Advertisement
E-Paper

আমি নাস্তিকতায় বিশ্বাসী, কারও ধর্মাচরণেও আপত্তি নেই, তবে এটা নিয়ে ব্যবসার তীব্র বিরোধী: লোকনাথ দে

কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। পায়ে চটি। নতুন ওয়েব সিরিজ়ের জন্য প্রচার তুঙ্গে। ব্যস্ত নাট্যাভিনেতা লোকনাথ দে। এই ব্যস্ততা, চাকচিক্যের মাঝে টিকে থাকার অক্সিজেন পান নিউ ব্যারাকপুরের চায়ের ঠেক আর বন্ধুদের থেকে। এক দিকে রিল ভিডিয়োয় কথা বলতে হচ্ছে। ‘স্বর্গরথ সরগরম’ নিয়ে কথা বলতে বলতে সেই গল্পই উঠে এল।

উৎসা হাজরা

শেষ আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬ ০৮:৫৮
রাজনৈতিক মতাদর্শ থেকে নতুন সিরিজ় নিয়ে কী বললেন অভিনেতা লোকনাথ দে?

রাজনৈতিক মতাদর্শ থেকে নতুন সিরিজ় নিয়ে কী বললেন অভিনেতা লোকনাথ দে? ছবি: সংগৃহীত।

প্রশ্ন: এত ক্ষণ ধরে শুটিং করলেন, তার পরে একের পর এক রিল ভিডিয়োয় করতে গিয়ে হাঁফিয়ে যাচ্ছেন না?

লোকনাথ: আমি একদম এ সব পারি না। ভুলভাল কী বলে দেব, আমার কাজও চলে যেতে পারে, এটা কি জানেন? আমি তো কোন একটা রিলে সরকার বদল নিয়ে কী সব বলে দিলাম। মাথায় যা গিজগিজ করে, বলেও ফেলি। পরে ভুল বুঝতে পারি। অনেকটা প্রেমে পড়ার মতো। পরে বোঝা যায়।

প্রশ্ন: প্রেমে পড়া কি ভুল নাকি?

লোকনাথ: ওরে বাব্বা! সে আর বলতে। আসলে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করছি। যে কারণে রিল ভিডিয়ো করতে হচ্ছে। প্রচারের জন্য এমন অনেক কিছুই করতে হয়। খালি এগুলোর জন্য আলাদা করে পারিশ্রমিক পেলে ভাল হত। প্ল্যাটফর্ম এইট-কে বলব, এমনটা হলে মন্দ হয় না। সবটাই মজা করছিলাম। প্রোডাক্ট বিক্রি না হলে তো মুশকিল। না হলে চলবে কী করে?

প্রশ্ন: আপনি তো বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেন। নাটক, ওয়েব সিরিজ়, সিনেমা— সবকিছু, তার পরেও কি আপনাকে ভাবতে হয় চলবে কী করে?

লোকনাথ: ওমা! ভাবতে হবে না? গত বছর সম্ভবত মোট বাংলা ছবি তৈরি হয়েছিল ৩৬টা। তার আগের বছর তৈরি হয়েছিল ১৩৬টা। এই যদি পরিসংখ্যান হয় তা হলে তো ভাবতেই হবে। কারণ, আমাদের কাছে তো বাছাইয়ের কোনও সুযোগ থাকছে না। শুধু অভিনয় করে টিকে থাকতে হলে তো সুযোগ আরও কম। এটা ঠিক যে আমাদের সৌভাগ্য, শুধু সিরিজ় বা সিনেমায় আমরা আবদ্ধ নই। আরও অনেক পথ আছে। তার মধ্যে তো অনেক কিছু এড়িয়েও যেতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রোপাগান্ডা চিত্রনাট্য মনে হলেও এড়িয়ে যেতে হয়। এত বাছাই করলে তো আরও ভাবার জায়গা তৈরি হয়। যেমন আমার নতুন সিরিজ় ‘স্বর্গরথ সরগরম’ নিয়ে এত কথা ভাবতেই হয়নি। চিত্রনাট্য পেয়েই রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। ভাল লেগেছিল।

‘এখানে আমরা স্বর্গরথকে রূপক হিসাবে দেখতে পারি। যেখানে বলহরি চরিত্রটি একটা মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে।’

‘এখানে আমরা স্বর্গরথকে রূপক হিসাবে দেখতে পারি। যেখানে বলহরি চরিত্রটি একটা মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে।’

প্রশ্ন: স্বর্গরথ মানেই তো একটি মৃত্যু, মৃতদেহের দৃশ্য। আপনি তো মৃতদেহবাহী ওই গাড়ির চালকের চরিত্রে অভিনয় করলেন। কেমন অনুভূতি হল মৃত্যু নিয়ে?

লোকনাথ: জন্ম অনিশ্চিত, মৃত্যু নিশ্চিত। সত্যি কথা। এখানে আমরা স্বর্গরথকে রূপক হিসাবে দেখতে পারি। যেখানে বলহরি চরিত্রটি একটা মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে। কারণ, সৎকারের জন্য নিয়ে যেতে পারলে রোজগার হবে। আবার অন্য দিকে এমনও হয়েছে, বলহরি ও তার ছেলে মিলে মৃত্যুমুখ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। আমি উপলব্ধি করেছি মৃত্যুও রূপক। এর মধ্যে আবার স্থানীয় রাজনীতির চিত্রও উঠে এসেছে।

প্রশ্ন: হ্যাঁ, আপনাদের প্রচার ঝলকেই তো সংলাপ রয়েছে ‘রাজনীতি ভাল মানুষকে খারাপ করে দেয়’।

লোকনাথ: গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে কিন্তু এটাই দেখা যায়। কারণ, তাঁদের সারল্য খুব বেশি। সহজে মানুষের মাথায় ভুল বার্তা ঢোকানো যায়। কে কোন পক্ষে তা নিয়ে কাটাছেঁড়া চলে। বিরোধীপক্ষ হলে মুশকিল। যা এখন সারা রাজ্য, দেশ, পৃথিবীতে চলছে।

‘ধর্ম হয়তো মানুষকে শান্ত হতে শেখায়। ধর্ম ব্যবসায়ীরা সেগুলো নিয়ে ব্যবসা করে। ’

‘ধর্ম হয়তো মানুষকে শান্ত হতে শেখায়। ধর্ম ব্যবসায়ীরা সেগুলো নিয়ে ব্যবসা করে। ’

প্রশ্ন: রাজনীতি কি মানুষকে খারাপ করে দেয়? কী মত আপনার?

লোকনাথ: আমি বিশ্বাস করি না। রাজনীতি এতটা খারাপ নয়। ধর্ম, রাজনীতি সবটাই মানবকল্যাণের জন্য তো।

প্রশ্ন: আপনি ধর্ম মানেন?

লোকনাথ: না। আমি নাস্তিকতায় বিশ্বাসী। কিন্তু তা বলে নিজের ভাবনা কারও উপরে চাপিয়ে দিই না। কেউ যদি ধর্ম মানেন, তাঁকে অশ্রদ্ধা করি না। কিন্তু কেউ যদি ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে, আমি তার তীব্র বিরোধিতা করি। ধর্ম হয়তো মানুষকে শান্ত হতে শেখায়। ধর্ম ব্যবসায়ীরা সেগুলো নিয়ে ব্যবসা করে। শ্রেণি বিভাজন করে। মানুষকে মারে। রাজনীতি তো মানুষের কল্যাণের জন্য। মঙ্গলের জন্য। নীতি তৈরি হয়। মানুষের কাছে কী ভাবে পরিষেবা পৌঁছোবে সেটা তো ভাল ভাবনা। কিছু খারাপ রাজনীতিবিদ সেগুলোকে ব্যবহার করে। মানুষের মনে বিষ ঢুকিয়ে দেয়। রাজনীতি খারাপ নয়। রাজনীতির ব্যবসায়ীরা খারাপ জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে।

প্রশ্ন: রাজনীতি মানুষের কল্যাণের জন্য তৈরি। টলিউডের কি কল্যাণ হল?

লোকনাথ: সে কথা এখনই বোঝা যাবে না। কল্যাণ যে হয়নি তা বোঝা গিয়েছে। সেবা, কল্যাণ যে হয়নি তা পরিষ্কার বোঝা গিয়েছে। যাঁরা চালাচ্ছিলেন তাঁরা টেকনিশিয়ানদের আবেগকে কাজে লাগাচ্ছিলেন। ভুলপথেও চালিত হয়েছিলেন অনেকে। সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে।

প্রশ্ন: পালাবদলের পরে পরিস্থিতি কি বদলাবে?

লোকনাথ: একমাস হয়েছে, আমি বুঝতে পারছি না। গেরুয়া রঙের মাঝে দেখতে পাচ্ছি, ‘ভয় নয় ভরসা রাখুন’। আপাতত ওটার দিকেই তাকিয়ে আছি। কিন্তু তার পিছনে আর কিছু দেখতে পাচ্ছি না। যদি কিছু বদলায় তো ভাল। রূপাদি, রুদ্র ঠিক ভাবে যদি দায়িত্ব পালন করে, তা হলে হয়তো কিছুটা পরিস্থিতি বদলাতে পারে। লবিবাজিটা বন্ধ হওয়া দরকার।

প্রশ্ন: আপনি কি কোনও লবির অংশ?

লোকনাথ: না। আমি কোনও গোষ্ঠীর অংশ কোনও দিনই হইনি। নিজের কাজ করি, বাড়ি চলে আসি। কোথাও আড্ডা দিই না।

প্রশ্ন: এই যে শোনা যায়, কোনও গোষ্ঠীর অংশ না হলে কাজ পাওয়া যায় না।

লোকনাথ: জানি না, এটা আমি সত্যিই বলতে পারছি না। কারণ, আমি কাজের নিরিখে কাজ পেয়েছি। সব ধরনের মানুষের সঙ্গে কাজ করেছি। ভাল অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমার কোনও শত্রুও নেই।

প্রশ্ন: সাফল্য এলে তো শত্রু বাড়ে এমনটাই শোনা যায়!

লোকনাথ: অবসরে নিউ ব্যারাকপুরে কালীদা, বাবুদার দোকানে সময় কাটে। ওখানে চা খাই। ব্যস। আসলে আমি ইন্ডাস্ট্রির ঠেকের আড্ডায় নেই। তাই হয়তো আমার শত্রু কম।

প্রশ্ন: এই যে ইন্ডাস্ট্রির উন্নতির জন্য দফায় দফায় বৈঠক হচ্ছে, গিয়েছিলেন আপনি?

লোকনাথ: না, যাইনি। বুঝতেই পারছি না, কে কোন পক্ষ। তা হলে গিয়ে কী করব? মিনিটে মিনিটে সবাই পাল্টি খাচ্ছে। আমি তো বিপদে পড়ে যাব। ফলে এ সব থেকে দূরে থাকাই ভাল।

‘থিয়েটারের জন্য দিল্লির গ্রান্ট আসে কিছু কিছু দলের জন্য। এখন যাঁরা সরকারে আছেন, তাঁরা আমাদেরই বন্ধু।’

‘থিয়েটারের জন্য দিল্লির গ্রান্ট আসে কিছু কিছু দলের জন্য। এখন যাঁরা সরকারে আছেন, তাঁরা আমাদেরই বন্ধু।’

প্রশ্ন: অনেক নাট্যকর্মী অভিযোগ করেছিলেন সরকারি হল পাওয়া যাচ্ছে না। সেই পরিস্থিতি কি বদলাবে বলে মনে হয়?

লোকনাথ: আসলে আশায় বাঁচে চাষা। থিয়েটারের জন্য দিল্লির গ্রান্ট আসে কিছু কিছু দলের জন্য। এখন যাঁরা সরকারে আছেন, তাঁরা আমাদেরই বন্ধু। তাঁরা একটা ক্ষমতা পেয়েছেন। দিল্লির গ্রান্ট যেখান পাওয়া যায় সেই দলের অংশ হয়েছেন তাঁরা। ফলে কিন্তু অনেকের গ্রান্ট কাটা যাচ্ছে। স্থগিত করে দেওয়া হচ্ছে। কিছু দিন না গেলে পরিস্থিতি বদলাবে কি না বলা যাচ্ছে না। আর কীসের ভিত্তিতে প্রেক্ষাগৃহ পাওয়া যাবে, সেটাও তো জানতে হবে। ফলে, আমার মনে হয়, সময়ের হাতে সবটা ছেড়ে দেওয়া প্রয়োজন।

Tollywood Actor
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy