একজন মধ্যবিত্ত বাঙালি ঘরের বউ যিনি কারও মা-ও বটে, তিনি কিন্তু নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে একেবারেই সচেতন নন। তাঁর মনে সর্ব ক্ষণ চলতে থাকে, খুদেটা খেল তো? আমার বরের টিফিনে সব কিছু ঠিকঠাক ভরলাম তো? শ্বশুর-শাশুড়ির জলখাবারটা ঠিক সময়ে দিতে পারব তো? এ সবের মাঝে তাঁদের মধ্যে কিন্তু নিজের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট গাফিলতি থেকে যায়। তাঁরা হয়তো ভুলে যান, নিজে সুস্থ না থাকলে কিন্তু ভাল মা, ভাল স্ত্রী কিংবা ভাল বউমা— কোনওটাই আর হওয়া হবে না।
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এমন অনেক বদল আসে মহিলাদের শরীরে। হাড়ের ঘনত্ব কমে, ভিটামিনের অভাব দেখা দেয়, ইনসুলিন রেজ়িস্ট্যান্স তৈরি হয়, হরমোনের ভারসাম্যও নষ্ট হতে শুরু করে। তারই প্রভাব পড়ে শরীরে। রক্তচাপ বৃদ্ধি পেলে, ক্রমাগত মানসিক চাপে থাকলে ঝুঁকি তৈরি হয় হার্টের অসুখের। বিশেষত কম ঘুম, মানসিক চাপ, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন অসুখের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এর পাশাপাশি মেনোপজ় বা রজোনিবৃত্তির সময়ও এগিয়ে আসে ৪০-এর পর থেকে। সাধারণত ৪০-এর পর পেরি মেনোপজ় আর ৪৫-৫৫ বছরের মধ্যে মেনোপজ়ের পর্ব চলে মহিলাদের জীবনে। পুষ্টিবিদ অনন্যা ভৌমিকের মতে, ‘‘মেনোপজ়ের সময়ে কিন্তু মহিলাদের শরীরে ব্যাপক রকম বদল আসে। এই নিয়ে কিন্তু সচেতনতা আরও কম। মহিলাদের শরীরটা এত বছর যেমনটা ছিল, সে রকম আর থাকবে না, এই সত্যিটা অনেকেই মেনে নিতে পারেন না। তাঁদের মনের মধ্যে চলতে থাকে নানা রকম টানাপড়েন। এই সময় শরীরে হরমোনের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়। এই সময় ডায়েটের বিষয়ে সতর্ক না হলে কিন্তু অস্টিয়োপোরোসিস, কার্ডিয়ো ভাসকুলার ডিজ়িজ়, ওবেসিটি, মেটাবলিক সিন্ড্রোমের মতো সমস্যা শুরু হতে খুব বেশি সময় লাগে না। তাই শরীরের বদলের সঙ্গে ডায়েটেও বদল আনা জরুরি।’’
বয়স ৪৫ পেরিয়ে গেলে কী ভাবে সাজাবেন রোজের ডায়েট, কী কী কথা মাথায় রেখে চলবেন, বলে দিলেন অনন্যা।
১) হাড়ের প্রতি যত্ন: রজোনিবৃত্তির সময় সবচেয়ে চিন্তার বিষয়টি হল হাড়ের ক্ষয়। এই সময় অস্টিয়োপোরোসিস এবং ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়, তাই হাড়ের দিকে এই সময় বাড়তি যত্ন নিতে হবে। মেনোপজ়ের পর মহিলাদের শরীরে প্রতি দিন ১২০০ মিলিগ্রাম ক্যালশিয়ামের প্রয়োজন। ক্যালশিয়ামের ঘাটতি পূরণ করতে দুধ, দই, পনির, চিজ়, তিল, রাগি, কাঠবাদাম আর সবুজ শাকসব্জি বেশি করে রাখতে হবে রোজের ডায়েটে।
মেনোপজ়ের পর ওবেসিটির সমস্যায় ভোগেন অনেক মহিলাই। ছবি: সংগৃহীত।
২) ভিটামিন ডি-কে অবহেলা নয়: শরীরে ক্যালশিয়ামের শোষণ তখনই ভাল হবে, যদি ভিটামিন ডি পর্যাপ্ত মাত্রায় থাকে। মেনোপজ়ের পর মহিলাদের শরীরে ৮০০-১০০০ আইইউ (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিট) ভিটামিন ডি-এর প্রয়োজন হয়। রোদ থেকে, তেলযুক্ত মাছ থেকে ডিমের কুসুম আর দুগ্ধজাত খাবার ডায়েটে রাখলে সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব।
৩) প্রোটিন ছাড়া চলবে না: মেনোপজ় সারকোপেনিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ ক্ষেত্রে পেশির ভর এবং পেশির শক্তি কমে যায়। শরীরে ইস্ট্রোজেনের ক্ষরণ কমে যাওয়ায় পেশিতে প্রোটিন সংশ্লেষ হ্রাস পায়। এই সময় মহিলাদের শরীরে প্রতি কেজি ওজন পিছু ১ থেকে ১.২ গ্রাম প্রোটিনের প্রয়োজন হয়। এই চাহিদা পূরণ করার জন্য রোজের ডায়েটে মাছ, ডিম, দুগ্ধজাত খাবার, ডালজাতীয় খাবার, সয়াজাত খাবার, বাদাম আর বিভিন্ন রকম বীজ রাখতে হবে।
৪) ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড বাদ নয়: শরীরে ফ্যাট জমা আর বিপাক হার কমে যাওয়ার কারণে মেনোপজ়ের পর হৃদ্রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এই সমস্যার হাত থেকে রেহাই পেতে ডায়েটে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে, আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ কমাতে হবে। এর পাশাপাশি ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ বৃদ্ধির দিকেও নজর রাখতে হবে। ডায়েটে তিসির বীজ, চিয়া বীজ, আখরোট রাখা যেতে পারে।।
৫) ফাইবার কম খেলে চলবে না: মেনোপজ়ের পর ইনসুলিন রেজিট্যান্স বেড়ে যায় আর ওবেসিটির ঝুঁকি তৈরি হয়। এই সময় রোজের ডায়েটে যেন ২৫-৩০ গ্রাম ফাইবার থাকে তা নিশ্চিত করা জরুরি। এই জন্য বেশি করে দানাশস্য, ফল, শাকসব্জি, ডাল, ওট্স, বিভিন্ন রকম বীজ খেতে হবে। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতেও ফাইবার একান্ত জরুরি।
বয়স ৪৫ পেরিয়ে গেলে কী ভাবে সাজাবেন রোজের ডায়েট? ছবি: সংগৃহীত।
৬) ফাইটোইস্ট্রোজেনকে ভুললে হবে না: ফাইটোইস্ট্রোজেন হল এক প্রকার উদ্ভিজ যৌগ, যা খানিকটা ইস্ট্রোজেনের মতো কাজ করে। এই যৌগ রজোনিবৃত্তির কারণে তৈরি হওয়া হট ফ্ল্যাশের সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে। যখন রজোনিবৃত্তি পর্ব শুরু হয়, তখন ডিম্বাণু নির্গমনের প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। সেই সময়ে ইস্ট্রোজেন ও প্রজোস্টেরন হরমোনের মাত্রাও কমে যায়, শরীরে হরমোনের ভারসাম্য বিগড়ে যায়। সেই সঙ্গে শরীরে তাপমাত্রারও হেরফের ঘটে। শরীর গরম হয়ে যায়, নাক-কান-গলার কাছে ঘাম হতে থাকে। মনে হয়, শরীরের উপর দিয়ে তাপপ্রবাহ চলছে। একেই বলা হয় হট ফ্ল্যাশ। সয়াবিন, টোফু, সয়া মিল্ক, তিসির বীজ, ডাল, কাবলি ছোলা থেকে ফাইটোইস্ট্রোজন পাওয়া যায়, যা হট ফ্ল্যাশের সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে।
৭) ম্যাগনেশিয়ামকে গুরুত্ব দিতে হবে: ঘুমের চক্র ঠিক রাখতে আর স্নায়ুজনিত সমস্যা দূর করতে ম্যাগনেশিয়ামের ভূমিকা রয়েছে। মেনোপজ়ের পর অনিদ্রা, উদ্বেগ, পেশিতে টানের মতো সমস্যা খুবই স্বাভাবিক। ডায়েটে পর্যাপ্ত মাত্রায় ম্যাগনেশিয়াম থাকলে এই সমস্যার মোকাবিলা করা যায়। এর জন্য ডায়েটে পর্যাপ্ত মাত্রায় কুমড়োর বীজ, কাঠবাদাম, পালংশাক, দানাশস্য, ডার্ক চকোলেট রাখা যেতে পারে।
৮) জল খেতে হবে বেশি করে: শরীরে হরমোনের ভারসাম্য বিঘ্নিত হলে ঝিমুনি ভাব আসে, ত্বকের জেল্লা কমে যায়, হজমেও সমস্যা দেখা যায়। এর থেকে মুক্তি পেতে দিনে অন্তত দুই থেকে আড়াই লিটার জল খেতেই হবে।
৯) কিছু খাবারে না বলতে হবে: মেনোপজ়ের পরে হট ফ্ল্যাশ, অনিদ্রার সমস্যা থেকে রেহাই পেতে অত্যধিক ক্যাফিন যুক্ত খাবার, মশলাদার খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। এর পাশাপাশি ধূমপান আর মদ্যপানেও লাগাম টানতে হবে।