এক জন মানুষও আটকে থাকা পর্যন্ত বিশ্রাম নেই সেনাবাহিনীর। জানিয়ে দিলেন সেনাপ্রধান দলবীর সিংহ। জম্মু-কাশ্মীরের বন্যায় মৃতের সংখ্যা ২০০ ছুঁয়েছে। ঘরছাড়া লক্ষাধিক। আজ তেমন ভারী বৃষ্টি না হলেও, ডাল লেকে বাড়ছে জলস্তর। এ দিন সকালে খুলেছে জম্মু-পাঠানকোট সড়ক। চার দিন আটকে থাকার পর বৈষ্ণোদেবী যাত্রা শুরু করেছিলেন প্রায় ১৮ হাজার পুণ্যার্থী। কিন্তু বেলায় ফের থামতে হয় তাঁদের। জম্মুর অবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক হলেও খুব একটা বদলায়নি কাশ্মীর উপত্যকার বন্যাবিধ্বস্ত ছবিটা।
সরকারি টেলিফোনের যোগাযোগ আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আজ থেকে বন্ধ সব বেসরকারি টেলি যোগাযোগও। ঝিলম নদীর জলরাশির তোড়ে কার্যত একটি বিশাল হ্রদে পরিণত হয়েছে শ্রীনগর। জলের তলায় লাল চক, রেগাল চক ইত্যাদি এলাকাও। কার্যত সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন জলমগ্ন উপত্যকা।
নিরন্তর চলছে উদ্ধারকাজ। এখনও পর্যন্ত ২৩ হাজার জনকে উদ্ধার করে সুরক্ষিত জায়গায় সরানো হয়েছে বলে টুইট করা হয়েছে সেনার তরফে। ১৬টি ত্রাণশিবির তৈরি করা হয়েছে। চিকিৎসকদের ৬৫টি দল রয়েছে সেখানে। আগামী ৪৮ ঘণ্টা উদ্ধারকাজে শ্রীনগরের উপরেই জোর দিচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা
রবিবার থেকেই কাজে নেমেছেন কয়েক হাজার সেনাকর্মী। জলমগ্ন অঞ্চলগুলিতে নৌকায় বা চপারে করে পৌঁছনোর চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন এলাকায় আটকে পড়েছেন বহু উদ্ধারকর্মীও। আজই বাদামিবাগ এলাকা থেকে প্রায় দেড় হাজার সেনাকর্মীকে উদ্ধার করা হয়েছে। বায়ুসেনার লেফটেন্যান্ট কেএস লাম্বা বলেছেন, “আমাদের অভিজ্ঞ বিমানচালকেরা আছেন। কিছু আপৎকালীন ত্রাণসামগ্রীও আছে। আরও ওষুধ, কম্বল, পানীয় জল প্রয়োজন আমাদের।” আজ উদ্ধার-দলে যোগ দিয়েছে নৌসেনাও। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, উদ্ধারকাজে আরও গতি আনতে ১৫০টি নৌকা মিলেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে। জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনীর প্রধান ও পি সিংহ আজ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় ভীষণ অসুবিধার মধ্যে কাজ করছি আমরা।”
গত কালই আকাশ পথে ঘুরে বন্যা পরিস্থিতি দেখে জম্মু কাশ্মীরের বন্যাকে ‘জাতীয় বিপর্যয়’ বলে ব্যাখ্যা দিয়ে হাজার কোটি টাকার বিশেষ ত্রাণ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আজ মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিংহ চৌহান রাজ্য সরকারের তরফে পাঁচ কোটি টাকা সাহায্যের কথা ঘোষণা করেছেন।
বিজেপি সরকারের পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন কংগ্রেস নেতারাও। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক দিগ্বিজয় সিংহ এ দিন টুইট করেছেন, “সেনাবাহিনী, পুলিশ, নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীর মিলিত উদ্যোগে যে গতিতে জম্মু ও কাশ্মীরে উদ্ধারকাজ চলছে, তা প্রশংসনীয়। প্রশংসনীয় প্রধানমন্ত্রীর তৎপর পদক্ষেপও।” কংগ্রেস নেতা গুলাম নবি আজাদ বলেন, “নিজের চোখে পরিস্থিতি দেখে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী। তৎক্ষণাৎ হাজার কোটি টাকার ত্রাণও ঘোষণা করেছেন। ওঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত ভাবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে আমি খুশি।”
চলছে উদ্ধারকাজ। নিজে উদ্ধার হওয়ার পর পরিবারের
বাকিদেরও নিরাপদ আশ্রয়ে আনতে সেনাকে অনুরোধ। শ্রীনগরে।
ত্রাণ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলিতেও। ফেসবুকে, টুইটারে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বন্যার খবর, ছবি, নতুন তথ্য। ছড়িয়ে পড়ছে ত্রাণের আবেদনও। সেই সঙ্গেই চলছে পরিজনদের খোঁজ। অনেকে আটকে পড়েছেন উপত্যকায়। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের উপায় না থাকায় সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটেই ভরসা করছেন অঙ্কুর রায়না, প্রীতি দাসরা। অঙ্কুরের টুইট, “আমার বাবা-মা ইন্দিরা নগরের আধাসামরিক শিবিরের কাছে একটি বাড়িতে আটকে পড়েছেন...।” ফেসবুকে প্রীতি পোস্ট করেছেন, “আমার বাবা শ্রীনগরের করনপুরায় আছেন। কী ভাবে যোগাযোগ করব বুঝতে পারছি না...” জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ফেরার কোনও বিমানের বুকিং বদল করা হলে কোনও অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হবে না বলে আজ ঘোষণা করেছে ডিজিসিএ। জল ঢুকে গেলেও, এখনও বিমান ওঠানামা বন্ধ করার অবস্থা হয়নি জম্মু ও শ্রীনগর বিমানবন্দরে।
বন্যা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনায় আসছে জম্মু ও কাশ্মীরের আগামী বিধানসভা নির্বাচন। চলতি বছরের শেষের দিকেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা উপত্যকায়। কেন্দ্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন যা সিদ্ধান্ত নেবে, তা-ই চূড়ান্ত হবে। আজ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ বলেন, “প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মসূচিকে জড়ালে চলবে না। এখনই চূড়ান্ত কিছু বলা সম্ভব নয়।”
প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানেও মৃতের সংখ্যা ৩৫০ ছুঁয়েছে। নষ্ট হয়ে গিয়েছে প্রায় ৩০ হাজার একর শস্য। পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ আজও বন্যা কবলিত এলাকাগুলি ঘুরে দেখেন। গত কালই সব রকম সাহায্যের আশ্বাস দিয়ে নওয়াজ শরিফকে চিঠি লেখেন নরেন্দ্র মোদী। তিনি জানান, দু’দেশের অবস্থা একই রকম শোচনীয়। তাই নিয়ন্ত্রণরেখার দু’পারেই সমান সাহায্য থাকবে তাঁর তরফে।
আজ সেই চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার করে মোদীকে ধন্যবাদ জানান নওয়াজ। পাকিস্তানেও মোদী যে সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন, তাতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। একই চিঠিতে নিয়ন্ত্রণরেখার এ পারে বন্যাবিধ্বস্ত কাশ্মীরিদের প্রতি সমবেদনা জানান পাক প্রধানমন্ত্রী। বন্যা প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ সামাল দেওয়ার উপায় খুঁজতে মোদীকে যৌথ আলোচনার প্রস্তাবও দেন তিনি। ভারত ও পাকিস্তান দু’দেশের পাশেই দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জও।
ছবি: পিটিআই
কাশ্মীরে খোঁজ মিলছে না বাঙালি পর্যটক, শ্রমিকদের
কাশ্মীরে খোঁজ মিলছে না হলদিয়া থেকে যাওয়া পর্যটকদের। ২৮ অগস্ট হলদিয়ার সুতাহাটা থেকে ৭০ জনের একটি দল কাশ্মীর ঘুরতে গিয়েছিল। ৩ সেপ্টেম্বর থেকে তাঁদের খোঁজ মিলছে না বলে জানিয়েছেন পরিজনেরা। তাঁরা জানান, শেষ বার ওই পর্যটকদের সঙ্গে ফোনে যখন কথা হয়েছিল তখন তাঁরা জানিয়েছিলেন বাসে শ্রীনগর ফেরার পথে প্রবল বৃষ্টিতে আটকে পড়েছেন। জেলা পুলিশ সুপার সুকেশ জৈন বলেন, “আমাদের কাছে নিখোঁজের খবর এসেছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছি।” পরিজনেরা যোগাযোগ করতে পারছেন না মালদহের চাঁচলের ২২ জন শ্রমিকের সঙ্গেও। গত মাসে ঈদের কয়েকদিন পরেই চাঁচলের উত্তর খেলেনপুর, সাহেবগঞ্জ, কুমারগঞ্জ, খেমপুর, খানপুর এলাকা থেকে জম্মু ও কাশ্মীরে গিয়েছিলেন শ্রমিকেরা। তাঁরা মূলত আপেল বাগানের কাজ ও নদী থেকে বালি তোলার কাজ করতেন। তাঁদের পরিজনেরা জানিয়েছেন, কয়েকদিন আগেও সেখানে প্রবল বৃষ্টি চলছে বলে ফোনে জানিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু গত বৃহস্পতিবারের পর তাঁদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। আজ, মঙ্গলবার সকালে তাঁদের নামের তালিকা নিয়ে জেলা প্রশাসনের দ্বারস্থ হবেন বলে জানিয়েছেন পরিজনেরা।