মাধ্যম থেকে পছন্দ-অপছন্দ সংক্রান্ত তথ্য বেছে ওবামার সম্ভাব্য ভোটার খুঁজে বার করা। তাঁদের কোন অংশকে কী ভাবে উদ্বুদ্ধ করা যায়, সেই হিসাব কষা।

ভারতে এই প্রবণতা এল নরেন্দ্র মোদীর হাত ধরে। ২০১১ সালের শেষে। মোদী তখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর সঙ্গে কাজ শুরু করলেন প্রশান্ত কিশোর। আফ্রিকায় রাষ্ট্রপুঞ্জের কাজে ‘ডেটা’ বিশ্লেষণের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য নীতি নির্ধারণের অভিজ্ঞতা ছিল প্রশান্তের। গুজরাতে প্রথমে মোদীর বক্তৃতার খসড়া করে দেওয়া, প্রচারে সামাজিক মাধ্যমের প্রয়োগ ইত্যাদি দিয়ে কাজ শুরু। ২০১৩-’১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসাবে মোদীর প্রচারের গুরুদায়িত্ব। তত দিনে ডেটা, ব্র্যান্ডিং, প্রচারের মতো নানা ক্ষেত্রের প্রায় ১,২০০ পেশাদার বিশেষজ্ঞ কাজ করছেন তাঁর সঙ্গে। একদিকে হিন্দুত্ববাদীদের মূল জনভিত্তির কাছে মোদীর আবেদন বাড়ানো, অন্যদিকে তার বাইরের লোকজনের কাছে শিল্পবান্ধব, উন্নয়নমুখী, দুর্নীতিমুক্ত ও কঠিন মানসিকতার নেতা-প্রশাসক হিসাবে মোদীর ভাবমূর্তি নির্মাণ। সামাজিক মাধ্যমে কংগ্রেসের ব্যর্থতা তুলে ধরা। ‘চায়ে পে চর্চা’ বা ‘অব কি বার মোদী সরকার’-এর মতো প্রচার কর্মসূচি ছিল প্রশান্তেরই মস্তিষ্কপ্রসূত।

মোদীর সাফল্য থেকেই অন্যদের নজরে আসেন প্রশান্ত। কিন্তু সে বছরেই বিজেপি-তে অমিত শাহের সঙ্গে তাঁর সংঘাত বাধে। পুরনো টিম ভেঙে যায়। তার কয়েক মাস পর প্রশান্ত তৈরি করেন ‘ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি’। ওরফে আই-প্যাক। শুরু হয় বিজেপিবিরোধী শিবিরের সঙ্গে কাজ। নীতীশ কুমারের জনতা দল (ইউনাইটেড), কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি।

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে দলের অভাবনীয় বিপর্যয়ের পরে তাদের ডেকে আনে তৃণমূল। নেত্রী বুঝেছিলেন, পেশাদার পরামর্শের প্রয়োজন আছে। আবির্ভাবেই সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিল আই-প্যাক। প্রথম বড় প্রকল্প ‘দিদিকে বলো’। সেটাই হিট! এর মাধ্যমে গোটা রাজ্য থেকে নানা অভাব-অভিযোগ সরাসরি পৌঁছোতে থাকল শীর্ষনেতৃত্বের কাছে। সে সবের তালিকা বানানো হল। দ্রুত কিছু সমস্যার সমাধান হয়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে গেল সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সরকারের প্রতি আস্থা ফেরা শুরু হল একাংশের মানুষের। পাশাপাশি শুরু হল স্থানীয় নেতাদের ওপর নজরদারি। ‘স্বচ্ছ’ ভাবমূর্তির প্রার্থীর খোঁজ। বিরোধীদলের বিক্ষুব্ধ নেতাদের সন্ধান। রাজনীতিবিদেরা অনেকটাই আবেগে চলেন। কিন্তু পরামর্শদাতারা চলেন সংখ্যায়। ফলে দলের শীর্ষনেতৃত্বের কাছে জনসমর্থনের অনেক স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠল। ক্রমশ ‘দুয়ারে সরকার’, ‘লক্ষীর ভান্ডার’, ‘বাংলা নিজের মেয়েকে চায়’। খেলা ঘুরিয়ে দিল তৃণমূল। জমি পুনরুদ্ধার করে ফেলল ২০২১ সালের বিধানসভা এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে।

কী ভাবে কাজ করল আই-প্যাক?

আই-প্যাকের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে চারটি ইউনিট। ফিল্ড ইউনিটের কাজ হল নেতাদের উপর নজরদারি করা। ‘পলিটিক্যাল ইন্টেলিজেন্স’ ইউনিটের কাজ বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে স্থানীয় সমস্যা ও সমীকরণগুলো বোঝা। মিডিয়া ইউনিটের কাজ সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তাঁদের নানা চাহিদা মেটানোর চেষ্টা। ডিজিটাল ইউনিটের কাজ ব্লকে ব্লকে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ। এই চারস্তরীয় তথ্যের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ভাবে তৈরি হয় ‘ক্যাম্পেন স্ট্র্যাটেজি’, প্রার্থী চয়ন ইত্যাদি। রাজ্য থেকে বিধানসভা স্তর পর্যন্ত।

ওই সময় আই-প্যাকে কাজ করেছেন, এমন বেশ কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলেছে আনন্দবাজার ডট কম। তাঁদের বক্তব্য, ২০১৯ সালের আগে জেলার নেতারা কোথায় কী করছেন, সে বিষয়ে কোনও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে আসত না। ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচারেও দল অনেক পিছিয়ে ছিল। বিভিন্ন বিষয়ে প্রায়শই দলের কোনও কেন্দ্রীয় অবস্থান থাকত না। নেতারা যে যাঁর মতো বলতেন। বিভিন্ন এলাকায় প্রচারে কোনও সমন্বয়ও ছিল না। এই সব কিছুই কেন্দ্রীয় ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু হয়। বিভিন্ন বিষয়ে দলের অবস্থান হোয়াট্‌সঅ্যাপে চলে যায় ব্লক স্তর পর্যন্ত। যাতে সকলেই একসুরে কথা বলেন। একই সূত্রে বাঁধা হয়ে যান সহস্র ক্যাডার। সমস্ত রকম দলীয় বার্তা চলে যায় এক বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক, এমনকি শিক্ষানবিশ এবং ইউটিউবারদের কাছেও। ব্লক বা পৌর স্তরের অনুষ্ঠানে যাতে সব গোষ্ঠীর উপস্থিতি থাকে, তাই আগাম ফোন যায় স্থানীয় নেতাদের কাছে।

উপরের বার্তা যেমন তলায় নামে, তেমনই নীচের খবরও উপরে যায়। ব্লক বা পুর অঞ্চলের খবর সোজা চলে আসে শীর্ষনেতৃত্বের কাছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য একবার ফোন পেয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দফতর থেকে। প্রশ্ন করা হয়েছিল ভেড়ি দখলে তাঁর ভূমিকা নিয়ে। পরে তিনি সহকর্মীদের কাছে ক্ষোভপ্রকাশ করে বলেছিলেন, নিশ্চয়ই তাঁর বিরোধী গোষ্ঠীর কেউ আই-প্যাকের কাছে তাঁর নামে রিপোর্ট করে দিয়েছেন! এক আই-প্যাক কর্মী বলছিলেন, “নিজেদের দাপট ধরে রাখতে অনেক সময়েই স্থানীয় নেতারা পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র শীর্ষনেতৃত্বের কাছে তুলে ধরতেন না। সেই ব্যাপারটা বন্ধ হয়।” তিনি নিজে বাম সমর্থক, কিন্তু তৃণমূলের হয়ে কাজ করতে অসুবিধা হয় না। তাঁর যুক্তি, সাংবাদিকেরাও তো যখন যেখানে চাকরি করেন, সেখানে নিজেদের রাজনৈতিক বিশ্বাস পিছনে রেখে প্রতিষ্ঠানের চাহিদামতোই কাজ করেন।

