মহাসাগরে বাড়ছে ‘নিঃশব্দ খুনি’দের দাপাদাপি! এ বার পরমাণু ডুবোজাহাজের সংখ্যাতেও আমেরিকাকে টপকে যাওয়ার পথে চিন
আমেরিকার চেয়েও দ্রুত গতিতে একের পর এক পরমাণু ডুবোজাহাজ তৈরি করে নৌবাহিনীর হাতে তুলে দিচ্ছে চিন। শুধু তা-ই নয়, ডুবোজাহাজের বহরে অচিরেই যুক্তরাষ্ট্রকে ছাপিয়ে যাবে বেজিং। ব্রিটিশ থিঙ্ক ট্যাঙ্কের এ-হেন রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসতেই উদ্বেগ বেড়েছে ওয়াশিংটনের।
ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরে এ বার দুই হুজুরের লড়াই! কারণ, মহাশক্তিধর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সমুদ্রের লড়াইয়ে ছুঁয়ে ফেলেছে চিন। গত কয়েক বছর ধরে ক্রমাগত পরমাণু ডুবোজাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি করছিল ড্রাগন। ফলস্বরূপ, আমেরিকার চেয়েও বড়সড় ‘নিঃশব্দ ঘাতক’-এর (পড়ুন সায়লেন্ট কিলার) বহর হাতে পেতে চলেছে বেজিঙের নৌবাহিনী। এর জেরে ওয়াশিংটনের বাড়ল উদ্বেগ। কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে নয়াদিল্লিরও।
বেজিঙের পরমাণু ডুবোজাহাজের বহর সম্প্রসারণ নিয়ে সম্প্রতি একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে ব্রিটিশ থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ়’ (আইআইএসএস)। সেখানে বলা হয়েছে, শেষ পাঁচ বছরে ‘নিঃশব্দ ঘাতক’-এর উৎপাদন মারাত্মক হারে বাড়িয়েছেন চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। শুধু তা-ই নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত গতিতে সেগুলিকে মোতায়েন করতে সক্ষম হয়েছে ড্রাগনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক, যা চিন্তার।
পরমাণু ডুবোজাহাজ মূলত দু’টি শ্রেণির হয়ে থাকে। একটিকে বলা হয়, ‘শিপ সাবমার্সিবল নিউক্লিয়ার’ বা এসএসএন। সংশ্লিষ্ট ডুবোজাহাজগুলি আণবিক শক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়। তবে এর মাধ্যমে কোনও পরমাণু হামলা করা যায় না। দ্বিতীয় শ্রেণিটির নাম ‘শিপ সাবমার্সিবল ব্যালেস্টিক নিউক্লিয়ার’ বা এসএসবিএন। হাজার হাজার কিলোমিটার পাল্লার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম এই ডুবোজাহাজের সাহায্যে অনায়াসে চালানো যায় আণবিক আক্রমণ।
আইআইএসএস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২১-’২৫ সালের মধ্যে পরমাণু শক্তিচালিত ডুবোজাহাজের বহর আমেরিকার চেয়ে দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি করেছে চিন। যদিও গুণগত মানের নিরিখে যুক্তরাষ্ট্রের থেকে এখনও পিছিয়ে আছে বেজিং। কিন্তু তা সত্ত্বেও ‘নিঃশব্দ ঘাতকের’ এই হারে সংখ্যাবৃদ্ধি সংঘাত পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের বিপদ বাড়াতে পারে। পাশাপাশি, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য হারানোর আশঙ্কাও থাকছে আমেরিকার।
ব্রিটিশ থিঙ্ক-ট্যাঙ্কটির সমীক্ষকেরা জানিয়েছেন, শেষ পাঁচ বছরে দুই ধরন মিলিয়ে অন্তত ১০টা পরমাণু ডুবোজাহাজ বহরে শামিল করেছে চিনের ‘পিপল্স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ নৌবাহিনী। এর মধ্যে রয়েছে টাইপ-০৯৪ বা জ়িন ক্লাসের এসএসবিএন। এ ছাড়া টাইপ-০৯৩বি বা শ্যাং ক্লাসের আত্মমণাত্মক এসএসএন হাতে পেয়েছে তারা। ড্রাগনের ডুবোজাহাজগুলির ওজন কমবেশি ৭৯ হাজার টন বলে জানা গিয়েছে।
আরও পড়ুন:
অন্য দিকে, এই সময়সীমার মধ্যে সাতটি পরমাণু ডুবোজাহাজ বহরে শামিল করতে পেরেছে মার্কিন নৌসেনা। ৫৫ হাজার টনের ওই ‘নিঃশব্দ ঘাতক’গুলির ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও টর্পেডোর মতো হাতিয়ার বহনের সক্ষমতা তুলনামূলক ভাবে বেশি। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ২০১৬-’২০ সালের মধ্যে হালকা ওজনের (পড়ুন ২৩ হাজার টন) তিনটি ডুবোজাহাজ প্রায় একসঙ্গে তৈরি করে ফেলে চিনের প্রতিরক্ষা সংস্থা। ঠিক তখনই পিছিয়ে পড়ে ওয়াশিংটন।
‘বুমটাইম ইন বোহাই’ শিরোনামে প্রকাশিত আইআইএসএস রিপোর্টে বলা হয়েছে, দ্রুত গতিতে পিএলএ নৌবাহিনীকে একের পর এক পরমাণু ডুবোজাহাজ তৈরি করে দিয়েছে বেজিঙের প্রতিরক্ষা সংস্থা ‘বোহাই শিপবিল্ডিং হেভি ইন্ডাস্ট্রি কোং’। চিনের হুলুদাওতে রয়েছে এদের সদর দফতর। ২০১৯ সালের আগে পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধারেকাছে ছিল না তারা। পরবর্তী চার বছরে সামরিক সরঞ্জাম নির্মাণের নিরিখে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে তারা।
গত বছরের একেবারে শেষে ‘মিলিটারি ব্যালেন্স, ২০২৫’ শীর্ষক আর একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে ওই ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা সমীক্ষক সংস্থা। সেখানেও পিএলএ নৌবাহিনীর হাতে থাকা পরমাণু ডুবোজাহাজের বহর সংক্রান্ত তথ্য সামনে আনে তারা। আইআইএসএস-এর গবেষকদের দাবি, ২০২৫ সালের প্রথম দিকে ১২টি আণবিক শক্তিচালিত ডুবোজাহাজ, ছ’টি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরমাণু ডুবোজাহাজ এবং ছ’টি গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র বা আক্রমণাত্মক ডুবোজাহাজ ব্যবহার করছিল বেজিং।
বর্তমানে মার্কিন নৌবাহিনীর হাতে আছে ৬৫টি পরমাণু ডুবোজাহাজের একটা বিশাল বহর। এর মধ্যে ১৪টির নকশা শত্রুদেশের ভিতরে হামলা চালানোর কথা মাথায় রেখে তৈরি করেছেন আমেরিকার প্রতিরক্ষা গবেষকেরা। সেগুলি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম। এ ছাড়া ৫১টি আক্রমণাত্মক বা গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র ডুবোজাহাজও ব্যবহার করছেন ওয়াশিংটনের জলযোদ্ধারা। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অবশ্য কোনও প্রচলিত শক্তির ডুবোজাহাজ নেই।
আরও পড়ুন:
চিনের পিএলএ নৌবাহিনী শুধুমাত্র পরমাণু ডুবোজাহাজ ব্যবহার করে, এমনটা নয়। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা সমীক্ষকদের ‘মিলিটারি ব্যালেন্স ২০২৫’ রিপোর্ট অনুযায়ী, বেজিঙের হাতে আছে ৪৬টি ডিজ়েলচালিত ‘নিঃশব্দ ঘাতক’। ধারে ও ভারে এগুলি এসএসএন বা এসএসবিএনের তুলনায় অনেক কম শক্তিশালী। কিন্তু, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরের মতো বিশাল এলাকায় টহলদারি ও শত্রুর উপর চোরগোপ্তা আক্রমণে সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটি ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে উঠতে পারে।
আইআইএসএস-এর সমীক্ষকেরা চিনের পরমাণু ডুবোজাহাজের বহর বৃদ্ধিকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনাগুলির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। সংশ্লিষ্ট রিপোর্টগুলিতে ‘গুপ্তচর’ কৃত্রিম উপগ্রহের তোলা বেশ কিছু ছবি সামনে এনেছেন তাঁরা। সেখানে হুলুদাওয়ের শিপইয়ার্ডে একসঙ্গে একাধিক ডুবোজাহাজের হাল বা কাঠামো তৈরি করতে দেখা গিয়েছে। বর্তমানে বছরে একটা করে এসএসবিএন এবং দুটো করে এসএসএন নির্মাণ করতে পারছে ড্রাগন।
গত দু’বছরের মধ্যে ২০২৪ সালে সবচেয়ে বেশি ডুবোজাহাজ নৌবাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছে ড্রাগনের ‘বোহাই শিপবিল্ডিং হেভি ইন্ডাস্ট্রি’। সে বার খুব কম সময়ের মধ্যে সাতটা ০৯৪ ডিন ক্লাসের এসএসবিএন হাতে পায় পিএলএ-র জলযোদ্ধারা। ২০২৫ সালে মোট আটটা ডুবোজাহাজকে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় মোতায়েন করেছে বেজিং। তার মধ্যে চার থেকে পাঁচটি ছিল এসএসবিএন।
২০২২ সালে প্রথম অত্যাধুনিক প্রযুক্তির পরমাণু শক্তিচালিত ডুবোজাহাজ তৈরি করতে সক্ষম হয় চিন। ২০২৪ সালে পাঁচটি এবং ২০২৫ সালে আরও দু’টি ওই শ্রেণির ডুবোজাহাজ তৈরি করে ফেলে তারা। এগুলির অধিকাংশই শ্যাং তৃতীয় ক্লাসের ডুবোজাহাজ বলে জানা গিয়েছে। এর মাধ্যমে ‘সায়লেন্ট কিলার’ নির্মাণের নিরিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যে ড্রাগন খোলা চ্যালেঞ্জ জানাতে পেরেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
২০২৩ সালে ডুবোজাহাজ নির্মাণ প্রকল্পের নীলনকশা প্রকাশ করে মার্কিন যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগন। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে ফি বছর একটি করে কলম্বিয়া শ্রেণির এসএসবিএন এবং দু’টি করে ভার্জিনিয়া শ্রেণির এসএসজিএন ডুবোজাহাজ তৈরি করবে আমেরিকা। ওয়াশিংটনের সেই লক্ষ্যমাত্রা ইতিমধ্যেই বেজিং ছুঁয়ে ফেলেছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ থিঙ্ক ট্যাঙ্ক।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের দাবি, ২০৩০ সালের মধ্যে ৪৩৫টি রণতরীর বিশাল বহর তৈরি করে ফেলবে চিন। বর্তমানে পিএলএ নৌবাহিনী ৩৭০টির বেশি যুদ্ধজাহাজ ব্যবহার করছে বলে খবর পাওয়া গিয়েছে। সে দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম নৌসেনা রয়েছে বেজিঙের কাছে। ড্রাগনের জলযোদ্ধাদের হাতে থাকা উভচর জাহাজ, সমুদ্র গবেষণার জাহাজ, বিমানবাহী রণতরী এবং নৌবহরের সহায়ক জাহাজের সংখ্যাও নেহাত কম নয়।
ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় চিনের এ-হেন শক্তিবৃদ্ধি নিয়ে ইতিমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মার্কিন নৌসচিব জন ফেলান। গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সাল) এই ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকারের কাছে একটি রিপোর্ট দেন তিনি। সেখানে ফেলান বলেছেন, ‘‘আমাদের রণতরী নির্মাণের কাজ অন্তত ছ’মাস দেরিতে চলছে। ফলে এ ব্যাপারে বাজেট ৫৭ শতাংশ বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে।’’ তবে এ ব্যাপারে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি আমেরিকার পার্লামেন্ট কংগ্রেস।
মার্কিন গণমাধ্যমগুলি জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ৪৭-এ নেমে আসতে পারে আমেরিকার ডুবোজাহাজের বহর। অন্য দিকে, ২০৩৫ সালের মধ্যে ‘নিঃশব্দ ঘাতকের’ সংখ্যার নিরিখে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাপিয়ে যাবে চিন। দীর্ঘ দিন ধরেই সাবেক ফরমোজ়া তথা তাইওয়ান (রিপাবলিক অফ চায়না) কব্জা করার ছক কষছেন জিনপিং। সেই কারণেই ডুবোজাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধির দিকে নজর দিয়েছে তাঁর প্রশাসন, বলছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশ।
তবে এগুলির উল্টো যুক্তিও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন হালকা ওজনের চিনা ডুবোজাহাজগুলি সংঘাত পরিস্থিতিতে মোটেই আটকাতে পারবে না মার্কিন নৌসেনাকে। তা ছাড়া ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় একগুচ্ছ ‘বন্ধু’ রাষ্ট্র রয়েছে ওয়াশিংটনের। এর মধ্যে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া (রিপাবলিক অফ কোরিয়া বা আরওকে), অস্ট্রেলিয়া এবং ফিলিপিন্স উল্লেখযোগ্য। যুদ্ধের সময় ‘কৌশলগত অংশীদার’ ভারতকে পাশে পেলে আমেরিকা ঠেকানো একরকম অসম্ভব, বলছে ওয়াকিবহাল মহল।