×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৯ জানুয়ারি ২০২১ ই-পেপার

বিনোদন

দুর্দিনে ব্যাঙ্কে সম্বল ৫০০ টাকা, বুড়ো হয়ে ব্রেক পেলেন খল চরিত্রে ক্লান্ত ইঞ্জিনিয়ার শরৎ

নিজস্ব প্রতিবেদন
১৩ জানুয়ারি ২০২১ ১৫:২৮
তারুণ্যে মধ্যপ্রদেশের ভোপাল থেকে পাড়ি দিয়েছিলেন মুম্বই। দু’চোখে স্বপ্ন নায়ক হওয়ার। দৃশ্যে বড় বড় সংলাপ বলার। কিন্তু অভিনয় জীবনের তিন দশক ধরে তাঁকে দেখা গেল খলনায়কের সহকারী হয়েই থাকতে। তিনি শরৎ সাক্সেনা।

শরতের জন্ম ১৯৫০ সালের ১৭ অগস্ট, মধ্যপ্রেদেশর সাতনায়। ভোপালের সেন্ট জোসেফস কনভেন্ট স্কুলের পরে তাঁর পড়াশোনা জব্বলপুরের ক্রাইস্ট চার্চ বয়েজ সেকেন্ডারি স্কুলে। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ইলেকট্রনিক্স এবং টেলিকমিউনিকেশনস-এ ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পরেও ইচ্ছে ছিল না চাকরি করার।
Advertisement
চাকরির নিশ্চিত জীবন ছেড়ে তিনি বেছে নেন অভিনয়কেই। চলে যান মুম্বই। তার আগে অবশ্য এই সিদ্ধান্তের জন্য বাড়িতে প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছিল। ছেলে অভিনেতা হতে চান শুনে তাঁকে মারতে উদ্যত হয়েছিলেন শরতের বাবা।

কিন্তু ছেলে তো নিজের সিদ্ধান্তে অনড়। শেষে তাঁর বাবা তাঁকে শর্ত দেন, আগে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। তার পর নিজের শখ তিনি পূর্ণ করতে পারেন। শেষে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পরে বাবার কাছে থেকে অনুমতি পান। এক বন্ধুর সঙ্গে মুম্বই এসে পৌঁছন।
Advertisement
মু্ম্বইয়ে পা দিয়ে শরৎ বুঝতে পারলেন কল্পনা এবং বাস্তবের মধ্যে পার্থক্য কতটা। ছোটবেলা থেকে শুনেছিলেন তিনি সুদর্শন। কিন্তু মু্ম্বই এসে বুঝলেন শুধু চেহারা দিয়ে সুযোগ পাওয়া যায় না। সে সময় তাঁকে ফিরে এসে চাকরি করার জন্য বলেন তাঁর বাবা। বাবার কথা শুনে চাকরিতে যোগও দেন শরৎ।

অভিনয় ছাড়াও তাঁর শখ ছিল ফোটোগ্রাফি। সে সময় ধর্মেন্দ্রর ভাই বীরেন্দ্রর ছবি তুলেছিলেন তিনি। বীরেন্দ্রর সঙ্গে পরিচয় সূত্রে হিন্দি ছবিতে অল্পবিস্তর কাজের সুযোগ পান শরৎ।

এর পর আবার অভিনয়ের শখ জেগে ওঠে শরতের মনে। তিনি এ বার স্টুডিয়োর দরজায় দরজায় ঘুরতে থাকেন। কিন্তু সব জায়গায় প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হতে হচ্ছিল। কারণ শরতের সুঠাম, পেশীবহুল চেহারা সে সময় গুরুত্ব পেত শুধু খলনায়কের সঙ্গীর ভূমিকাতেই।

বেশ কয়েক বছর টিনসেল টাউনে কেটে যাওয়ার পরে মূল চরিত্রে আসার মরিয়া চেষ্টা করলেন শরৎ। দেখা করলেন সেলিম খানের সঙ্গে। তাঁর সূত্রে আলাপ হল যশ চোপড়ার সঙ্গে। সে সময় যশ তাঁর ‘কালা পাত্থর’ ছবির জন্য অভিনেতা খুঁজছিলেন।

‘কালা পাত্থর’-এ ধন্নার চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান শরৎ। এর পর থেকে তিনি ক্রমে নেগেটিভ রোলেই অভিনয়ের সুযোগ পেতে থাকেন। দিনের শেষে তাঁকে হতাশা গ্রাস করত। কারণ ক্রমাগত খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করতে তাঁর ভাল লাগত না। কিন্তু তত দিনে তাঁর বিয়ে হয়ে গিয়েছে। জন্ম হয়েছে প্রথম সন্তানেরও। ফলে সংসারের দিকে তাকিয়ে অভিনয় করে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।

এক সময় এ রকমও হয়েছিল তাঁর ব্যাঙ্কে মাত্র ৫০০ টাকা পড়েছিল। এ দিকে হাতে কোনও কাজও ছিল না। বাধ্য হয়ে টেলিফোন ডাইরেক্টরি খুলে তিনি ইন্ডাস্ট্রির যত জনের নাম পেয়েছিলেন, সকলকে ফোন করে কাজ চাইতে থাকেন।

এর পর কাজ পেতে সমস্যা হয়নি ঠিকই। কিন্তু কাজে তৃপ্তিও পেতেন না তিনি। মানসিক হতাশার পাশাপাশি ছিল চোট আঘাতের সমস্যা। অ্যাকশন দৃশ্যে শ্যুটিং করতে গিয়ে শরৎ বহু বার গুরুতর চোট পেয়েছেন। ৮ বার করাতে হয়েছে অস্ত্রোপচার।

একঘেয়েমির জন্য শরৎ এক বার ভাবেন তিনি এই ধরনের চরিত্রে অভিনয় করা ছেড়েই দেবেন। স্বাদবদলের জন্য কিছু দিন কাজ করেন দক্ষিণী ইন্ডাস্ট্রিতে। কিন্তু সেখানেও সেই খলনায়কের সহকারী! অন্য কোনও ভূমিকায় তাঁকে কেউ ভাবছিলেনই না।

অবশেষে ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’ ছবিতে নেগেটিভ কমিক রোলে অভিনয়ের সুযোগ পান শরৎ। শেখর কপূরের পরিচালনায় এই ছবি থেকে তিনি নতুন ধরনের ভূমিকায় অভিনয় শুরু করেন। এর পর ‘ত্রিদেব’, ‘অগ্নিপথ’, ‘বাদশাহ’, ‘ডুপ্লিকেট’, ‘ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানি’, ‘ঘায়েল’-সহ বেশ কিছু ছবিতে তিনি পর পর অভিনয় করেন। কিন্তু পর্দায় তাঁর উপস্থিতি আর দীর্ঘ হয় না। সেখানে তাঁকে দেখা যেত অল্প সময়ের জন্যই।

২০০০ সালে তিনি অভিনয় করেন সুনীল শেট্টির ‘আগাজ’ ছবিতে। এই ছবির জন্য তিনি মাথার সব চুল কেটে ফেলেছিলেন। তার পর  তাঁকে দেখা গেল নতুন লুকে। কারণ সে সময় তিনি আর চুলে ডাই করাননি। পাকা চুলে তাঁর নতুন লুক পছন্দ হয় পরিচালক-প্রযোজকদের।

নতুন লুকেই তিনি ‘সাথিয়া’ ছবিতে রানি মুখোপাধ্যায়ের বাবার চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। অতীতের খলনায়ক-সহকারীকে এ বার নতুন রূপে পেল বলিউড। তিনি অভিনয় করতে লাগলেন বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে। ‘গুলাম’, ‘হেরাফেরি’, ‘ভাগম ভাগ’, ‘বডিগার্ড’, ‘রেডি’-র মতো ছবিও তাঁর কেরিয়ারের পালে নতুন গতি যোগ করে। ৩ দশক অপেক্ষার পরে অবশেষে বলিউড শরতের অভিনয়প্রতিভাকে কুর্নিশ জানায়।

৪৫ বছর পেরিয়ে গিয়েছে, বলিউডে কাজ করছেন শরৎ। তবে তাঁর ছেলে ছবির জগতে পা রাখতে আগ্রহী নন। তিনি কানাডায় থাকেন। শরতের মেয়ে বীরা কাজ করেছেন ‘হান্টার’ ছবিতে। তাঁকে ‘রেস’ ছবিতে গানের সুযোগও দিয়েছেন সলমন খান।

নায়ক হতে না পারলেও চরিত্রাভিনেতা হয়ে বলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করতে পেরেছেন শরৎ। প্রথমে ভেবেছিলেন হয়তো ৩ বছরও কাজ করতে পারবেন না। সেখানে ইন্ডাস্ট্রিতে কাটিয়ে দিলেন ৪৫ বসন্ত। অভিনয়ের প্রতি নিখাদ ভালবাসাই তাঁকে এই দীর্ঘ ধৈর্যের শক্তি দিয়েছে। ধারণা অনুরাগীদের।