২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের সাফল্যের পরে প্রশান্ত কিশোর আই-প্যাক ছাড়েন। বিহারে নিজের রাজনৈতিক দল বানান। কিন্তু তৃণমূল আর আই-প্যাককে ছাড়েনি। বাংলার এসআইআর পর্বে আই-প্যাকের গুরুত্ব কতটা বেড়েছে, তার নিদর্শন দলনেত্রী মমতা নিজে দিয়েছেন। ৮ জানুয়ারি, ২০২৬। সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়ি এবং দফতরে কেন্দ্রীয় এজেন্সির তল্লাশি শুরু হলে খোদ মুখ্যমন্ত্রী সেখানে হাজির হয়ে তাঁর প্রয়োজনীয় ফাইল বার করে নিয়ে আসেন। অভিযোগ করেন, বিধানসভা নির্বাচনের আগে দলের কৌশল এবং প্রার্থী তালিকা চুরির উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে ব্যবহার করা হচ্ছিল।

বর্তমানে কয়েকশো লোক কাজ করেন আই-প্যাকের সল্টলেক সেক্টর ফাইভের বিশাল অফিসে। অধিকাংশেরই বয়স ২৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। সেটা যেন একই সঙ্গে কলসেন্টার, ডেটা অ্যানালিসিস, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের মত বিবিধ কর্মক্ষেত্রের এক মিলনস্থল। কেউ ছিলেন সাংবাদিক, কেউ আইআইটি বা আইআইএম ডিগ্রিধারী, কেউ ডেটা বিশেষজ্ঞ। কারও দক্ষতা ব্র্যান্ড পরিচিতি নির্মাণে।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক আই-প্যাকের এক শীর্ষকর্তা আনন্দবাজার ডট কম-কে জানিয়েছেন, তাঁদের মূল কাজ মানুষের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিকল্পনার মেলবন্ধন। বিভিন্ন সমস্যার স্বরূপ ও সম্ভাব্য সমাধানগুলি তুলে ধরা। এই কাজের জন্য প্রতি জেলা ও বিধানসভা স্তরে আছেন তাঁদের ফিল্ড ও পলিটিক্যাল ইন্টেলিজেন্স বিভাগের কর্মচারীরা। তাঁরা সমন্বয় করছেন আই-প্যাকের কেন্দ্রীয় দফতর ও অভিষেকের দফতরের সঙ্গে জেলা ও বিধানসভা স্তরের নেতাদের মধ্যে, পরিকল্পনার সঠিক রূপায়ণের জন্য। এ ছাড়া রয়েছে নানা ধরনের ‘মাইক্রো ম্যানেজমেন্ট’। কোন বুথে কাকে দলে টানা গেলে বা কোন সমস্যার দ্রুত সমাধান করলে কিছু ভোট ঘুরে যেতে পারে। কোন বিষয়ে বিরোধী প্রচার নিয়ে তৎক্ষণাৎ জবাব দিতে হবে। সাংবাদিকতা ছেড়ে-আসা এক আই-প্যাক কর্মী বলছিলেন, “মাইনে ভালই। কেউ তো আর আগের চাকরির থেকে কম মাইনেতে যোগ দেয় না।” তবে কাজের প্রবল চাপ। এখন তো দিবারাত্রির ঠিক নেই। ভোর ৫টাতেও ফোন আসতে পারে কোনও সমস্যার দ্রুত সমাধানের জন্য, আবার রাত ২টোর সময়েও।

রাজনীতিতে কি পেশাদারিত্ব আগে ছিল না? বাম দলগুলিতে তো দীর্ঘদিন ধরেই সর্ব ক্ষণের কর্মী রাখার চল আছে। লেনিনের ভাষায়, তাঁরা হলেন ‘পেশাদার বিপ্লবী’। তাঁরা আর কোনও পেশায় থাকেন না। তাঁরা দলেরই কাজ করেন, দল থেকেই খরচ সামলানোর যৎসামান্য টাকা পান। তবে তাঁরা দলের চাকরি করেন না। কারণ, তাঁরা আদর্শগত ভাবে দলের সঙ্গে যুক্ত। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘেও কিছু ‘পূর্ণকালীন সংগঠক’ আছেন। তাঁদের বলা হয় ‘প্রচারক’। প্রচারকেরা বামপন্থী দলের হোলটাইমারদের মতোই তাঁদের জীবনযাপনের খরচের জন্য সংগঠনের উপর নির্ভরশীল। তবে তাঁরা সংখ্যায় কম। এ রাজ্যে মেরেকেটে জনাপঞ্চাশ। সঙ্ঘ মাঝেমাঝে বিজেপিকে এমন প্রচারক ধার দেয়। তুলনায় রাজ্যে সিপিএমে সবসময়ের কর্মীর সংখ্যা হাজারের উপর। কংগ্রেস ঘরানার দলে যাঁরা নেতৃস্থানীয়, তাঁদের সাধারণত অন্য পেশা বা আয়ের উৎস থাকে। তৃণমূলও মূলত সে রকমই। কিন্তু আই-প্যাকের কাজ অন্য রকম। সেখানে যাঁরা চাকরি করেন, তাঁরা রাজনীতি করতে আসেননি। তাঁরা এসেছেন রাজনীতিবিদদের ভোটে জিততে সাহায্য করতে। যেমন ‘বস্টন কনসালটেন্সি গ্রুপ’ বা ‘বিসিজি’। কিছু দিন ইমামিকে সর্ষের তেল বিক্রি করতে সাহায্য করে। তার পরে চলে যায় অন্যত্র, অন্য কোনওখানে। কাউকে কলম, মলম বা গাড়ি বিক্রিতে পরামর্শ দিতে। রাজনীতির ক্ষেত্রে এই পরামর্শ হয় ভোটারদের মনমেজাজ নিয়ে নানারকম সমীক্ষা করা ও প্রচারের বার্তা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত নানা বিষয়ে।

বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবারের অনেকে মনে করেন, এ সব কাজ ভাড়াটে পেশাদারি সংস্থার হাতে ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে নিজেদের আদর্শে উদ্বুদ্ধদের দিয়েই করানো ভাল। প্রাক্তন বিজেপি সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তো তা মনে করেনই। তাই তাঁদের ভরসা মূলত দলের ভিতরের আইটি সেল, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও তৃণমূল স্তরে সঙ্ঘ পরিবারের বিপুল বিস্তৃত নেটওয়ার্কের স্বয়ংসেবকদের উপর। এ ছাড়া আদর্শগত মিল থাকা পেশাদারদের নিয়ে বানানো কিছু পরামর্শদাতা সংস্থার সঙ্গে কাজ করেন তাঁরা। যেমন, ‘নেশন উইথ নমো’। এঁরা মূলত বুথভিত্তিক নানা তথ্য সংগ্রহ করে ভোটারদের মনোভাব বিশ্লেষণ করে সেই তথ্য দলের শীর্ষনেতৃত্বকে দেন এবং দলীয় বার্তা ডিজিটাল মাধ্যমে বুথ স্তর অবধি পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেন। রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক ক্ষেত্রে এঁদের কোনও ভূমিকা থাকে না।

