Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৯ অক্টোবর ২০২১ ই-পেপার

পয়লা

১৩ এপ্রিল ২০১৬ ০০:২১

পয়লা প্রেম

সব্বার লাইফে আসে, কারও কারও জীবনে সেটল করে যায়। দিব্যি ব্যাগপিঠে মন দিয়ে ইস্কুলবিহার হচ্ছিল, হঠাৎ কোত্থেকে অচেনা হাওয়া এসে পরীক্ষার খাতা ওলটপালট করে দিয়ে সে একেবারে যাচ্ছেতাই কাণ্ড! এই সব দস্যি হাওয়া সাধারণত পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ইউনিফর্মের আঁচল থেকেই আসে। সে আঁচল ফলো করে মুখের দিকে চেয়েছ কী মরেছ! প্রথম প্রেম অর্থাৎ সাক্ষাৎ মরণ। সেই মুহূর্ত থেকে গোটা পৃথিবী এক দিকে, সে এক দিকে। ফুল ফুটছে তার জন্য, টিফিনে ডিম্পারুটি আসছে তার জন্য। সে প্রেমের পরিণতি যাই হোক না কেন, পরি’র কাছে সে-ই তো প্রথম নতিস্বীকার, এমন স্মৃতি কক্ষনও এডিট করা যায় না।

মেয়েরা অবিশ্যি নার্সারি থেকে প্রেমে পড়বার প্রতিভা রাখে এবং অনেক ক্ষেত্রে সেই প্রেমই বার্ধক্যের ব্যালকনি অবধি গড়ায়। প্রথম প্রেম তাদের শেখায়, কী ভাবে চিঠি লুকোতে হয়, এবং কোথায়।

Advertisement

পয়লা সিনেমা

মা’র হাত ধরে ‘লালু ভুলু’ বা বাবার নজরদারিতে ‘টারজান দ্য এপম্যান’-কে নিশ্চয়ই কোনও সুস্থ বাঙালি তার পয়লা পিকচার বলে ধরবে না। এখানে ক্যাটেগরি দু’খানা। এক, স্কুল কেটে সেই সব সিনেমা। বড় দাদারা হলফেরত তাচ্ছিল্যের চাউনি দিয়ে গেছে যে সব সিনেমার খাতিরে। যে সব সিনেমার পীঠস্থান বাংলা, বুকস্থান হিন্দি, কারসাজি টোটাল ইংরেজি, সেই সব সিনেমা। হলের অন্ধকারে, বন্ধুর তিন ইঞ্চি দূরত্বের মধ্যে বসে আস্তে আস্তে বড় হয়ে যাওয়া। হঠাৎ আবিষ্কার করা, অ্যাদ্দিন কী লজ্জাজনক নিরিমিষ দিন কাটাচ্ছিলাম! আর বাড়ি ফিরে আগুন সেই নীলচে ছবির নায়িকাকে ভেবে বালিশের ওপর চূড়ান্ত ইমোশনাল অত্যাচার। আহা...সেই সব নীল হল আর ছেলের দল, কোথায় যে গেল...

দু’নম্বর হচ্ছে গিয়ে পেথ্যমবার প্রেমিকের কনুই টাচ করে কোনার টিকিট কেটে অক্ষয়-মাধুরী। এবং হাফটাইমের আগে কিশোরী-কণ্ঠে ‘ধ্যাৎ, ভাল্লাগে না’। মাল্টিপ্লেক্সের কপোত-কপোতীরা এই লাজুক উড়ান কল্পনাই করতে পারবে না।

পয়লা মাইনে

যে কোনও মানুষকে রাজা করে দিতে পারে এই আশ্চর্য প্রদীপ। প্রথম স্যালারি। জীবনের অ্যামেচার গ্যালারি থেকে মুক্তি দিয়ে মাঠে নামায়। বলে, ডার্লিং, ঘামের চেয়ে ভাল পারফিউম আজও আবিষ্কৃত হয়নি। আজ থেকে কয়েক বছর আগে পর্যন্ত মধ্যবিত্ত বাঙালি বাড়ির ছেলেমেয়েরা কলেজে উঠতে না উঠতেই টিউশন পড়াতে শুরু করত। ঝোলা কাঁধে বাড়ি বাড়ি গিয়েই হোক, আর নিজের বারান্দায় ঝাপসা চাটাই পেতেই হোক। তাতে প্রেম হত ঠিকই, আয় তেমন কিছু হত না।

