E-Paper

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চিকিৎসা

দুর্ঘটনার পরের এক ঘণ্টাকে চিকিৎসকেরা বলেন ‘গোল্ডেন আওয়ার’। এই সময়ে ঠিক পদক্ষেপ করলে প্রাণরক্ষা ও জটিলতা কমানোর সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে

সুনীতা কোলে

শেষ আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫০

প্রায় রোজই সংবাদপত্রের পাতায় থাকে নানা দুর্ঘটনার সংবাদ— রাস্তা, রেললাইন, নির্মাণস্থল, বা ঘরের ভিতরেই হঠাৎ ঘটে যাওয়া বিপদের কথা। এই সব ঘটনার পরে প্রথম কয়েক ঘণ্টায় ঠিক কেমন চিকিৎসা ও যত্ন দেওয়া হচ্ছে, তার উপরেই অনেক সময়ে নির্ভর করে জীবন-মৃত্যুর ফারাক। এই সমগ্র প্রক্রিয়াটির নামই ট্রমা কেয়ার।

ট্রমা কেয়ার কী?

‘ট্রমা’ বলতে বোঝায় হঠাৎ পাওয়া গুরুতর আঘাত— যা শরীরের এক বা একাধিক অঙ্গের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত করে। পথ দুর্ঘটনা, উঁচু থেকে পড়ে যাওয়া, গুলিবিদ্ধ হওয়া, তীব্র মারধরের জেরে আঘাত বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের জেরে আঘাত পাওয়া— সব ক্ষেত্রেই ট্রমা কেয়ারের প্রয়োজন পড়তে পারে। ট্রমা কেয়ার হল সেই সংগঠিত চিকিৎসা ব্যবস্থা, যেখানে ঘটনাস্থল থেকে শুরু করে হাসপাতালের ট্রমা কেয়ার বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ— সব কিছু মিলিয়ে দ্রুত, ঠিক ও ধারাবাহিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।

এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার পরের এক ঘণ্টাকে চিকিৎসকেরা বলেন ‘গোল্ডেন আওয়ার’, অর্থাৎ আঘাত লাগার পরে প্রথম এক ঘণ্টা। এই সময়ে ঠিক পদক্ষেপ করলে প্রাণরক্ষা ও জটিলতা কমানোর সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।

ট্রমা কেয়ারের পদ্ধতি

এসএসকেএমের ট্রমা কেয়ার সেন্টারের শল্য চিকিৎসক সিরাজ আহমেদ জানাচ্ছেন, সমস্ত সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, নার্সিংহোমে এই ধরনের আঘাতের চিকিৎসার এসওপি বা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিয়োর নির্দিষ্ট করা থাকে। আঘাত নিয়ে কোনও রোগী সেখানে পৌঁছলে চিকিৎসক-নার্সদের প্রাথমিক কাজ হল রোগীর কোথায়, কেমন আঘাত লেগেছে তা খুঁজে বার করা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষার পরে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

ট্রমা সেন্টারগুলি বিভক্ত থাকে গ্রিন, ইয়েলো ও রেড জ়োনে। প্রথমে রোগীকে আনা হয় গ্রিন জ়োনে। সেখানে থাকেন অর্থোপেডিক, নিউরোলজি ও জেনারেল সার্জারির আরএমও চিকিৎসকেরা। প্রাথমিক অ্যাসেসমেন্টের পরে মস্তিষ্ক বা স্নায়ুতন্ত্রে আঘাতের জন্য নিউরোলজি, হাড়ের আঘাতের জন্য অর্থোপেডিক এবং পেট বা বুকে আঘাতের জন্য জেনারেল সার্জারি— এর মধ্যে কোনটার প্রয়োজন আছে, তা নির্দিষ্ট করা হয়। গ্রিন জ়োনে দেখা হয় রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক চলছে কি না, কোথাও থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে কি না। প্রয়োজনে অক্সিজেন দেওয়া, ভেন্টিলেশন টিউব দেওয়া, রক্তক্ষরণ বন্ধের ব্যবস্থা ও স্যালাইন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এ ছাড়াও খুব দ্রুত এক্স-রে, এমআরআই, সিটি স্ক্যান, ইকোকার্ডিয়োগ্রাফির মতো পরীক্ষা করা হয়।

গ্রিন জ়োনেই দেখা হয় রোগীর জিসিএস (গ্লাসগো কোমা স্কেল) অবস্থান কেমন। জিসিএস ৭-এর কম হলে রোগীকে পাঠানো হয় রেড জ়োনে। তার বেশি এবং স্থিতিশীল হলে ইয়েলো জ়োনে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যালোচনার পরে রোগীকে সাধারণ ওয়ার্ডেও পাঠানো হতে পারে। তবে কোনও গুরুতর আহত রোগীকে যদি সঙ্কটজনক (গ্যাসপিং) অবস্থায় ট্রমা সেন্টারে আনা হয়, সে ক্ষেত্রে তাঁকে সরাসরি রেড জ়োনে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা শুরু হয়। এসওপি অনুযায়ী, এমন ক্ষেত্রে কোনও শয্যা ফাঁকা না থাকলে ট্রলি যুক্ত করে সেখানেই তৎক্ষণাৎ চিকিৎসা শুরু করার কথা।

সিরাজ আহমেদ বলছেন, “ট্রমা কেয়ারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তিনটি জিনিস, এ, বি এবং সি। এ অর্থাৎ এয়ারওয়ে, রোগীর শ্বাস নেওয়ার পথে বাধা রয়েছে কি না। বি অর্থাৎ ব্রিদিং, রোগী নিজে স্বাভাবিক শ্বাস নিতে পারছেন কি না। সি অর্থাৎ সার্কুলেশন, রোগীর দেহে রক্তসঞ্চালন ঠিক আছে কি না দেখা। রক্তক্ষরণ বন্ধ করা এবং রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখা প্রথম কাজ। এ ছাড়া, চিকিৎসকদের নজর থাকে পলিট্রমা, অর্থাৎ একাধিক অঙ্গে আঘাতের দিকে। খুব দ্রুত পরীক্ষানিরীক্ষা সেরে নিয়ে একসঙ্গে একাধিক বিষয়ের চিকিৎসা শুরু হয় তখন।”

উদ্ধারকারীরা কী করবেন?

দুর্ঘটনার সাক্ষী হলে আতঙ্কিত না হয়ে কিছু মৌলিক নিয়ম মানতে পারেন।

  • নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন: আগুন, বিদ্যুৎ বা যানবাহনের ঝুঁকি থাকলে আগে তা এড়ান।
  • সাহায্য: দ্রুত অ্যাম্বুল্যান্স ও জরুরি পরিষেবায় ফোন করুন।
  • রক্তক্ষরণ হলে: পরিষ্কার কাপড় বা ব্যান্ডেজ দিয়ে ক্ষতস্থানে চাপ দিন।
  • শ্বাস-প্রশ্বাস: শ্বাসকষ্ট হলে গলার আশপাশে আঁটোসাঁটো পোশাক ঢিলে করে দেওয়া যেতে পারে।
  • অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া নয়: মেরুদণ্ড, হাড় বা মাথায় আঘাতের আশঙ্কা থাকলে রোগীকে টানাহেঁচড়া না করে স্থির রাখুন।
  • খাবার দেবেন না: অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে, তাই কিছু খেতে দেবেন না।

ভারতের মতো দেশে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেশি, কিন্তু সব জায়গায় সমান সুযোগ-সুবিধা নেই। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, সংগঠিত ট্রমা নেটওয়ার্ক থাকলে প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী, আধুনিক অ্যাম্বুল্যান্স ও নির্দিষ্ট ট্রমা সেন্টারে প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।

ট্রমা কেয়ার মানে শুধু হাসপাতালের চিকিৎসা নয়, এটি সামাজিক দায়িত্বও। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে চিকিৎসক, প্রশাসন— সবাই এই শৃঙ্খলের অংশ।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Trauma Care

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy