পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে গত ৯ মে শুভেন্দু অধিকারীর শপথগ্রহণের অব্যবহিত পরেই এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করে রাজ্যের ‘আক্রান্ত তৃণমূলকর্মীদের’ উদ্দেশে বার্তা দিয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূলের লোকসভার দলনেতা তথা সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক লিখেছিলেন, ‘কোথায় কী ঘটছে আমায় সরাসরি জানান। আমি আমার সাধ্যমতো পাশে দাঁড়াব।’
কিন্তু গোটা পশ্চিমবঙ্গ দূরঅস্ত্, নিজের লোকসভা কেন্দ্র ডায়মন্ড হারবারের অন্তর্গত ফলতাতেই পুনর্নির্বাচনের প্রচারপর্বে দেখা গেল না তাঁকে! মঙ্গলবার ভোটপ্রচারের শেষ দিনে তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানের সরে যাওয়ার নেপথ্যে দলের ‘সেনাপতি’র এই অনুপস্থিতিকে ‘প্রধান কারণ’ বলে চিহ্নিত করছেন দলেরই অনেকে। আর সেই সঙ্গে দলের অন্দরে উঠে আসছে নানা প্রশ্ন। ৪ মের পরে তৃণমূলের তরফে বার বার ‘ভোট পরবর্তী হিংসা’র অভিযোগ তোলা হলেও অভিষেকের ‘প্রতিবাদ’ কেন শুধু দলীয় বৈঠক আর সমাজমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ, ফলতা কাণ্ডের পরে তা নিয়ে দলের অন্দরে গু়ঞ্জন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।
মাত্র ১৫ দিন আগে বিধানসভা ভোটে প্রবল পদ্ম-হাওয়ায় ধরাশায়ী হয়েছে জোড়াফুল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের নেতা-কর্মীদের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে রাজ্যে। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দু’সপ্তাহ মোটেই যথেষ্ট সময় নয়। ফলে ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকে অভিষেকের কার্যত গৃহবন্দি হয়ে থাকার বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করার সময় এখন আসেনি বলেই তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের একাংশ মনে করছেন। তাঁদের মতে, ১৫ বছর ক্ষমতার থাকার পরে অকস্মাৎ নির্বাচনী বিপর্যয়ে মমতার মতো জননেত্রীকেও দৃশ্যত বিহ্বল লেগেছে। তাই অভিষেকের রাজনৈতিক যোগ্যতা নিয়ে এখনই চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা উচিত নয়।
কিন্তু এর জবাবে দলেরই আর একটা অংশের মুখে শোনা যাচ্ছে, ‘উঠন্তি মুলো পত্তনে চেনা যায়’ বা ‘মর্নিং শোজ় দ্য ডেজ’-এর মতো প্রবাদ। তাঁদের মতে, দলের দুর্দিনে প্রকৃত নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার যে সুযোগ ফলতা পুনর্নির্বাচনে অভিষেক পেয়েছিলেন, তার সদ্ব্যবহার করতে শোচনীয় ভাবে ব্যর্থ হলেন তিনি। আর সেই সঙ্গে প্রশ্ন তুলে দিলেন নিজের ‘নেতৃত্বদানের যোগ্যতা’ নিয়েও। ভবিষ্যতে বারে বারেই ফলতা কাণ্ডে অভিষেকের ভূমিকা রাজনৈতিক ভাবে তাঁর বিড়ম্বনার কারণ হতে পারে বলে ওই অংশের মত। তাঁরা মনে করছেন, ‘বিরোধী’ ভূমিকার সূচনাপর্বেই ফলতায় হাল ছাড়া মনোভাব দেখিয়ে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ‘ডাহা ফেল’ করেছেন।
তৃণমূলের এই অংশ অভিষেকের ‘ভোট-পরবর্তী অন্তর্ধানে’র প্রসঙ্গ তুলে প্রতিতুলনায় আনছেন ২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বিপর্যয়ের পরে শুভেন্দুর ভূমিকার কথাও। পাঁচ বছর আগের সেই নির্বাচনে নন্দীগ্রামে ‘সম্মানের লড়াইয়ে’ মমতাকে হারিয়েছিলেন শুভেন্দু। কিন্তু গোটা রাজ্যের অধিকাংশ জেলার পাশাপাশি ‘অধিকারী গড়’ হিসাবে পরিচিত পূর্ব মেদিনীপুরেও বিজেপিকে পিছনে ফেলে দিয়েছিল তৃণমূল। ওই জেলার ১৬টি আসনের মধ্যে তৃণমূল জিতেছিল ৯টিতে। বিজেপির ঝুলিতে এসেছিল ৭টি। শুভেন্দু দু’বার (২০০৯ এবং ২০১৪) যে লোকসভা কেন্দ্র থেকে জিতেছিলেন, সেই তমলুক লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত ৭টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ৩টি (নন্দীগ্রাম, ময়না এবং হলদিয়া) বিজেপি জিতেছিল। নন্দীগ্রামে জেতার পরেও হলদিয়ার গণনাকেন্দ্রে মারমুখী তৃণমূল সমর্থকদেরও মোকাবিলা করতে হয়েছিল তাঁকে।
তার পর থেকে গত পাঁচ বছরে রায়দিঘি থেকে চন্দ্রকোনা, পুরুলিয়া থেকে হাজরা মোড় পর্যন্ত রাজ্যের কয়েক ডজন এলাকায় তৃণমূলের বিক্ষোভের মুখোমুখি হতে হয়েছে শুভেন্দুকে। বিরোধী দলনেতা হিসাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের জন্য পুলিশি অনুমতি না-পেয়ে শতাধিক বার ছুটতে হয়েছে আদালতে। এমনকি, অভিষেকের ‘জ়েড প্লাস’ নিরাপত্তা প্রত্যাহার বা তার সংস্থার ‘বেআইনি নির্মাণের’ বিরুদ্ধে নোটিসকে তৃণমূল ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলে চিহ্নিত করলেও, ইতিহাস বলছে পাঁচ বছর আগে বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের বিপুল জয়ের পরেই কাঁথি পুরসভা থেকে ত্রিপল চুরির অভিযোগে শুভেন্দুর ভাই সৌমেন্দুর (বর্তমানে বিজেপি সাংসদ) বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছিল এফআইআর!
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ বলছেন, দীর্ঘ তিন দশক ধরে সিপিএমের বিরুদ্ধে কার্যত একক ভাবে ধারাবাহিক লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেওয়া মমতা তো দূরের কথা, শুভেন্দুর সঙ্গেও অভিষেকের কোনও তুলনাই চলে না। ২০০৬ সালে রাজ্য ঝুড়ে ‘ব্র্যান্ড বুদ্ধ’ ঝড়ের মধ্যে দক্ষিণ কাঁথি আসন থেকে জিতে বিধানসভায় প্রবেশাধিকার আদায় করেছিলেন শুভেন্দু। ২০০৭ সালে সামনের সারিতে থেকে নন্দীগ্রামের জমিরক্ষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বাম জমানায় ‘দোর্দণ্ডপ্রতাপ’ লক্ষ্মণ শেঠকে হারিয়ে ২০০৯ সালে শুভেন্দু হয়েছিলেন তমলুকের সাংসদ। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও বিপুল ভোটে জিতেছিলেন তিনি। সেই ভোটেই ডায়মন্ড হারবার থেকে প্রথম জিতে সাংসদ হন অভিষেকও। তার তিন বছর আগেই রাজ্যে ক্ষমতায় চলে এসেছিল তৃণমূল। অর্থাৎ, দলের সুদিনেই রাজনীতিতে আবির্ভাব ঘটেছিল ‘যুবরাজের’।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে ১৮টি আসন জিতে নিয়েছিল বিজেপি। দিল্লিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন মোদী। সেই ঢেউয়ের ভর করে রাজ্যে বহু জায়গায় তৃণমূলকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয় পদ্মশিবির। সেই পর্বে তৃণমূলের ‘ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে’ সামনের সারিতে ছিলেন শুভেন্দুই। বিজেপির দাপটে বন্ধ হয়ে যাওয়া একের পর এক তৃণমূল দফতরে নতুন করে জোড়াফুলের পতাকা তুলতে ছুটে গিয়েছিলেন তিনি। তখনও অভিষেক ছিলেন অন্তরালেই! ঠিক যেমন ২০২৪-এর অগস্ট-পরবর্তী কয়েক মাসে, আরজি কর কাণ্ড ঘিরে উত্তাল পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকার বা দলের পাশে দেখা যায়নি ‘সেনাপতি’কে।
আরও পড়ুন:
যেমন দেখা গেল না, ভোট-ভরাডুবির পরে ফলতার পুনর্নির্বাচনের প্রচারেও। গত রবিবার ফলতায় প্রচারে গিয়ে তাঁর ওই অনুপস্থিতিকে কটাক্ষ করে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছিলেন, ‘‘পুলিশ নেই, তাই নেতা নেই। কনভয় নেই, তাই হুঙ্কার নেই! আমরা তো বলছি, আপনি আসুন ফলতায়। প্রচার করুন। আমাদের কর্মীরা, জেলা সভাপতি ফুল নিয়ে শাঁখ বাজিয়ে আপনাকে স্বাগত জানাবেন।’’ ডায়মন্ড হারবারের সাংসদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘‘আপনি আসুন, হে বীর তোমার আসন পূর্ণ করো। তোমাকে আমরা মিস্ করছি। ভীষণ... তুমি এসো।’’ তার আগের দিন, শনিবার ফলতার সভা থেকে ‘তৃণমূলের পুষ্পা’ জাহাঙ্গিরকে কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বলেছিলেন, ‘‘ভোটটা আগে মিটুক। ওর ব্যবস্থা আমি নিজে করব, সেই দায়িত্ব আমার।’’ মঙ্গলবার প্রচারের শেষ দিনেও ফলতায় গিয়ে শুভেন্দু নাম না-করে বিঁধেছেন অভিষেককে। বলেছেন, ‘‘ভাইপোবাবু এলেন না কেন প্রচারে? আপনার প্রার্থী কোথায়? ‘সো কল্ড সেলফ্ ডিক্লেয়ার্ড পুষ্পা!’ জানে পোলিং এজেন্ট পাবে না। তাই পালিয়েছে!’’
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ধাক্কা খাওয়ার পরে প্রশান্ত কিশোরের সংস্থা আই-প্যাককে পরামর্শদাতা সংস্থা হিসাবে নিয়োগ করেছিল তৃণমূল। ঘটনাচক্রে, তার পর থেকেই দলের অন্দরে ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিলেন অভিষেক। আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে তার ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’। যে মডেলে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে ৭ লক্ষ ১০ হাজার ৯৩০ ভোটে জিতে রেকর্ড গড়েছিলেন তিনি। ২০২১-সালে ৪০ হাজার ভোটে জেতা ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে ‘লিড’ নিয়েছিলেন ১ লক্ষ ৬৮ হাজার ৩৭২ ভোটের! দু’বছরের মাথাতেই অভিষেকের ‘ঘনিষ্ঠ অনুগামী’ জাহাঙ্গির সেই ফলতাতেই ‘ওয়াক ওভার’ দিয়ে দিলেন শুভেন্দুর দলকে। আর সেই সঙ্গে প্রশ্নের মুখে ফেললেন নেতার নেতৃত্বগুণকে!