×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১২ এপ্রিল ২০২১ ই-পেপার

বিনোদন

রোগা, লম্বা অমিতাভকে ‘অপয়া’ বলেন রাজেশ, কড়া জবাব দেন জয়াও

নিজস্ব প্রতিবেদন
১৯ জুলাই ২০২০ ১৫:১২
গ্ল্যামারের নামগন্ধ নেই চেহারায়। জানে না ফিল্মি আদবকায়দাও। ছেলেটাকে দেখে তাই নাক সিঁটকেছিলেন তিনি। ‘অপয়া’ বলে কটাক্ষও করেছিলেন। কিন্তু এই রোগা-লম্বা, ‘অদ্ভুত’ দেখতে ছেলেটাই এক দিন তাঁর রাজপাট কেড়ে নেবে, সেইসময় তা ঘূণাক্ষরেও টের পাননি রাজেশ খন্না। যখন টের পেলেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে, যেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো আর সম্ভব হয়নি তাঁর।

মায়ানগরীতে একটা সুযোগের অপেক্ষায় জুতোর শুখতলা খুইয়ে ফেলেন হাজার হাজার ছেলেমেয়ে। কিন্তু স্ট্রাগল বলতে কী বোঝায়, তা কোনও দিন টেরই পাননি রাজেশ খন্না। কলেজে পড়ার সময় থিয়েটার করতেন। সেই সূত্রে অল ইন্ডিয়া ট্যালেন্ট কনটেস্টে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়ে যান। আর সেখান থেকেই বলিউডে পা রাখার পথ প্রশস্ত হয়ে যায় তাঁর।
Advertisement
সুভাষ ঘাই, ধীরজ কুমার-সহ প্রায় ১০ হাজার প্রতিযোগীর মধ্যে বিজয়ী হন রাজেশ খন্না। সেখানেই বিআর চোপড়া, বিমল রায়, জিপি সিপ্পি, নাসির হুসেন, শক্তি সামন্ত এবং সুবোধ মুখোপাধ্যায়ের মতো পরিচালকদের নজরে পড়েন তিনি। তার পরেই একেবারে নায়ক হিসেবে বড় পর্দায় ধরা দেন।

১৯৬৬ সালে ‘আখরি রাত’ ছবিতে ডেবিউ করেন রাজেশ খন্না। তার পরের বছর মুক্তি পায় ‘রাজ’। ট্যালেন্ট হান্ট বিজয়ী হিসেবেই এই দু’টি ছবিতে চুক্তি হয় রাজেশ খন্নার। ১৯৬৭ সালে ৪০তম অস্কারে সেরা বিদেশি ছবি হিসেবেও মনোনীত হয় ‘আখরি রাত’।
Advertisement
এর পর একে একে ‘বাহারোঁ কে সপনে’, ‘অউরত’, ‘ডোলি’, ‘আরাধনা’ এবে ‘ইত্তেফাক’-এর মতো হিট ছবিতে অভিনয় করেন রাজেশ খন্না। তবে ‘আরাধনা’র দৌলতে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে যান তিনি। যে কারণে তাঁর নামের পাশে ‘ফার্স্ট সুপারস্টার অব ইন্ডিয়া’ তকমাও বসিয়ে দেন সমালোচকরা।

রাজেশ খন্নার জন্যই ১৯৭১ সালে চিত্রনাট্যকার হিসেবে বলিউডে প্রথম সুযোগ পান সেলিম-জাভেদ জুটি। সেলিম-জাভেদের লেখা চিত্রনাট্য নিয়ে তৈরি ‘হাতি মেরে সাথী’ ছবিটি বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত একা নায়ক হিসেবে পর পর ১৫টি হিট ছবি উপহার দেন রাজেশ খন্না। তাঁর সেই রেকর্ড আজও কেউ ভাঙতে পারেননি।

সেই সময় রাজেশ খন্না এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে, মহিলা অনুরাগীদের কাছ থেকে রক্ত দিয়ে লেখা চিঠি পেতেন তিনি। এক দিন শুটিং থেকে ফেরার সময় বাড়ির গেটের সামনে তাঁর গাড়ি ছেঁকে ধরেন মহিলা অনুরাগীরা। কোনও রকমে সে দিন তাঁদের হাত থেকে নিস্তার পেয়েছিলেন রাজেশ। কিন্তু শোনা যায়, ওই দিন মহিলাদের লিপস্টিকের দাগে ভরে গিয়েছিল তাঁর গাড়িটি।

সেই সময় রাজেশ খন্নাকে নিজেদের ছবিতে সই করাতে সকাল থেকে তাঁর বাড়ির সামনে লাইন দিতেন পরিচালক-প্রযোজকরা। কিন্তু কথায় বলে খ্যাতি ও অর্থ মানুষকে বদলে দেয়। রাজেশ খন্নার ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি। জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর হাবভাবে আমূল পরিবর্তন ঘটে। শোনা যায়, সমসাময়িক কাউকেই নিজের সমকক্ষ ভাবতেন না রাজেশ। কলটাইম পেরিয়ে যাওয়ার ঢের পরে শুটিংয়ে পৌঁছতেন। ফ্লোরেও নাকি পরিচালক-প্রযোজকদের উপর জোর খাটাতেন।

এর পর ১৯৭১ সালে ঋষিকেশ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘আনন্দ’ ছবিটি মুক্তি পায়। তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন সদ্য বলিউডে পা রাখা অমিতাভ বচ্চন। শোনা যায়, বরাবরের মতো রাজেশ খন্না দেরি করেই শুটিংয়ে আসতেন। কিন্তু অমিতাভ আসতেন একদম সময় ধরে। তা নিয়ে কানাঘুষো শুরু হলে, একটি সাক্ষাৎকারে রাজেশ খন্না বলেন, ‘‘কেরানিরা সময় ধরেই কাজ করেন। আমি কেরানি নই। শিল্পী।’’

শোনা যায়, সেইসময় অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে জয়া ভাদুড়ির সম্পর্কের কথা ইন্ডাস্ট্রির কারও অজানা ছিল না। ব্যস্ত না থাকলে জয়া ভাদুড়ির ছবির সেটেও পৌঁছে যেতেন অমিতাভ। সে নিয়ে এক বার জয়া ভাদুড়িকে শুনিয়ে অমিতাভের চেহারা নিয়ে কটাক্ষ করেন রাজেশ খন্না। অমিতাভকে তিনি ‘অপয়া’ বলেও উল্লেখ করেন। তাতে নাকি বেজায় চটে যান জয়া বচ্চন। অমিতাভ এক দিন তাঁকেও ছাপিয়ে যাবেন বলে রাজেশের উদ্দেশে জবাব ছুড়ে দেন তিনি।

জয়া ভাদুড়ির কথা বিফলে যায়নি। ‘জঞ্জির’ ছবির চিত্রনাট্য নিয়ে তখন তৈরি সেলিম-জাভেদ জুটি। রাজেশ খন্নার সঙ্গে সম্পর্ক ভাল হলেও, ইনস্পেক্টর বিজয়ের চরিত্রে রাজেশ ঠিক খাপ খাচ্ছিলেন না। তাই পরিচালক প্রকাশ মেহরা ধর্মেন্দ্রকে ওই চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু ব্যস্ততার জেরে ছবি থেকে সরে আসেন ধর্মেন্দ্র। এর পর দেব আনন্দ, রাজকুমার হয়ে ছবিটি পৌঁছয় অমিতাভ বচ্চনের কাছে। ‘বম্বে টু গোয়া’ ছবিতে একটি মারপিটের দৃশ্য দেখেই তাঁকে সেলিম-জাভেদের পছন্দ হয়।

১৯৭৩ সালে ‘জঞ্জির’ যখন মুক্তি পায়, তার আগে ১২টি ফ্লপ ছবিতে অভিনয় করেছেন অমিতাভ। কিন্তু ‘জঞ্জির’ আগের সব হিসেব নিকেশ বদলে দেয়। এর পর সেলিম-জাভেদ জুটির সঙ্গে একে একে ‘দিওয়ার’, ‘শোলে’, ‘ডন’ এবং ‘শান’-এর মতো সুপারহিট ছবি উপহার দেন অমিতাভ। সেই তুলনায় রাজেশ খন্নার কেরিয়ার গ্রাফ নীচে নামতে থাকে।

যে সেলিম-জাভেদকে হাতে ধরে বলিউডের অলিগলি চিনিয়েছিলেন, তাঁরা অমিতাভকে নিয়ে একের পর এক ছবি করছেন, এটা তিনি মেনে নিতে পারেননি বলে পরবর্তীকালে একটি সাক্ষাৎকারে জানান রাজেশ খন্না। তিনি বলেন, ‘‘সেলিম-জাভেদের সঙ্গে কিছু সমস্যা তৈরি হয় আমার। ‘দিওয়ার’ ছবিতে আমার অভিনয় করার কথা ছিল। কিন্তু যশ চোপড়াকে চিত্রনাট্য দিতেই অস্বীকার করেন ওঁরা। যশ চোপড়া আমাকে নিতে চাইলেও অমিতাভকে নিতে হবে বলে গোঁ ধরে বসেছিলেন ওঁরা। তার জেরে ছবিটি আমার হাত থেকে চলে যায়।’’

তবে অমিতাভ যে অনেক দূর যাবেন, তা ‘দিওয়ার’-এর কিছু শট দেখেই তিনি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন বলেও জানান রাজেশ খন্না। তিনি বলেন, ‘‘দিওয়ারের দু’টো রিল দেখেই বলেছিলাম, ওয়াহ্ ক্যায়া বাত হ্যায়। ঈশ্বর সাক্ষী, ‘আনন্দ’ এবং ‘নমক হারাম’-এর সময় থেকেই জানতাম অমিতাভ প্রতিভাবান। ‘দিওয়ার’-এর পর ওঁর উপর হিংসে হতো। ওঁকে কোনও ভুল করতে দেখলেই নিজের মনে হাসতাম। কারণ একই ভুল আমি করেছি।’’

তবে রাজেশ খন্না তাঁর সম্পর্কে নানা মন্তব্য করলেও, ‘কাকা’কে বরাবরই শ্রদ্ধা করে এসেছেন অমিতাভ। একটি সাক্ষাৎকারে রাজেশ খন্না তাঁর প্রশংসা করলে অমিতাভ বলেন, ‘‘আপনার মুখে প্রশংসা শুনে খানিকটা ইতস্তত বোধ করছি। কারণ আপনাকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করি আমি।’’

অমিতাভের কারণে তাঁর রাজপাট চলে গেলেও, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অভিনয়কে ভালবেসে গিয়েছেন রাজেশ খন্না। ২০১২ সালের ১৮ জুলাই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন রাজেশ খন্না। তাঁর মৃত্যুতে অমিতাভ জানান, ‘আনন্দ’ ছবিতে রাজেশ খন্নার সঙ্গে কাজ করার পরই অভিনেতা হিসেবে তাঁর গুরুত্ব বাড়ে ইন্ডাস্ট্রিতে।