সালটা ১৯৭৭, আমিই প্রথম উত্তমকুমারের কাছে গিয়েছিলাম, টেগোর সোসাইটি অফ ন্যুইয়র্কের ভারতবর্ষের একমাত্র প্রতিনিধি হয়ে।

আমি প্রথমেই বললাম কানাডা এবং আমেরিকার বহু ভারতীয় সংস্থা অনেকদিন ধরেই ভাবছে আপনাকে সংবর্ধনা দেবে। ওই সব সংস্থার প্রতিনিধি হিসাবে আপনাকে আমি নিমন্ত্রণ জানাতে এলাম। এর আগে আমরা সুচিত্রা মিত্র, নিখিল ব্যানার্জি, সত্যজিৎ রায়, আরও বহু নামী শিল্পীদের নিয়ে অনুষ্ঠান করেছি। উত্তম আমার সব কথা শুনলেন। তারপর আস্তে আস্তে বললেন, আমাকে কেন? আমি ওখানে গিয়ে কী করব, আমি তো সাধারণ অভিনয় ছাড়া আর কিছুই জানি না। আমাকে দিয়ে আপনাদের কোন উদ্দেশ্যই সফল হবে না। বললাম, আমরা প্রবাসী ভারতীয়, কিছু মার্কিন দর্শকের কাছে কয়েকটা ছায়াছবির মাধ্যমে আপনাকে তুলে ধরতে চাই। বাস্তব পরিবেশে গেলে সব কিছু বুঝতে পারবেন। এরপর নানারকম সৌহার্দ্য-পূর্ণ কথায় অনেক সময় কেটে গেল। শেষে তিনি বললেন, ভেবে দেখি। এরপর অনেক দিন কেটে গেল। শেষ পর্যন্ত এই ব্যস্ত শিল্পী আমাকে একদিন বললেন, আমি বিদেশে যাব না। উত্তমকুমারের বাড়ি থেকে চলে আসার পর একটা বছর কেটে গেল। প্রায়ই বিভিন্ন সেটে ওর সঙ্গে আমার দেখা হত। উনি একটু হাসতেন। আমিও হাসতাম। কোন কথা হত না।

মনে পড়ছে ১৯৭৮ সালে কোনও একদিন শীতের দুপরে ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে তিনি হঠাৎ বললেন, ‘আমার বিদেশ যাওয়ার কী হলো? আমি একটু থতমত খেয়ে বললাম, কাল সকালে কথা হবে বাড়িতে। তিনি বললেন, আচ্ছা। আমি যথাসময় সকালবেলা বাড়িতে গেছিলাম। সবশেষে ঠিক হলো ১৯৭৯ সালের ১৪ই আগস্ট উত্তমদা এবং সুপ্রিয়াদি আমার সঙ্গে আমেরিকা এবং কানাডার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য যাত্রা করবেন।

আরও পড়ুন: ফ্লপ থেকে সুপারস্টার: মহানায়কের উত্তম-জীবনের আখ্যান

‘নায়ক’ ছবির দৃশ্যে উত্তমকুমার।

বি ও এ সি নাইট ফ্লাইটে আমরা আমেরিকার উদ্দেশে যাত্রা করলাম। (এর ফাঁকে একটা কথা বলে রাখি। দমদম বিমান বন্দরে বিদায় সম্ভাষণ জানাতে গিয়ে জনতা এবং কর্মীর মধ্যে এমন হইচই শুরু হয়ে গেল, শেষপর্যন্ত প্লেন দশ মিনিট দেরিতে ছাড়তে বাধ্য হয়। পরে শুনেছি বি ও এ সির ইতিহাসে এটা একটা বিরল ঘটনা।) ডুবি-র আকাশে প্লেনটা পাক খাচ্ছে। উত্তমদা সামনে শিশুর মতো ঘুমাচ্ছেন। এথেন্স-এ আসার পর আস্তে আস্তে পৃথিবী আলোকিত হয়ে উঠল। সূর্যের আলো ফোটার পর উত্তমদাকে খুব সুস্থ এবং স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। বললেন, “রামকৃষ্ণ তোমাকে ধন্যবাদ, যে পরিশ্রম করে তুমি আমাকে এই বাইরের পৃথিবীতে নিয়ে এলে, এখন ভাবছি তোমাকে এতদিন ধরে নানাভাবে নাস্তানাবুদ এবং না ঘোরালেই পারতাম। আমি দুঃখিত। আসলে কি জান পৃথিবীতে এত বেশী অসৎ মানুষ, মাঝে মাঝে ভয় করে। বিদেশে কোথায় গিয়ে বিপদে পড়ব বলা তো যায় না। লন্ডনের সকালটা খুব মিষ্টি লাগছে। একটা স্বাধীনতা অনুভব করছি। ফ্যানদের অত্যাচারের মধ্যে যে এক ধরনের ভালো লাগা সেটা এখানে নেই। কেমন যেন এক ধরনের মানসিক শূন্যতা বোধ করছি।’’ পাশে দাঁড়িয়ে বেনুদি মিষ্টি মিষ্টি হাসি হাসছিলেন। লন্ডন এয়ারপোর্টে, প্যাসেঞ্জার লাউঞ্জের দিকে উত্তমদার চেয়ে আমি একটু এগিয়ে গিয়েছিলাম। স্বভাবতই পরের ফ্লাইট কখন যাবে এই সব নানা ধরনের কাজে। পিছন ফিরে দেখি উত্তমদা কেমন সিটকে রয়েছেন। বেশ কিছু ভারতীয় অবাক হয়ে দেখছে সত্যিই উত্তমকুমার কিনা। কিছুক্ষণের মধ্যে বেশ কিছু কৌতূহলী মানুষের ভীড় এবং তাদের প্রশ্ন শুরু হয়ে গেল। তবে পরিবেশটা খুব সুস্থ এবং গম্ভীর ছিল। এইভাবে বেশ কয়েক ঘণ্টা কেটে যাবার পর আমরা পরের ফ্লাইটে নিউ ইয়র্কে রওনা হলাম।
স্ট্যাচু অব লিবার্টির উদ্যান প্রাঙ্গন। উত্তমদা, বেনুদি এবং আরও অনেক ভারতীয় গোল হয়ে বসে নানারকম হাস্যকৌতুক করছে। উত্তমদারই নাম দেওয়া নিউ ইয়র্কের রবি ঘোষ ( মৃণাল চৌধুরী) নানাধরনের হাস্যকৌতুক পরিবেশন করল। হঠাৎ উত্তমদা আমাকে বললেন, আমি শিল্পী হিসেবে ব্যর্থ। আমার সামনে যেসব চরিত্র স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পাচ্ছে, এদের ভূমিকায় যখন আমাকে অভিনয় করতে হবে আমি জানি না আমি সেদিন পারব কি না। চলচ্চিত্র শিল্পকে ড্রয়িং রুমে সাজিয়ে রাখলে চলবে না। মানুষের অনেক কাছে নিয়ে যেতে হবে। আমাদের চিত্রনাট্য এবং অভিনয় ধারাকে পালটাতে হবে। তুমি একটা বিষয় লক্ষ্য করেছ? এদের মধ্যে হঠাৎ অন্যমনস্কতা, হাসির পর চুপ করে থাকার মধ্যে কিরকম একটা অদ্ভুত সারটেন চেঞ্জ হচ্ছিল। আশেপাশের বিদেশী মানুষগুলোর আনাগোনা এবং দেখা কী অদ্ভুত অর্থময় তাই না?

অ্যামট্র্যাক আমেরিকার একটা বিলাসবহুল ট্রেন। আমি, উত্তমদা এবং সুপ্রিয়াদি বোস্টন অভিমুখে যাত্রা করলাম। এই প্রথম দেখলাম উত্তমদা কেমন আনমনা হয়ে পড়লেন। সমস্ত ট্রেনের মধ্যে নিগ্রো এবং মার্কিন পুরুষ ও মহিলাদের ভিড়। ওরা কেউ জানে না ভারতের কত বড়ো একজন শিল্পী তাদের সঙ্গে একই ট্রেনে যাচ্ছেন। কোন কৌতূহল নেই, বিস্ময় নেই, একটা চলমান নীরবতা। উত্তমদা ছেলেমানুষের মতো সমস্ত ট্রেনটাতে পায়চারি করতে লাগলেন। বেনুদি উত্তমদাকে ঔষুধ খাওয়ানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। উত্তমদা হঠাৎ বললেন, চার্লটন হেস্টন, রিচার্ড বার্টন, এলিজাবেথ টেলর কিংবা এলভিস প্রেসলি কলকাতা থেকে বোম্বাই অভিমুখে এইভাবে যাচ্ছে তুমি ভাবতে পারো? নিরুদ্বিগ্ন শান্তিময় যাত্রা। অথচ আমার মতো একজন ভারতের প্রথম শ্রেণীর শিল্পী পরিচয়হীন ভাবে এদের সাথে একই ট্রেনে যাচ্ছে। আমার ভাবতে কেমন অবাক লাগছে। আসলে কী জান, ভারতের কোন সত্যিকারের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিদেশির কাছে আমরা এখনও তুলে ধরতে পারিনি। আমাদের প্রচারযন্ত্র বলে কিছু নেই। ভারতবর্ষ যতখানি বিচ্ছিন্ন ততখানি সামগ্রিক নয়। আমরা যতখানি বাঙালি, হিন্দুস্থানী, দক্ষিণ-ভারতীয় ততখানি ভারতীয় নই। মোরারজি, ইন্দিরা, রবিশঙ্কর আর সত্যজিৎ এরা আর কী করতে পারেন। আর উত্তমকুমারই বা কে ? আমরা কেউ কিছু করিনি, ভাবিনি। ভারতের বাইরে এসে কালচারাল এক্সচেঞ্জ, পিসফুল কো-একজিসট্যানস ইত্যাদি গালভরা বুলি আউড়ে বাড়ি ফিরে গেছি। টেগোর সোসাইটির মাধ্যমে তুমি যা করলে এটা তো অন্য ভাবেও হতে পারত, তাই না? যেমন ধরো ভারতীয় দূতাবাস, মার্কিন এবং ভারতীয় কিছু সংস্থা সত্যজিৎ রায় এবং ঋত্বিক ঘটকের ৮-১০টা ছবি নিয়ে একটা চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করতে পারত। আমি, সৌমিত্র, শর্মিলা, সুপ্রিয়া সবাই এসে যৌথভাবে যদি কাজটা করতাম তাহলে হয়তো এদের মধ্যে কিছুটা ইমপ্যাক্ট  সৃষ্টি করতে পারতাম। ক্রমাগত একটা সাংস্কৃতিক পরিবেশ সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা করলে যদি কিছু হয়। আমরা কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছি না। আমাদের সবচাইতে বড়ো অক্ষমতা আমরা অর্গানাইজড ভারতীয় নই। সুতরাং এসব ভেবে কিছু লাভ নেই কি বলো? আমি বললাম, “আপনি হঠাৎ ভেঙে পড়ছেন কেন? এদের প্রতি আপনার একটু অভিমান আছে তাই না? উত্তমদা বললেন, “অভিমান! এরা তো আমাকে আর্টিস্ট বলেই স্বীকার করে না। আমি নাকি বুদ্ধিজীবী নই। জনগণের জন্য আমরা ব্যবসায়ী ছবি করি। শিল্পের ব্যাপারী। অভিমানটা সুস্থ নয়। আরে বাবা, বাংলা চলচ্চিত্র যদি ইন্ডাস্ট্রি না হলো এবং জনসাধারণের যদি ইনভলমেন্ট না রইল তাহলে আর্ট ফিল্ম হবে কি করে? আর্ট ফিল্ম করে লাভই বা কি?”...

আরও পড়ুন: অস্তমিত উত্তম

চলচ্চিত্রে উত্তম-সুপ্রিয়া জুটিও কম জনপ্রিয় ছিল না।

...দেশে ফেরার আগের দিনের রাত। বহু ভারতীয় আমেরিকা, কানাডার বিভিন্ন শহর থেকে নানা উপহার নিয়ে উত্তমদা এবং সুপ্রিয়াদিকে শেষবারের মতো বিদায় সম্ভাষণ জানাতে এলেন। আমরা সবাই কেমন যেন বেদনাতুর হয়ে উঠলাম। উত্তমদা এবং বেনুদির চোখেমুখে একটা নীরব বিষণ্ণতা।

বললেন, “আমার জীবনটা নিয়ে তুমি এবং আমি যে গানটা ছন্দে বাঁধলাম সেই লেখাটা কী হলো? ওটাতো আর সুর দিয়ে গান করা হলো না।’’

আমি- নানা ব্যস্ততায় আর হয়ে উঠল না। ঠিক আছে, কলকাতায় গিয়ে অনলদাকে দিয়ে সুর করাবো তারপর আপনি গাইবেন।

উত্তমদা একটু হাসলেন, “বেশ তাই হবে। কিন্তু লেখাটা এখনো গান হয়ে ওঠেনি, এলোমেলো করে লেখা, লোকে নির্বোধ ভাববে।’’ আমি বললাম, “আপনি এবং আমি কেউ কবি বা গীতিকার নই, কেটেকুটে সুন্দর করে লাভ কি? এমনিই থাক না আপনার জীবনের একটা মুহূর্তের প্রকাশ। আপনার অনুরাগীরা নিজের নিজের কল্পনা এবং আবেগ দিয়ে ফাঁকটুকু ভরিয়ে নেবে।’’

উত্তমদা রাতের ফ্লাইটে লন্ডন হয়ে দেশে ফিরে গেলেন। আমি আমেরিকার আরো কিছু কাজ সেরে মাস দুই পরে দেশে ফিরলাম। আজ এই স্মৃতিচারণ লিখতে বসে সেই গানটির কথা মনে পড়ছে। উত্তমদা বলতেন, ‘‘আমার একদিন জীবনে হয়তো এইসব কিছুই থাকবে না। এক মাথা পাকাচুল নিয়ে মানুষের স্মৃতির মধ্যে শুধু অতীতের স্বপ্ন হয়ে যাবে।’’

বাঙালির চিরকালের ‘দ্য পারফেক্ট ম্যান’ উত্তমকুমার।

আমি নায়ক হয়ে পঁচিশটা বছর পেরিয়ে এলাম,

মানুষের এই ভাঙাগড়া-এ খেলাঘরে

সূর্যবিহীন রাত্রির মতো কত সুখ কত বেদনা-

সবকিছু অনাদরে মুছে ফেলে,

আমাকে শুধু, থাকতে হবে স্মৃতির স্বপ্ন নিয়ে।

তোমরা জান না বোঝ না আমারও একটা নিজস্ব জীবন আছে,

বন্দরের নাবিকের মতো আমি শুধু বাঁচতে চাই,

তোমাদের দূর থেকে দেখা শান্ত হৃদয়ের মাঝে।

আমি নায়ক হয়ে

এ খেলাঘরে

শহর ঘুমিয়ে পড়লে ভাললাগে শহরের স্বাদ নিতে?

শরীর মন ছেয়ে যায় যে ভাটিয়ালি গানে,

আমিও ওদের মত সূর্যের খোলা মাঠে-

ফিরে পেতে চাই অজস্র সুখ প্রকৃতির প্রাণে

আমি নায়ক হয়ে

এ খেলাঘরে।

এ গানটি তাঁর আর গাওয়া হলো না। উত্তমদা বলতেন, মানুষকে আমার জীবনের সব সৃষ্টি দিয়ে যাব যা আমি পারি। কেবল গান দেব না, দুঃখের দিনে গানটা আমার জীবনের একান্ত ব্যক্তিগত প্রেরণা হয়ে থাকবে। অবসর সময়ের জন্যে যে স্মৃতি তিনি নিজেই চেয়েছিলেন, আজ সেই স্মৃতি আমাদের সকলকে দিয়ে তিনি চলে গেলেন।

(নিবন্ধের এই অংশবিশেষ‘মহানায়ক উত্তমকুমারের হারিয়ে যাওয়া ৪২ দিন’ গ্রন্থ থেকে নেওয়া। প্রকাশক: পোয়েটস ফাউন্ডেশন কলকাতা)

(বানান অপরিবর্তিত)