Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৪ জুলাই ২০২২ ই-পেপার

URL Copied

বিনোদন

জন্মেই মাতৃহারা, বাবার অবজ্ঞা, মাদকের নেশা কাটিয়ে আলোয় ফেরেন স্মিতা পাটিল-রাজ বব্বরের ছেলে

নিজস্ব প্রতিবেদন
২৫ জুলাই ২০২০ ১৭:৪৪
তাঁর জন্মের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে মায়ের চলে যাওয়া। বাবার অবজ্ঞা বুকে নিয়ে কেটেছে শৈশব। রাগে-দুঃখে তাই নামের পাশ থেকে ছেঁটে ফেলেছিলেন বিখ্যাত বাবার পদবীও। খড়কুটোর মতো সময়কে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মাদকাসক্তি ও একাকিত্ব ক্রমশ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল তাঁকে। সেখান থেকে ফের আলোয় ফেরেন প্রতীক বব্বর।

কিংবদন্তি অভিনেত্রী স্মিতা পাটিল ও রাজ বব্বরের ছেলে প্রতীক বব্বর। প্রথম স্ত্রী নাদিরা, ছেলে আর্য এবং মেয়ে জুহিকে ছেড়ে স্মিতা পাটিলকে বিয়ে করেছিলেন রাজ বব্বর। ১৯৮৬ সালে তাঁদের ছেলে প্রতীকের জন্ম হয়।
Advertisement
কিন্তু মায়ের সান্নিধ্য পাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি প্রতীকের। তাঁর জন্মের ১৪ দিনের মাথায় প্রসবজনিত সমস্যার জেরে মারা যান স্মিতা। তার পরই মাথার উপর থেকে সরে যায় বাবার হাতও।

স্মিতার মৃত্যুর পর ফের প্রথম স্ত্রী ও ছেলেমেয়ের কাছে ফিরে যান রাজ বব্বর। শোনা যায়, স্মিতা চলে যাওয়ায় প্রতীকের প্রতি নজর দেওয়ার তাগিদই অনুভব করেননি তিনি।
Advertisement
দিদা বিদ্যাতাই পাটিল এবং দাদু শিবাজিরাও গিরিধার পাটিলের কাছেই মানুষ হন প্রতীক। সারা ক্ষণ প্রতীককে আগলে রাখতেন তাঁরা। মেয়ের নামের সঙ্গে মিলিয়ে নাতির নাম স্মিত রাখেন তাঁরা। স্কুলে পড়ার সময় এই নামেই পরিচিত ছিলেন প্রতীক। পরে নাম পাল্টে নেন তিনি।

বাবা রাজ বব্বরের প্রতি মনে ক্ষোভ জন্মায় প্রতীকের। জানতে পারেন, নিজের কাজ এবং রাজনৈতিক কেরিয়ার নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিলেন রাজ যে, শেষ সময়ও স্মিতাকে সময় দেননি।

মা-বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত প্রতীককে আদর-যত্নেই বড় করেন তাঁর দাদু-দিদা। সারা ক্ষণ প্রতীককে আগলে রাখতেন তাঁরা। কিন্তু স্কুলে পড়ার সময় মাত্র ১৩ বছর বয়সে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে প্রথম বার মাদক সেবন করেন প্রতীক। তার পর থেকে নিয়মিত মাদক নিতে শুরু করেন তিনি।

পরে এ নিয়ে একাধিক সাক্ষাৎকারে মুখ খোলেন প্রতীক। জানান, দাদু-দিদার ভালবাসা পেলেও, ছোটবেলা থেকেই একাকিত্বে ভুগতেন তিনি। সেই অর্থে তেমন বন্ধু-বান্ধব ছিল না তাঁর। তাই একাকিত্ব কাটাতে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন তিনি।

নিয়মিত মাদক নেওয়ার ফলে প্রতীকের আচরণেও পরিবর্তন আসে। যখন তখন মেজাজ গরম হয়ে যেত তাঁর। অকারণে ঠান্ডা লাগত কখনও, আবার কখনও গরম লাগত। কখনও রাতের পর রাত জেগে থাকতেন, কখনও আবার এমন ঘুমোতেন যে দিন-রাতের হুঁশ থাকত না। সেইসঙ্গে শরীরে অসম্ভব যন্ত্রণা অনুভব করতেন।

কৈশোরে এত কিছুর মধ্যেই তাঁর জীবনে প্রথম প্রেম আসে। কিন্তু মাদকাসক্তির জেরে সেই ভালবাসাও স্থায়ী হয়নি। প্রথম প্রেম ভেঙে যাওয়ার ধাক্কা সামলাতে না পেরে প্রতীক জ্বলন্ত সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়ে নিজের হাতে প্রেমিকার নামও লেখেন।

প্রতীককে এই অন্ধকার থেকে বার করে আনতে হলে, চেনা পরিবেশ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে বলে সেই সময় মনস্থির করেন তাঁর দাদু-দিদা। সেই মতো অজমেঢ়ের একটি কলেজে প্রতীককে পাঠিয়ে দেন তাঁরা। শুরুতে আপত্তি করলেও, দাদু-দিদার এই সিদ্ধান্ত মেনে নেন প্রতীক। কিন্তু এক মাসের মধ্যে অজমেঢ় তাঁর কাছে অসহ্য হয়ে ওঠে। বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দেন, আর এক দিনও অজমেঢ়ে থাকতে হলে আত্মহত্যা করবেন।

প্রতীকের মুখে এ কথা শুনে তাঁকে আর সেখানে রাখার সাহস পাননি বিদ্যাতাই এবং শিবাজিরাও গিরিধার পাটিল। প্রতীককে মুম্বই ফিরিয়ে আনেন তাঁরা। সেখানেই নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেন প্রতীক। মুম্বইয়ে সুভাষ ঘাইয়ের ফিল্ম স্কুলে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু মাত্র এক দিন ক্লাস করার পর সেখানে যাওয়াও বন্ধ করে দেন।

এর পর কিশোর নমিতের কাছে অভিনয়ের ক্লাস নিতে শুরু করেন প্রতীক। ভর্তি হন নাচের স্কুলেও। সেই সময়ই ছেলেকে ইন্ডাস্ট্রিতে লঞ্চ করতে এগিয়ে আসেন রাজ বব্বর। তাঁর জন্য ছবি প্রযোজনা করতে চান বলে প্রতীককে জানান তিনি। কিন্তু জন্মের পর যে বাবা তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, তাঁর সাহায্যে নিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে পা রাখতে রাজি হননি প্রতীক।

নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে তাই অ্যাডগুরু প্রহ্লাদ কক্করের কাছে গিয়ে হাজির হন প্রতীক। স্মিতা পাটিলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন প্রহ্লাদ। প্রহ্লাদের সংস্থা ‘জেনেসিস’-এর নামকরণও করেছিলেন স্মিতা। কিন্তু প্রথম দিনই প্রহ্লাদের অফিস থেকে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে যান প্রতীক। সেখানে তাঁকে দিয়ে বাথরুম পরিষ্কার করানো হয়েছে বলে দিদাকে জানান তিনি।

প্রতীককে তাঁর দিদা বোঝান, জীবনে সাফল্য পেতে গেলে বহু ঘাত-প্রতিঘাত আসে। কিন্তু হাল ছাড়লে চলে না। তাতে সাহস পেয়ে ফের প্রহ্লাদের অফিসে ফিরে যান প্রতীক। ধীরে ধীরে সেখানে সকলের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায় তাঁর। সেই সময় প্রহ্লাদকে নিজের ইচ্ছের কথা জানান প্রতীক। জানান, তিনি অভিনেতা হতে চান।

প্রতীককে চকোলেটের একটি বিজ্ঞাপনে সুযোগ দেন প্রহ্লাদ। তার পর একে একে পেপসি এবং আরও নানা বিজ্ঞাপনে মুখ দেখাতে শুরু করেন প্রতীক। সেই সময় পরিচালক আব্বাস টায়ারওয়ালার স্ত্রী পাখি প্রহ্লাদ কক্করের অফিসে আসেন। আমির খানের প্রযোজনায় তৈরি ‘জানে তু ইয়া জানে না’ ছবিতে এক জন পার্শ্ব অভিনেতার প্রয়োজন বলে জানান।

এই ছবির মাধ্যমে ভাগ্নে ইমরানকে বলিউডে ব্রেক দিচ্ছিলেন আমির খান। ছবির নায়িকা জেনেলিয়া ডি’সুজার ভাইয়ের চরিত্রের অডিশন দেন প্রতীক। তাতে উতরে যান তিনি। ছবিতে মাত্র পাঁচটি দৃশ্যে প্রতীককে দেখা যায়। খুব বেশি সংলাপও ছিল না তাঁর। কিন্তু শুধু মাত্র অভিনয় ক্ষমতার জোরে সকলের মন জয় করে নেন তিনি।

প্রতীকের অভিনয় এতটাই পছন্দ হয় আমির খানের যে, স্ত্রী কিরণ রাওয়ের পরিচালনায় ‘ধোবি ঘাট’ ছবিতে প্রতীককে সুযোগ দেন আমির। ছবিটি বক্সঅফিসে সাফল্য পায়নি। কিন্তু প্রতীকের অভিনয় প্রশংসিত হয়। এর পর একে একে ‘আরক্ষণ’, ‘মাই ফ্রেন্ড পিন্টো’, ‘দম মারো দম’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করেন প্রতীক।

এই সময় নামের পাশ থেকে বাবার পদবী ছেঁটে ফেলেন প্রতীক। বাবার পরিচয়ে লোক তাঁকে চিনুক, তা চাননি তিনি। কিন্তু রাজ বব্বরের প্রথম পক্ষের ছেলে আর্য এতে চটে যান। প্রকাশ্যে প্রতীককে কটাক্ষ করেন তিনি। সেই সময় প্রতীক জানান, একমাত্র অভিষেক বচ্চনকেই তিনি দাদা বলে মানেন। সেই সূত্রে অমিতাভ তাঁর বাবার মতো। এর বাইরে আর কাউকে পরিবারের অংশ বলে মনে করেন না।

২০১৭ সালে ‘এক দিওয়ানা থা’ ছবিতে অভিনয় করেন প্রতীক। শুটিং চলাকালীন ছবির নায়িকা অ্যামি জ্যাকসনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাঁর। দু’জনে লিভ ইনও করেন। অ্যামি তাঁর জীবনে আসায় একাকিত্ব কাটিয়ে বেরিয়ে আসেন প্রতীক। ভিন্ দেশ থেকে ভারতে এসে প্রতীকের কাছে নিরাপদ আশ্রয় পান অ্যামিও। দু’জনের সম্পর্ক এতটাই গভীর ছিল যে, নিজেদের হাতে ‘মেরা প্যায়ার, মেরা প্রতীক’ এবং ‘মেরা প্যায়ার, মেরা এমি’ লিখে ট্যাটুও করিয়েছিলেন তাঁরা।

কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই অ্যামি ও প্রতীকের সম্পর্ক ভেঙে যায়। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর নিজের হাত থেকে প্রতীকের নামের ট্যাটুও মুছে ফেলেন অ্যামি। তাতে এতটাই ভেঙে পড়েন প্রতীক যে, ফের মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন তিনি। তাতে কাজের উপরও প্রভাব পড়তে শুরু করে। প্রায়শই দেরি করে শুটিংয়ে পৌঁছতেন তিনি। কখনও কখনও দু’-তিন দিন খোঁজও মিলত না তাঁর।

প্রতীকের এই আচরণ নিয়ে বলিউডে কানাঘুঁষো শুরু হয়ে সময় লাগেনি। এর ফলে একের পর এক বিগ ব্যানারের ছবি হাতছাড়া হয়ে যায় প্রতীকের। এই সময়ই দিদা বিদ্যাতাইয়ের মৃত্যু আরও অন্ধকারে ঠেলে দেয় তাঁকে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, মাদক না পেলে নিজেকে আঘাতও করতে শুরু করেন তিনি। একসময় নিজের এই অভ্যাসই তাঁকে নতুন করে ভাবিয়ে তোলে। নিজেকে ফের গুছিয়ে নিতে তাই রিহ্যাবে ভর্তি হন তিনি।

বেশ কয়েক মাস রিহ্যাবে থাকার পর মাদকাসক্তি পিছু ছাড়ে প্রতীকের। সম্পূর্ণ অন্য মানুষ হিসেবে রিহ্যাব থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। কিন্তু তত দিনে তাঁর কেরিয়ারের অনেক ক্ষতি হয়ে গিয়েছে। নতুন করে সব কিছু শুরু করতে তাই ফের অভিনয়ের ক্লাসে ভর্তি হন তিনি। নায়কের চরিত্রে পাওয়া মুশকিল জেনে পার্শ্বচরিত্রের দিকে ঝোঁকেন তিনি। ঘষে মেজে নিজের চেহারাতেও বদল আনেন।

২০১৮ সালে ‘মুল্‌ক’ ছবির মাধ্যমে বলিউডে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করেন প্রতীক। এর পর একে একে ‘বাগি-২’, ‘মিত্রোঁ’, ‘ছিঁছোড়ে’-র মতো ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। রণবীর কপূর ও আলিয়া ভট্টের ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ ছবিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা যাবে তাঁকে।

২০১৯ সালে বহুজন সমাজ পার্টির নেতা পবন সাগরের মেয়ে ও দীর্ঘদিনের বান্ধবী সানিয়া সাগরের সঙ্গে সাতপাকে বাঁধা পড়েন প্রতীক। অতীতের তিক্ততা ভুলে তাঁর বিয়েতে যোগ দেন রাজ বব্বর, আর্য এবং তাঁদের গোটা পরিবার। উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতীও তাঁদের বিয়ের অনুষ্ঠানে হাজির হন।

কিন্তু ২০২০-র শুরুর দিকে সানিয়া ও প্রতীকের দাম্পত্যে চিড় ধরেছে বলে শোনা যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় একে অপরকে আনফলো করে দেন তাঁরা। এমনকি দু’জনে আলাদা থাকতেও শুরু করেন বলে জানা যায়। কিন্তু প্রতীক ও সানিয়া এ নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খোলেননি।