চারটে চটি ক্ষইয়ে ফেলার পর একখানা চাকরি জুটে যাওয়া, এ ছিল টি টোয়েন্টির শেষ বলে ছক্কা হাঁকানোর চেয়েও বেশি রোমাঞ্চকর। আর পয়লা মাইনে? তার চেয়ে বড় বিশ্বকাপ আর হয় না। ক’টাই বা টাকা? কিন্তু মা’র শাড়ি, বাবার ফতুয়া, ভাইয়ের বই, প্রেমিকের সানগ্লাস কেনার পরেও পোষা বেড়ালটার জন্যে দুধ কেনার টাকা বেঁচে থাকত। আর থাকত চাপা একটা গর্ব, বুকের চিলেকোঠায় মুখ গুঁজে থাকা। অর্জনের গর্ব, টাকার নয়।

পয়লা চুমু

কখন সে আসবে, কেউ বলতে পারে না। এমনকী নস্ত্রাদামুও। কিন্তু যখন আসবে, তখন যে সব ভাসিয়ে নিয়ে যাবে, এ কথা নেতারাও স্বীকার করবেন। হয়তো অনেক কল্পনা মাথার দু ইঞ্চি ওপরে ফুরফুরে শামিয়ানা টাঙিয়েছে, হয়তো অনেক রুমালের কোনা নরম আঙুলের প্যাঁচ সহ্য করেছে সারা সন্ধে, কিন্তু বহু জল্পনার পরেও সেই মুহূর্ত আসেনি। পাড়ার বিল্টুদা’র ছদ্মবেশে শেক্সপিয়র রোজ কানের কাছে উসকে দিয়েছেন তেষ্টা... টু বি অর নট টু বি। অনেকে ছুঁবি অর নট ছুঁবি শুনেছে, কিন্তু এগোতে পারেনি। আসলে প্রেমিক প্রেমিকা তো এগোয় না। এগোয় হাওয়া, জল আর আগুন। তারাই মানুষের প্রথম চুমুগুলো স্মরণীয় ভাবে টেলর মেড করে রাখে।

তারপর একদিন হঠাৎ ভিজে ঠোঁটের মধ্যে আরেক ভিজে ঠোঁটের আত্মসমর্পণ... লজেন্স চোষার বাইরে জিভের আরও যে ভূমিকা থাকতে পারে, তা বুঝে যাওয়া এক ধাক্কায়। আর এই প্রথম, এত কাছ থেকে ‘তার’ নিশ্বাসের গন্ধ পাওয়া। আগামী শত চুম্বনেও যে-গন্ধ ম্লান হবে না কোনও দিন। প্রথম চুমু আসলে একটা গোপন মোহর, যা কখনও খরচ করা যায় না।

পয়লা পেগ

সুদীপ্তদের খোলা ছাদ, চাঁদা তুলে কিনে আনা রামের পাঁইট। সুদীপ্ত’র বাবা-মা পুরী গেছেন, দিদি সেই সুযোগে প্রেমিকের বাড়ি। বন্ধুরাই বা ছাড়ে কেন? খুরিতে খুরিতে ভাগ হয়ে যাওয়া লিকুইড লাল জ্যোৎস্নায় প্রথম চুমুক। কণ্ঠনালী আজও সেই তারল্যের ঝাঁঝ মনে রেখেছে। তখন স্কচ ও দেবযানী, কেউই জীবনে আসেনি। কেবল বড় হয়ে নেওয়ার তাগিদে, তোয়াক্কাহীন হয়ে ওঠার জেদে রাম তেরি গঙ্গা ময়লি। পাঁইটে আর কতখানি জোয়ার ধরে? কিন্তু তাতেই পাঁচজন প্রায় আউট, একটু পরে রাতের আকাশময় পেগে ঢাকা তারা।

পরে বহু এলেমদার পার্টিতে আনলিমিটেড দামি পানীয়ের মুখোমুখি হলেও, জ্যোৎস্না বলে ভুল হয়নি তাদের। সুদীপ্তদের বাড়িটা ভাঙা পড়েছে বছর দশেক আগে। কিন্তু অপার্থিব সেই ছাদটা আজও সকলের মাথার ভেতর ভেসে বেড়ায়।

পয়লা শাড়ি

ষোলোখানা লম্বা বছর যা করতে পারে না, একটা হলুদ তাঁতের শাড়ি তিন মিনিটে সেটা করে দেয়। এক লহমায় স্বপ্নের প্রোমোশন পায় কিশোরী। পরিপাটি করে শাড়িখানা পরে, আঁচল ঘুরিয়ে এক হাতে ধরে নিয়ে সারা বাড়িময় পায়ে পায়ে উড়ে বেড়ানো। যেন কিছুই হয়নি এমন একটা ভাব, কিন্তু তার ধুকপুকুনি সে নিজেই শুনতে পাচ্ছে সারাক্ষণ। যদিও সে যে প্রাণাধিক শাড়িটি নিয়ে চূড়ান্ত সজাগ হয়ে আছে, তা বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই। যে দেখছে, সেই অবাক। ‘ও মা, এ তো এক্কেবারে লেডি!’ বা ‘দেখি দেখি, কত্ত বড় হয়ে গেছিস, হ্যাঁ?’... এসব শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে জুড়িয়ে যায়। তার নরম পায়ের পাতায় পাতায় মেঝেময় টেক-অফের আলপনা আঁকা হয়ে যায় ওই একটি দিনেই। আর সে কেবল আড়চোখে ঘাড়ের দিকে তাকায়... ছটফটে আর মিচকে স্ট্র্যাপটা বাইরে বেরিয়ে আসছে না তো? শাড়ি। এক আশ্চর্য টাইম মেশিন। যা খাতায় কলমের ষোলোকে সত্যিকারের ষোলো করে দিতে পারে। পয়লা আদরেই।



পয়লা বিচ্ছেদ

সন্ধেগুলো যে কত বিচ্ছিরি, সকালগুলো মানেহীন, শহরটা যে পাষাণ আর এ জীবন রাখার যে কোনও কারণই নেই, প্রথম বিচ্ছেদ তা হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে দেয়। কেন ছেড়ে গেল সে? কেন মানিয়ে নিতে পারলাম না আমি? কেন মাথাগরম করলাম? এইসব আক্ষেপের চাইতেও বেশি করে মনে হয়, সবে তো ১৮ এখন। বাকি জীবনটা বাঁচব কী নিয়ে? A সার্টিফিকেট পাওয়ামাত্রই The End দেগে দিল, জীবন কি এতটাই নির্মম? অথচ কী মজার কথা, যার সঙ্গে শেষদিকে পাঁচ মিনিটও ভাল মুডে কাটছিল না, এখন তাকে ছাড়া এক সেকেন্ডও ভাল লাগছে না। বিচ্ছেদ, অন্তত পয়লা বিচ্ছেদ বড় আজব ধাঁধা।

কেউ কেউ আত্মহত্যার কথা ভাবে, কেউ ঘুরিয়ে ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ফোর্থ গিয়ার, আর বাকিরা কবিতা লেখে। লিখেই চলে। তারপর একদিন বন্ধুদের আড্ডায় আবার যাওয়া শুরু হয়, টম ক্রুজের নতুন সিনেমা এলে প্রাণ আনচান করে, কবিতাগুলো জড়ো করে পাণ্ডুলিপি বানাতে ইচ্ছে হয় খুব। বিচ্ছেদ, পোষ না মানা জন্তু, সে কি পোষ মেনে গেল তাহলে? উহু। আগেকার দিনের মানুষ যেমন বাঘ শিকারের পর ছালটা পেতে রাখত বসার ঘরে, বিচ্ছেদও আমাদের মুক্তি দেয়। আমাদের ছালটা পেতে রাখে তার ঘরে। হঠাৎ একদিন বইমেলার ধুলো সরতেই যখন সামনে তাকে দেখা যায়, পুরনো, প্রথম সেই পেরেকটা গলার কাছে জেগে ওঠে। আর কিছু না।

পয়লা সমুদ্র

এত এত এত জল যে একসঙ্গে থাকতে পারে, আর তার বিস্তার যে এতটাই হতে পারে যে চোখের ক্ষমতায় পেরিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না, প্রথমবার সমুদ্র দেখলে সেটা বোঝা যায়। এই তা হলে সমুদ্র? এত দিন ম্যাপে যাকে চার বাই চার দেখে এসেছি? এই তাহলে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের মহাজাগতিক সিম্ফনি? এই তাহলে দূরে ভেসে চলা ট্রলারদের আলো-সংকেত? পা ভিজিয়ে বালিতে বসে থাকার রাজকীয় উদাসীনতা এই তাহলে? প্রথম সমুদ্রের মতো সারপ্রাইজ প্যাকেজ প্রকৃতির আর দুটি নেই। সস্তার হোটেল হতে পারে, হতে পারে চালে কাঁকড়ের খোঁটা, কিন্তু ফাইভ স্টার থেকে রোড সাইড, যে কোনও মানুষের জন্যে সমুদ্র তার গোল্ড ক্লাস খোলা রেখেছে। বন্ধুদের শত্রুতা, মাসে আরেকটু বেশি রোজগারের চিন্তা, প্রেমিকার বাবা, প্রেমিকের মায়ের মুখ, সমস্ত কিছু এক লহমায় তুচ্ছ করে দিতে পারে এই প্রাগৈতিহাসিক জলরাশি। প্রথমবার সমুদ্রকে কাছে পেয়ে সকলেই অনেক কিছু ভাসিয়ে দিয়ে আসে। বছর বারো পরে সেই সৈকতে গিয়ে সেসব আর খুঁজে পাওয়া যায় না। কেবল হোটেলে ফিরে যাওয়ার রাস্তাটুকু ছাড়া।



পয়লা কবিতা

প্রেমে পড়েই হোক, হাফসোল খেয়েই হোক, কোকিলের ডাক শুনেই হোক বা ঝমঝম বৃষ্টি ভিজেই হোক, টুক করে একটা খাতা বার করে চার লাইন লিখে ফেলেনি, মধ্যবিত্ত বাঙালি ছেলেমেয়ে এমন দাবি করতেই পারবে না। আর এই লেখা কখনওই গদ্য নয়। ডিম ফেটে মুখ বার করা একটি ছোট্ট কাব্যশাবক। এবড়ো খেবড়ো শরীর, ভেঙে যাওয়া অন্ত্যমিল, গদগদ আবেগ, এবং অন্যান্য ত্রুটি ও আতিশয্য সত্ত্বেও, সে কবিতার কথা কি ভুলতে পারে কেউ? একটা থেকে দুটো, দুটো থেকে তিনটে, খাতা থেকে বন্ধুরা, বন্ধুদের হাত থেকে স্কুল ম্যাগাজিন, এমন করেই ছড়িয়ে পড়তে থাকে কবিতার শরীর। আর সকলের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে হঠাৎ ঘটে যাওয়া সেই দুর্ঘটনা। প্রথম কবিতা।

কবিতাকে অনেকে ধরে রাখে না শেষমেশ। কবিতাও সকলকে আটকে রাখতে চায় না। কেউ কেউ চেষ্টা করে যায় দিনের পর দিন। এই যেমন আমি করছি। আর খাতা থেকে মুখ তুলে তাকালেই আজও দেখতে পাচ্ছি প্রথমবার কবিতা লেখার সেই দিনটাকে, যা আমার অজান্তেই আমার জীবন পাল্টে দিয়ে গিয়েছিল। ফের খাতায় মুখ নামিয়ে লেখার চেষ্টা করছি আরও একখানা কবিতা। আর লিখতে লিখতে বুঝতে পারছি, সব কবিতাই আসলে প্রথম কবিতা।

পয়লা বৈশাখ

সে ছিল একদিন আমাদের যৌবনে কলকাতা’ – একটা বয়েস পেরিয়ে গেলে সকলেই এমনটা ভাবেন। আমিও তার বাইরে নই। পয়লা বৈশাখ মানেই ছিল রীতিমতো উৎসব। সীমিত সামর্থ্যেও তখন উৎসব হতে পারত। চৈত্র সেল থেকে দরদাম করে কেনা ফিনফিনে ফতুয়াই তখন আমার দুঃখের সঙ্গী। বাড়িতে বিশেষ কিছু না হলেও, মামার বাড়িতে সন্ধে থেকে গানবাজনা হত প্রতি বছর। সেই ছিল নতুন বছরকে বরণ করে নেবার সেরা উপায়, আমাদের কাছে।

তারপর একদিন কাঁচা কাঁচা কয়েকখানা কবিতার বই লেখার সুবাদে প্রকাশকের হালখাতায় ডাক পেতে থাকলাম। তরুণ কবিদের কোরাসে দাঁড়িয়ে দেখতাম ওই আসছেন তসরের পাঞ্জাবিতে সুনীল, ওই শংকরের পকেট থেকে উঁকি মারছে ফাউন্টেন পেন, ওই সমরেশ মজুমদার চায়ের কাপ হাতে নিলেন, ওই সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের কথায় হাসিতে ফেটে পড়ছেন সকলে। সেইসব তারাভরা গ্রীষ্মের পয়লা দুপুর আমাদের কাছে অলৌকিক হয়ে থাকত।

‘আজ সেই ঘরে এলায়ে পড়েছে ছবি’। মামার বাড়ির গানবাজনা নেই, সুনীলদা’র হো হো হেসে ওঠা নেই, জুঁই ফুলেও তেমন গন্ধ নেই আর। আছে বলতে ৪১ ডিগ্রির একটা ফুটন্ত দুপুর, যার নাম পয়লা বৈশাখ। আর আছি হালখাতার মার্জিনে অকালবয়স্ক আমরা কয়েকজন। আমাদের হাত ফসকে পয়লা কখন ১লা হয়ে গিয়েছে, বুঝতেই পারিনি। আয়নার এক কোণে লেপটে থাকা একটা ছোট্ট টিপের মতোই একলা সে...

ছবি: কৌশিক সরকার

আরও পড়ুন

Advertisement