বিশ্বায়ন এক ধাক্কায় বাঙালি জীবনকে অনেকটাই পালটে দিয়েছে। পালটে গিয়েছে মূল্যবোধ, সামাজিক কাঠামো, কেরিয়ার এমনকী প্রেমও। নতুন শতাব্দীর প্রথম দশকে যে ছেলেমেয়েরা স্কুল ছাড়িয়ে কলেজ, কলেজ ছাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়িয়ে চাকরিতে পা দিচ্ছিল, তাদের সঙ্গে আগের প্রজন্মগুলোর উথালপাথাল দূরত্ব গড়ে উঠেছিল। আবার আগের প্রজন্মগুলোর কাছেও সময়টা একেবারে আনকোরা ভাবনা নিজে হাজির হয়েছিল। মোবাইল, ইন্টারনেট আগে এলেও এই সময় থেকে অ্যালবাট্রসের মতো ডানা ছড়াল। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলো বদলে দিল বন্ধুত্বের ব্যাকরণ। তাই এই সময়কে সাহিত্যে ধরার জন্য দরকারি ছিল এক নতুন ভাষা, নতুন ভঙ্গি, নতুন দেখার চোখ। স্মরণজিৎ চক্রবর্তীই সেই লেখক, যিনি প্রথম এই সময়কে যথাযথ ভাবে বাংলা সাহিত্যে নিয়ে আসেন।

কবিতা দিয়ে লেখালিখি শুরু করলেও স্মরণজিতের মূল জায়গা কথাসাহিত্য। গল্প এবং উপন্যাস দুটোই যে তিনি চমৎকার লেখেন, এ কথা আর নতুন করে বলার দরকার নেই। নানা ধরনের লেখায় তিনি সফল। প্রেম কিংবা সম্পর্কের কাহিনিতে তো বটেই, পাশাপাশি গোয়েন্দা, ভূত, থ্রিলার, কিশোর সাহিত্য— সবেতেই তিনি স্বচ্ছন্দ। এই সাফল্যকে নিছক বাণিজ্যিক বললে ভুল হবে। নিঃসন্দেহে স্মরণজিৎ বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ভাষা তৈরি করেছেন। গড়ে তুলেছেন নতুন ঘরানা।

স্মরণজিতের লেখায় এক নতুন নাগরিক প্রজন্মকে দেখা গেল। যে প্রজন্ম এক দিকে যেমন ভালবাসাকে পাথেয় করে জীবন কাটাতে ভালবাসে, তেমনই আবার কেউ তার অনুভূতি মাড়িয়ে গেলে প্রত্যাঘাত করতেও ছাড়ে না। এই বিশেষ সময়ে শহর এবং মফস্‌সলের বুকে বড় হয়ে ওঠা প্রজন্মকে বাঙালি পাঠক প্রথম চিনলেন স্মরণজিতের কাহিনি থেকে। সেই প্রজন্মের ভাষায় লেখা স্মরণজিতের গল্পের বিষয়, চরিত্র, মায় কাহিনির নাম পড়লেই বোঝা যায় বাকিদের তুলনায় স্মরণজিতের স্বাতন্ত্র্যকে— ‘মিকি মাউসের গল্প’, ‘র‌্যাগিংয়ের দিনগুলিতে প্রেম’, ‘রবিনহুডের বন্ধু-বান্ধব’, ‘সোনম কপূরের স্বয়ম্ভর’। উপন্যাসের নাম, ‘পাতা ঝরার মরসুমে’, ‘ক্রিসক্রস’, ‘পালটা হাওয়া’, ‘কম্পাস’।

স্মরণজিতের বেশির ভাগ গল্প-উপন্যাসই আন্ডারডগ স্টোরি। এক জন হেরে যাওয়া, ভেঙেচুরে যাওয়া, জীবনের সব ব্যাপারে পিছিয়ে পড়া মানুষকে নিয়েই স্মরণজিতের কাহিনি এগোতে থাকে। আর তরতরে নাগরিক গদ্যে বুনে যাওয়া সেই কাহিনি আপাত সহজ গতিতে এগোতে এগোতে শুধু যে সেই চরিত্রদের জীবন কিংবা দ্বন্দ্ব-টানাপড়েন ফুটিয়ে তোলে তা-ই নয়। বরং তার পাশাপাশি এই সময়ের ছবিও আঁকতে আঁকতে যায়। উপন্যাস কিংবা গল্পের মূল কাহিনির পাশাপাশি এই ছবিগুলো অন্য মাত্রা দেয় লেখাগুলোকে। ‘পালটা হাওয়া’, ‘আলোর গন্ধ’র মতো উপন্যাস কিংবা ‘আমাদের পাড়ার স্পাইডারম্যান’, ‘কৃশানু’র মতো গল্প পড়লে সেটা বোঝা যায়।

বিষয়টি বুঝতে স্মরণজিতের সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘দোয়েল-সাঁকো’র শুরুর অংশটি দেখলেই হবে। ‘প্লেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম আমি। নীচের শহরটা আস্তে আস্তে ছোট হয়ে যাচ্ছে। প্রদীপ দিয়ে সাজানো ঝুলনের মতো লাগছে শহরটাকে। আমি আমার অবসন্ন শরীরটা সিটে টান করে দিলাম। হাত বাড়িয়ে মাথার উপরের আলোটাকে নিভিয়ে দিলাম এ বার। সামনে লম্বা আর অনিশ্চিত সফর। জানি না শেষ পর্যন্ত কী হবে? আমি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। তারপর ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ হয়ে এল আমার আর দেখলাম, আজ বরফ পড়ছে চারিদিকে। সারা শহরের উপর ভ্যানিলা আইসক্রিমের মতো বরফ জমে আছে।’

একেবারে সমায়ানুগ গদ্যের পাশাপাশি স্মরণজিতের ব্যবহার করা উপমা দুটোই একেবারে অভিনব। বিশেষত শহরের উপর ভ্যানিলা আইসক্রিমের মতো বরফ— উপমাটি তো অনবদ্য।   

এই প্রসঙ্গে আরও দু-একটি বিষয় মনে রাখতে হবে। গল্প এবং উপন্যাস দুটোই কাহিনি বর্ণনার ফর্ম হলেও দুটো ফর্ম কিন্তু পরস্পরের চেয়ে একেবারে আলাদা। অনেক সাহিত্যিকই গল্প ভাল লিখতে পারলেও উপন্যাসের ফর্ম পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারেন না। উলটো ঘটনাও প্রচুর দেখা যায়। স্মরণজিৎ শুধু যে দুটো ফর্মে নিজের মুনশিয়ানার প্রমাণ রেখেছেন তা-ই নয়, সেই সঙ্গে ওই দুই ফর্ম নিয়ে অনেক পরীক্ষানিরীক্ষাও করেছেন।

বাংলা থ্রিলার সাহিত্যে তিনি একটি নতুন চরিত্রের সংযোজন করেছেন: অদম্য সেন। বাংলায় ভাল থ্রিলারের সংখ্যা হাতে গোনা। গোয়েন্দা কাহিনিই বেশি। আর গোয়েন্দা কাহিনি কিংবা থ্রিলারের নায়ক এত দিন ধরে যা লেখা হয়েছে তার চেয়ে স্মরণজিতের অদম্য সব দিক থেকেই আলাদা। আবার ছোটদের জন্য লেখা গল্প বা ‘অতল জলের বন্ধু’র মতো উপন্যাসে অন্য মেজাজে ধরা দেন স্মরণজিৎ।

লেখক হিসেবে স্মরণজিতের বয়স তো তেমন বেশি নয়। আগামী দিনে তাঁর কাছ থেকে আরও ভাল লেখার প্রত্যাশা তো করাই যায়। আশা করা যায়, তিনি নাগরিক জীবনের বাইরে বেরিয়ে অন্য জীবনের কথাও লিখবেন। সেই লেখাও হবে সমান উপভোগ্য।

তাই এ সময়কার বাংলা সাহিত্যে স্মরণজিৎ চক্রবর্তী অবশ্যই এক জন গুরুত্বপূর্ণ লেখক। এই সময়ের স্পন্দন উপলব্ধি করতে হলে তাঁর লেখা পড়তেই হবে।