এই ধরনের পেশাদারি কাঠামো দলের অভ্যন্তরে তৈরি করার কাজ অনেকটা এগিয়েছে তৃণমূলও। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরপরই আই-প্যাক ছেড়ে কিছু কর্মী সরাসরি তৃণমূলে যোগ দেন। দলীয় কর্মী নয়, বেতনভুক কর্মচারী হিসাবে। অভিষেকের দফতরে। পদমর্যাদায় অ্যাসোসিয়েট, সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট, মিডিয়া কো অর্ডিনেটর, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিস্ট ইত্যাদি। তৈরি হয় দলের নিজস্ব আইটি সেল। আই-প্যাকের এক কর্মী জানাচ্ছেন, ২০২১ সালের নির্বাচনের আগে পর্যন্ত আই-প্যাকের দু’জন ‘পয়েন্ট পার্সন’ অভিষেকের দফতরে বসতেন মূলত ‘ডিজিটাল হ্যান্ডলিং’ এবং মিডিয়া সমন্বয়ের জন্য। কিন্তু ২০২১ সালের অগস্ট-সেপ্টেম্বর থেকে অভিষেকের দফতরেই একাধিক পূর্ণসময়ের পেশাদার রাখা হয়েছে। ফলে আই-প্যাক কর্মীদের আর সেখানে বসতে হয় না। ওই কর্মীর বক্তব্য, “আই-প্যাকের মতো একটা কাঠামো এখন খানিকটা দলের মধ্যেই গড়ে নেওয়া হয়েছে।”

‘দিদির দূত’ নামক অ্যাপের মাধ্যমে ভোটার তালিকার হালহকিকত জানতেও একেবারে বুথ স্তর থেকে কেন্দ্রীয় স্তর অবধি সমন্বয় করা হয়। আই-প্যাকের পরিষেবা ছাড়া যে এসআইআর প্রক্রিয়ার মোকাবিলা করা অনেক কঠিন হত, তা মানছেন অনেক তৃণমূল নেতাই। এক তরুণ কর্মীর বক্তব্য, জেলার একটি পুর এলাকায় জঞ্জাল ও নিকাশিব্যবস্থা সংক্রান্ত ক্ষোভ ওয়ার্ড স্তরের সমস্যার বিষয়ে আই-প্যাকের সমীক্ষার জন্যই ধরা পড়েছিল। তাঁর আরও অভিমত, নেতাদের উপর নজরদারির ব্যাপারটা চাউর হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় স্তরে দুর্নীতি কমেছে। প্রসঙ্গত, কোনও কোনও তৃণমূল নেতাও এই মতামত সমর্থন করেন, অন্তত আংশিক ভাবে। আবার অন্য এক তৃণমূল নেতার মতে, সরকারি কাজে নজরদারির জন্য মাইনে-করা বেসরকারি কর্মচারী রাখতে হলে বুঝতে হবে প্রশাসন ও শাসকদল, দুইয়ের মধ্যেই দক্ষতা ও সদিচ্ছার ঘাটতি আছে।

চাকরিজীবীদের নিয়ে তৈরি একটি পেশাদার সংস্থা রাজ্য রাজনীতিতে কেন এত প্রভাবশালী হয়ে উঠল? কারণ, রাজ্যের শাসকদলের সাংগঠনিক কাঠামো তাদের প্রভাবে আমূল বদলে গিয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তারা এর আগে নানা দলের সঙ্গে কাজ করেছে। কিন্তু তৃণমূলের মতো এতটা গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক আর কারও সঙ্গেই তাদের তৈরি হয়নি। তৃণমূল আই-প্যাককে শুধু নির্বাচনী কৌশল প্রণয়ন ও জনমানসে ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার কাজেই ব্যবহার করেনি, সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের জন্যেও তাদের সহায়তা নিয়েছে দল। বস্তুত, আই-প্যাকের প্রভাব সম্পর্কে জনমানসে, বিশেষত রাজনৈতিক বৃত্তে, ধারণা কতটা প্রবল, তার আন্দাজ পাওয়া গিয়েছিল, গত বছর মার্চের একটি ঘটনায়। দলীয় এক ভার্চুয়াল বৈঠকে স্বয়ং অভিষেক জানিয়েছিলেন, তাঁর কাছে খবর আছে, তাঁর এবং আই-প্যাকের নাম নিয়ে অনেকে ‘তোলাবাজি’ করছেন।

কী ভাবে এত প্রভাবশালী হয়ে উঠল আই-প্যাক?

(চলবে)

I-Pac TMC Mamata Banerjee Abhishek Banerjee IPAC
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy