Advertisement
E-Paper
WBState_Assembly_Elections_Lead0_02-05-26

‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’-এর সাত পাতার সেই চিত্রনাট্য হাতে ধরলে আজও মানিকদার উষ্ণতা পাই: টিনু আনন্দ

সত্যজিৎ রায়ের জন্মবার্ষিকীতে ‘সোসাইটি ফর দ্য প্রিজ়ারভেশন অফ সত্যজিৎ রায় আর্কাইভ’-এর বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কলকাতা উড়ে এসেছিলেন আশি পার করা অভিনেতা টিনু আনন্দ। নন্দনে পৌঁছোনোর পরে কথা বললেন আনন্দবাজার ডট কমের সঙ্গে।

অনসূয়া বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০২ মে ২০২৬ ১৭:১৭
সত্যজিৎ রায়ের স্মৃতিচারণে টিনু আনন্দ

সত্যজিৎ রায়ের স্মৃতিচারণে টিনু আনন্দ গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম

বাবা ছিলেন বলিউডের বিখ্যাত সংলাপ-লেখক ইন্দর রাজ আনন্দ। তবে তাঁর ছেলে টিনু আনন্দের সিনেমায় হাতেখড়ি মোটেই আরব সাগরের পারে নয়। সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরেই চিনেছিলেন ছবি তৈরির প্রাথমিক অলিগলি। বাংলা ভাষাটাও দখলে এনেছিলেন এই কলকাতায়, সত্যজিতের সঙ্গে কাজের সুবাদেই। সিনেমা তৈরির প্রাথমিক পাঠ শেষ করে মুম্বই ফিরে গিয়ে অভিনয়ের পাশাপাশি ছবি পরিচালনাও করেছেন। এখনও মনে করেন, পাঁচটি ছবিতে সত্যজিৎ রায়ের সহকারী হিসাবে কাজ তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময়। সত্যজিতের জন্মবার্ষিকীতে ‘সোসাইটি ফর দ্য প্রিজ়ারভেশন অফ সত্যজিৎ রায় আর্কাইভ’-এর বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কলকাতা উড়ে এলেন আশি পেরনো অভিনেতা। নন্দনে পৌঁছোনোর পরে কথা বললেন একমাত্র আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে।

প্রশ্ন: আজকের অনুষ্ঠানের জন্যই কলকাতায় আসা?

টিনু আনন্দ: হ্যাঁ, মূলত তাই। মানিকদা আমার মেন্টর। আর কলকাতায় অনেক স্মৃতি আমার। এই রাস্তায় কত শুটিং করেছি। এই ধর্মতলা চত্বরেও প্রচুর ছবির শুটিং করেছি। ওঁর জন্যই তো আমার সব শেখা।

প্রশ্ন: আপনি নাকি সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কাজ করবেন বলে প্রথম এই শহরে আসেন?

টিনু: একদমই। ইচ্ছে ছিল ছবি পরিচালনা করার। বাবার কাছে সেই ইচ্ছার কথা বলতেই বাবা জানান, তিন জন পরিচালকের সঙ্গে তাঁর খুব বন্ধুত্ব। ইটালির ফেদিরিকো ফেলিনি, মুম্বইয়ের রাজ কাপুর এবং কলকাতার সত্যজিৎ রায়। আমি বললাম, ফেলিনির সঙ্গে কাজ করতে চাই। ফেলিনির সঙ্গে বাবার কথাও হয়। পরিচালক জানান, আমি যেতে পারি। কিন্তু আমাকে ইটালীয় ভাষাটা শিখতে হবে। তখন মানিকদার সঙ্গে কথা বলেন বাবা। মানিকদা জানান, তাঁর একটি কাজ চলছে। নতুন ছবি করার সময় আমায় যেতে বললেন। তখনই তিনি জানিয়েছিলেন, একটা ফ্যান্টাসি গল্প ভেবেছেন।

প্রশ্ন: ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’-এর গল্প ভেবেছিলেন?

টিনু: হ্যাঁ, সেই ছবি করার সময় এল। তিনি জানালেন আমাকে ওঁর ইউনিটে যুক্ত হতে। আমি তো খুশি মনে ট্রেনে রওনা দিলাম। মুম্বই থেকে কলকাতা, দু’দিন এক রাতের জার্নি। আমি হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে বাবাকে ফোন করলাম। বাবা জানালেন, রিটার্ন টিকিট কেটে ফিরে এসো। আসলে মানিকদা বাবাকে চিঠিতে লিখেছিলেন, প্রযোজক নতুন, আগে কাজ করেননি মানিকদার সঙ্গে। তিনি সাত জন সহকারী পরিচালক রাখতে পারবেন না। আগেই মানিকদার ছ’জন সহকারী ছিলেন। আর আমার ট্রেনে ওঠার পর সেই চিঠি বাবা পেয়েছিলেন। তাই আমার কাছে এই বার্তা পৌঁছোয়নি। এ দিকে, সেই সময়েই ‘সাত হিন্দুস্তানি’ ছবিতে অভিনয়ের অফার এসেছিল আমার কাছে। যদিও পরবর্তী কালে আমি কলকাতায় আসব বলে অমিতাভ বচ্চন সেই চরিত্র করেন।

প্রশ্ন: তা হলে আপনি ফিরে গেলেন মুম্বই?

টিনু: না। বাবা বললেন, কলকাতা যখন পৌঁছেই গিয়েছ, এক বার মানিকদার সঙ্গে দেখা করে নাও। আমি তখন মানিকদাকে ফোন করলাম। প্রথম কথাটাই বললেন, ওরে বাবা, তুমি এসেছ? আমি বললাম, হ্যাঁ। আপনার চিঠি পাওয়ার আগেই আমি কলকাতার জন্য রওনা দিয়ে দিয়েছিলাম। বাবা বললেন ফিরে যেতে। মানিকদা বললেন, না, ঠিক আছে। তুমি এসেই যখন পড়েছ, কাল তুমি সকালে দেখা করো। কখন ওঠো ঘুম থেকে? আমি বললাম, যখন আপনি বলবেন। বললেন, কাল আটটায় চলে এসো। আমি পরদিন সকাল সাড়ে সাতটায় পৌঁছে গেলাম। আটটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে দরজার বেল বাজালাম। ছ’ফুট চার ইঞ্চির মানুষ, সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা। বললেন, এসো এসো। রান্নাঘরে গিয়ে বলে এলেন, টিনু এসেছে, চা দাও। বললেন, চা খাও, আমি একটা কাজ শেষ করেই আসছি। পনেরো মিনিট দাও। আমি তখন মনে মনে ভাবছি, জানুয়ারি মাস, শীতের সকাল। আর একটু ঘুমিয়ে আসতে পারতাম।

প্রশ্ন: এটা বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়িতে?

টিনু: না, এটা লেক টেম্পল রোডের বাড়িতে। মেনকা সিনেমার কাছে। আমি চা খেলাম। এর পরে মানিকদা কাজ শেষ করে স্টেপলার খুঁজলেন। এর পরে আমাকে এসে সাত-আট পাতার একটা গোছা দিয়ে বললেন, টিনু, এটা তোমার। আমি আজ সকাল ৪টেয় ঘুম থেকে উঠেছি, তুমি আটটায় আসবে তাই। আমি আমার পরের ছবির পুরো গল্প ইংরাজিতে অনুবাদ করে তোমাকে দিলাম, যাতে তোমার নিজেকে খাপছাড়া না মনে হয়। যাতে তোমার কাছে সবটা পরিষ্কার হয়। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে বললাম, কিন্তু আমার তো ফিরে যাওয়ার কথা। মানিকদা বললেন, না না, তুমি যখন এসেই পড়েছ, তুমি আমার পরিবারের অংশ। আমরা না হয় একটা রুটি কম খেয়ে নেব। যাতে প্রযোজকের উপর চাপ না পড়ে।

প্রশ্ন: সত্যজিৎ রায়ের মুখে ওই কথা শুনে কেমন লেগেছিল সে দিন?

টিনু: আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম! কতটা ভাল মানুষ হলে এটা করতে পারেন! আমি যেখানে বসে বসে পনেরো মিনিট বেশি ঘুমোনোর কথা ভাবছি, সেখানে এই মানুষটা আমার মতো এক জন সহকারীর জন্য ভোর থেকে উঠে কাজ করছেন! আর এমন এক জনের জন্য যে কেমন কাজ করে সেটাও তিনি জানেন না। সে দিন আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। এর থেকেই বোঝা যায়, তিনি কত বড় মনের মানুষ ছিলেন। তিনি আমার কাছে একটা প্রতিষ্ঠান।

‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ছবির সেটে ক্ল্যাপস্টিক হাতে টিনু আনন্দ। পাশে ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়।

‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ছবির সেটে ক্ল্যাপস্টিক হাতে টিনু আনন্দ। পাশে ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত

প্রশ্ন: এর পর থেকে আপনি ওঁর ছায়াসঙ্গী হয়ে উঠলেন?

টিনু: পাঁচ বছর আমি ওঁর সঙ্গে কাজ করেছি। আমি ওঁর ডান হাত হয়ে উঠেছিলাম বলতে পারেন। ওঁর সঙ্গে ওঁর গাড়িতেই থাকতাম। আসলে প্রথম ছবির জন্য আমাকে কোনও পারিশ্রমিক দেওয়া হয়নি। প্রযোজকই এর পরে আমার কাজ দেখে মানিকদাকে বলেন, টিনুকেও পারিশ্রমিক দেওয়া হোক। সেটা মানিকদার জন্যই সম্ভব হয়েছে। কারণ তিনিই আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। প্রথম পারিশ্রমিক পেয়েছিলাম একশো টাকা। আমি তখন বন্ডেল রোডে থাকতাম। পরে বালিগঞ্জ প্লেসে চলে আসি। ওখানে একটা ধাবা আছে। প্রত্যেক রাতে ধাবায় খেতে যেতাম। সেখানে গিয়ে ডাল খেতাম। বিয়ের পরেও আমার স্ত্রীর সঙ্গে গিয়ে ডাল খেয়েছিলাম। কলকাতার প্রতি ভালবাসা তাই থেকেই গিয়েছে।

প্রশ্ন: ব্যক্তি সত্যজিৎ রায় কলাকুশলীদের কাছে কেমন ছিলেন?

টিনু: মানিকদা মানুষকে পরখ করতে পারতেন। মানুষকে পড়তে পারতেন। ওঁর কাছে ছ’জন সহকারী পরিচালক ছিলেন, প্রত্যেককে গুরুত্ব দিতেন। আমি ছিলাম সাত নম্বর। তার পরেও দ্বিতীয় ছবিতেই আমি ওঁর চতুর্থ সহকারী হয়ে উঠেছিলাম। ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’-র সময়। আমি ওঁর আরও কাছের হয়ে উঠলাম। ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ ছবির জন্য রাজস্থানের জায়সলমেরে শুটিংয়ের সময় ২০০টি উটের প্রয়োজন ছিল। কেউ জানতেন না কোথায় উট পাওয়া যাবে। আমার এক চেনাজানা লোক ছিলেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা করি। সময়ের মধ্যে উট পৌঁছে দেন তাঁরা। তাতে খুব খুশি হয়েছিলেন মানিকদা। আমার মনে আছে, কিছুদিন পরে মানিকদা বলেছিলেন, আমার যদি কোনও সহকারী পরিচালক হয় তা হলে সেটা টিনু। সরাসরি প্রশংসা না করলেও এই মন্তব্য আমার কাছে অনেক বড় ছিল।

প্রশ্ন: পরিচালনায় আসার পরে কোনও ছবি দেখিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়কে?

টিনু: না না বাবা! আমি দেখাইনি। কারণ, আমার ছবি তো পুরো কমার্শিয়াল ছবি। তবে হ্যাঁ, আমি একটা ছবি তৈরি করেছিলাম, ‘ম্যায় আজ়াদ হুঁ’। এই ছবিটি একেবারে মানিকদার মতো করে বানিয়েছিলাম। এই ছবিটা খুব বেশি কেউ দেখেননি। কিন্তু আমি খুব গর্বিত এই ছবিটি তৈরি করতে পেরে। আমার শিল্পীসত্তাকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছে এই ছবি। তাতেই আমি খুশি। এক অন্য অমিতাভ বচ্চনকে তুলে ধরেছিলাম এই ছবিতে। আমি মানিকদার কাছে তুচ্ছ। কিন্তু একেবারে মানিকদার মেকিংয়ের মতো করেই বানিয়েছিলাম ছবিটি। ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা-র প্রায় একুশো নতুন শিল্পীকে নিয়েছিলাম এই ছবিতে। এই অভিনেতারা ইন্ডাস্ট্রিতে রাজ করছেন এখন। শাবানা আজ়মী, অন্নু কপুর, অঞ্জন শ্রীবাস্তব, অজিত বাছানীদের মত তারকারা ছিলেন ছবিতে।

প্রশ্ন: মুম্বই ফিরে গিয়ে দুই ইন্ডাস্ট্রিকে কতটা আলাদা মনে হল?

টিনু: একেবারেই আলাদা। আমার মনে হয়েছিল আমি ভুল ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতে চলে এসেছি। একটা ছবি করেছিলাম শশী কপূর আর ঋষি কপূরকে নিয়ে। ছবির নাম ‘দুনিয়া মেরি জেব মে’। শশী বলেছিলেন, আমি কাজ করব। কিন্তু আমি ৭টায় আসব, সাড়ে ন’টায় চলে যাব। আর ঋষি বলেছিলেন, আমি ১০টার পর আসব। এ দিকে, দু’জন ছবিতে দুই ভাইয়ের চরিত্রে। কী করে হবে? দু’জনকে তো একসঙ্গে পাবই না। আর মানিকদার সঙ্গে যে অভিনেতারা কাজ করতেন তাঁরা তো সারা ক্ষণ সেটেই বসে থাকতেন। মেকআপ রুমেও যেতেন না, মেকআপ ভ্যানেও থাকতেন না। কারণ, যখন তখন মানিকদা ডাকতে পারেন। সবাই স্কুলের ছাত্রের মতো বসে থাকতেন।

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে শুটিংয়ে টিনু আনন্দ।

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে শুটিংয়ে টিনু আনন্দ। ছবি: সংগৃহীত

প্রশ্ন: আজ সত্যজিৎ রায়ের মতো পরিচালকের কথা ভাবলে কী মনে হয়?

টিনু: তিনি ছিলেন সবার থেকে আলাদা। তাঁর ভাবনাই আলাদা। ওই ভাবনা কেউ ভাবতেই পারে না। যে ভাবে তিনি ছবিতে শহরের প্রতি ভালবাসা ব্যক্ত করেছেন, তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য রেখেছেন তা করা সত্যিই কঠিন। আর তাঁর মতো সম্পাদনা, আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করলে আমি বুক ফুলিয়ে বলতে পারি, আমার মেন্টর সত্যজিৎ রায় এবং আমি তাঁর কাছ থেকে সম্পাদনা শিখেছি। এক জন নন-অ্যাক্টরকে অ্যাক্টর বানাতে পারতেন। সব বাদ্যযন্ত্রের উপর দখল ছিল তাঁর। তাই কেউ ওঁর মতো হতেই পারবেন না কোনওদিন। ‘কমপ্লিট মাস্টার’ বলতে যা বোঝায়, তিনি তা-ই।

প্রশ্ন: ওঁর জন্মদিনে আজ কী বলতে চাইবেন আপনার মেন্টরের উদ্দেশে?

টিনু: গতকাল (১ মে) আমার মেয়ের জন্মদিন ছিল। আজ জন্ম হলে এই বর্ষীয়ান শিল্পীর সঙ্গে জন্মদিন ভাগ করে নিতে পারত। আজও আপনাকে মনে পড়লে আপনার দেওয়া সেই সাত পাতার চিত্রনাট্য দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে রাখি। আপনার উষ্ণতা আজও অনুভব করি, মানিকদা।

Satyajit Ray Tinnu Anand
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy