রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর থেকে বার বার প্রশ্ন উঠেছে তাঁর সহ-অভিনেতা ও প্রযোজনা সংস্থার ভূমিকা নিয়ে। প্রয়াত অভিনেতার বাড়িতে নানা মানুষের ভিড় হলেও, দেখা যায়নি তাঁর সঙ্গে ‘ভোলেবাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের কাজে যুক্ত প্রায় কাউকেই। সেই সমালোচনায় বেশ কয়েক বার উঠে এসেছে অভিনেতা অম্বরীশ ভট্টাচার্যের নামও।
যে ধারাবাহিকের শুটে তালসারি গিয়ে ঘটে গেল দুর্ঘটনা, তাতে রাহুলের বাবার চরিত্রে অভিনয় করছিলেন অম্বরীশ। শুটিংয়ের জন্য তালসারিতে গিয়েছিলেন তিনিও। কিন্তু রাহুলের মৃত্যুর খবর ছড়ানোর পর থেকে কেন এক বারও তাঁকে কোথাও দেখা গেল না? এই প্রশ্ন বার বার উঠে এসেছে এই কয়েক দিনে। অবশেষে দুর্ঘটনার আট দিন পরে মুখ খুললেন অম্বরীশ। তিনি বলেন, ‘‘সোমবার ন’দিন হল রাহুল চলে গিয়েছে। এই কয়েক দিনে আমি কেন কথা বললাম না? কেন রাহুলের বাড়িতে গেলাম না? কেন কারও ফোন তুললাম না? সবাই অজস্র প্রশ্ন তুলছেন। আমার সহকর্মীরা আমাকে ভুলও বুঝছেন। তাঁদের আমি দোষ দিই না। কিন্তু মানসিক স্থিতি আমার ছিল না। রাহুলের শেষযাত্রায় উপস্থিত থাকার জন্য যে মনের জোর দরকার, সেটাও ছিল না। কাউকে বলে হয়তো বোঝাতে পারব না।’’
তিনি আরও বলতে থাকেন, ‘‘আগের সপ্তাহেও তো ওর সঙ্গে একই মেকআপ রুমে বসেছিলাম। গল্প করছিলাম। গত দু’মাস সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমরা দু’জনে প্রায় একসঙ্গেই কাটিয়েছি।’’ জানান, পর্দায় বাবা-ছেলের সম্পর্কের অভিনয় করতে করতে অনেকটা আপন হয়ে গিয়েছিলেন তাঁরা।
অম্বরীশের বক্তব্য, ‘‘সে দিন আমাদের গাড়ি আগে ছেড়ে দিয়েছিল। যখন খবরটা পাই, তখন কোলাঘাট ছাড়িয়ে চলে এসেছে আমাদের গাড়ি। এখন মনে হচ্ছে, হয়তো গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে গেলে হত। কিন্তু, সেই সময় আচমকা রাহুলের খবর পেতেই সবটা অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বুঝে উঠতে পারিনি, কী করলে ঠিক হবে!’’ অম্বরীশের বক্তব্য, গত রবিবার, ২৯ মার্চ রাহুলের আগেই কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল তাঁর। শেষ শট দিয়ে গাড়িতে উঠে পড়েছিলেন বলে জানান তিনি। তখনও রাহুলদের শুটিং চলছিল।
এত দিন একসঙ্গে কাজ করলেন, তার পর এমন দুর্ঘটনা, অম্বরীশের কি এক বারও মনে হল না রাহুলের জন্য সামনে এসে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা? এই সব নানা প্রশ্ন উঠছে। অম্বরীশ জানান, রাহুলের মৃত্যুর তদন্ত হয়েছে। ওর বিজয়গড়ের বাড়িতে উপচে পড়া ভিড়ের ছবি, সবটাই তিনি দেখেছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘‘কিন্তু, রাহুলকে ওই অবস্থায় দেখার ক্ষমতা আমার ছিল না। কী ভাবে মুখোমুখি হব প্রিয়াঙ্কার? কী ভাবে ছোট্ট সহজের সামনে গিয়ে দাঁড়াব? এই প্রশ্নগুলো অনবরত ঘুরপাক খাচ্ছিল মাথায়। তাই সাহস করে আর গিয়ে উঠতে পারিনি। মাসিমার মুখোমুখি দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই। কী বলব?’’
ঘটনার পরে রাহুলের অনুরাগী থেকে সাধারণ মানুষ— অনেকেই আশা করেছিলেন, সে দিনের ঘটনার পরে তাঁর সহ-অভিনেতারা অন্তত শুটিংয়ের নিরাপত্তাহীনতা নিয়েও মুখ খুলবেন। তবে অম্বরীশ সোমবার বলেছেন, ‘‘ওই ঘটনার পরেই ঠিক করে নিয়েছিলাম, আমার কী করা উচিত। এই মুহূর্তে ‘ম্যাজিক মোমেন্টস্’ প্রযোজনা সংস্থার দু’টি ধারাবাহিক ‘চিরসখা’ এবং ‘ভোলেবাবা পার করেগা’-তে অভিনয় করছি আমি। কিন্তু, রাহুলকে হারানোর পরেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আর এই দুই ধারাবাহিকে অভিনয় করব না। আসলে, আমি আর ছোটপর্দাতেই কাজ করতে চাই না। গত মঙ্গলবারই, প্রযোজনা সংস্থার প্রোডাকশন ম্যানেজারকে ফোন করেছিলাম। তখনই নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছি। লীনাদির (লীনা গঙ্গোপাধ্যায়) সঙ্গে রোজ তো আমাদের কথা হত না, তাই এ ক্ষেত্রেও ওঁকে আর কিছু জানাইনি। ওঁরাও আমাকে কিছু বলেননি। কারণ, আমি একজন ‘ফ্রিল্যান্স’ শিল্পী। তাই আমাকে জোর করতে ওরা পারবে না।’’
রাহুলের মৃত্যুর জেরে শুটিংয়ে কলাকুশলীদের নিরাপত্তাহীনতার প্রসঙ্গ তুলে রবিবারই আর্টিস্টস ফোরাম অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই প্রসঙ্গে টেনে অম্বরীশ নিজেই বলেন, ‘‘এই যে সিদ্ধান্ত হয়েছে কর্মবিরতির, এতে আমি সহমত। এই সমস্যার কোনও স্বচ্ছ সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কিছু করা ঠিক হবে না। সত্যিই তো! আমাদের নিরাপত্তা কই? রাহুলের এই ঘটনার পরে নানা প্রশ্ন উঠছে।’’
ঘটনার দিন তালসারির সমুদ্রে শুটিংয়ের কোনও প্রশাসনিক অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে ওডিশা পুলিশ জানিয়েছিল আগেই। এই প্রসঙ্গেও শিল্পী হিসেবে নিজেদের ঘাটতির কথা স্বীকার করে নিয়ে অম্বরীশ বলেন, ‘‘যখন আমরা তালসারিতে গিয়েছিলাম শুটিং করতে, আমরা তো তার আগে প্রশ্ন করিনি আদৌ পুলিশি অনুমতি আছে কি না। কোনও আউটডোরে গিয়েই এই ধরনের প্রশ্ন সাধারণত করি না। এই বারেও করিনি। এই সাত দিনে আমার মনেও কিন্তু অনেক প্রশ্ন। রাতে ঘুমোতে পারছি না। এখনও অস্বস্তি করছে।’’
শেষে তিনি বলেন, ‘‘আমি আর সত্যিই ধারাবাহিকে কাজ করব না। একা মানুষ, আশা করি অসুবিধা হবে না। জানি, আর্থিক সমস্যা কিছুটা হলেও হতে পারে। কিন্তু যত দিন না কোনও স্বচ্ছ সমাধান হচ্ছে, আমিও এই কর্মবিরতির পক্ষে। এই ভাবে আর কোনও সহকর্মীকে হারাতে চাই না।’’