Advertisement
০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

মসজিদ পথে কাঁটা!

২০০২-এর কথা। বাজপেয়ী সরকার ক্ষমতায়। ২০০৪-এর লোকসভা ভোটের দু’বছর আগে থেকেই, রামমন্দির নিয়ে মাঠে নেমে পড়েছিলেন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের তৎকালীন নেতা অশোক সিঙ্ঘল ও রাম জন্মভূমি ন্যাসের প্রধান রামচন্দ্র দাস পরমহংস।

প্রেমাংশু চৌধুরী
নয়াদিল্লি শেষ আপডেট: ৩০ জানুয়ারি ২০১৯ ০২:৩২
Share: Save:

২০০২-এর কথা। বাজপেয়ী সরকার ক্ষমতায়। ২০০৪-এর লোকসভা ভোটের দু’বছর আগে থেকেই, রামমন্দির নিয়ে মাঠে নেমে পড়েছিলেন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের তৎকালীন নেতা অশোক সিঙ্ঘল ও রাম জন্মভূমি ন্যাসের প্রধান রামচন্দ্র দাস পরমহংস। পরিকল্পনা ছিল, বাবরি মসজিদ-রাম জন্মভূমির বিতর্কিত জমির লাগোয়া এলাকায় শিলা পুজো হবে।

Advertisement

বিশ্ব হিন্দু পরিষদের এই শিলা পুজো রুখতেই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন দিল্লির মহম্মদ আসলাম ওরফে ভুরে। দরিয়াগঞ্জের ছোট মাপের ব্যবসায়ী আসলাম মামলা লড়তে নিজের বাড়ির কিছুটা অংশ বেচে দিয়েছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট তাঁর আর্জি শুনেই রায় দেয়, বাবরি মসজিদ-রাম জন্মভূমি বিতর্কিত জমিকে ঘিরে সরকারের হাতে থাকা ৬৭.৭০৩ একর এলাকায় কোনও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান চলবে না।

২০১৯-এর লোকসভা ভোটের আগে মোদী সরকার সেই আসলাম মামলার রায়ে সংশোধন চাইল। সরকারের হাতে থাকা জমি আসল মালিকদের ফিরিয়ে দেওয়ার দরখাস্ত নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে হাজির হল।

• ফৈজাবাদের সিভিল জজের আদালতে ১৯৫০ সালে জমা দেওয়া অযোধ্যার বিতর্কিত এলাকার মানচিত্র। এই মামলায় তখনকার অযোধ্যার ওই এলাকার বিশদ বিবরণ থাকলেও, মসজিদের বা রামলালার ‘গর্ভগৃহ’-এর উল্লেখ নেই। পরিক্রমা পথের পূর্ব দিকে, সীতা রসুই-এর দক্ষিণে ও চবুতরার উত্তরের পরিসরটিতেই ছিল বাবরি মসজিদের কাঠামো। তবে তার তিনটি প্রবেশদ্বার দেখানো আছে।

Advertisement

আইনজীবীরা বলছেন, মোদী সরকারের তরফে আজ সুপ্রিম কোর্টে যে আর্জি জানানো হয়েছে, শীর্ষ আদালত তা মেনে নিলে বাবরি মসজিদ-রাম জন্মভূমি বিতর্কিত জমির আশেপাশের সিংহভাগ জমিই রাম জন্মভূমি ন্যাসের হাতে চলে যাবে। এমনিতেই যে জমিতে বাবরি মসজিদ ছিল, সেখানে তাঁবুর মধ্যে এখন রামলালার পুজো চলছে। অযোধ্যার সাধুদের সেখানেই রামমন্দিরের গর্ভগৃহ তৈরির পরিকল্পনা।

আশেপাশের এলাকা এখন লোহার জাল দিয়ে ঘেরা। রয়েছে আধাসেনা ও পুলিশের নিরাপত্তায়। তা ফিরে পেলে রাম জন্মভূমি ন্যাস পূজাপাঠ, মন্দির তৈরির কাজ শুরু করতে পারবে। এর পরে বাবরি মসজিদের জমির অধিকার মুসলিমরা ফিরে পেলেও চারপাশে হিন্দু মন্দিরের মধ্যে নতুন করে মসজিদ তৈরি সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মুসলিমদের তরফে অন্যতম মামলাকারী হাজি মেহবুব বলেন, ‘‘এতে দেশে আগুন জ্বলবে।’’

জমি-কাহিনি

• অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ছিল ০.৩১৩ একর জমিতে। ১৯৪৯-এর ২২ ডিসেম্বর মধ্যরাতে মসজিদের প্রধান গম্বুজের নীচে রামলালার মূর্তি বসানো হয়। হিন্দুদের দাবি, ওখানেই রামের জন্ম হয়েছিল।
• ১৯৯১-এ কল্যাণ সিংহ সরকার রাম চবুতরা, সীতা রসোই-সহ বিতর্কিত এলাকা ঘিরে মোট ২.৭৭ একর জমি অধিগ্রহণ করে। লক্ষ্য, পুণ্যার্থীদের সুবিধা দান ও পর্যটনের উন্নয়ন।

• ১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংস হয়।

• ১৯৯৩-এ উত্তরপ্রদেশে রাষ্ট্রপতি শাসনের মধ্যেই কেন্দ্রের নরসিংহ রাও সরকার ওই ২.৭৭ একর জমিকে ঘিরে মোট ৬৭.৭০৩ একর জমি অধিগ্রহণ করে। আশেপাশের এলাকা মূলত হিন্দুদের দখলে ছিল। রাম জন্মভূমি ন্যাসের কাছে ছিল ৪২ একর। আরও ছোট ছোট মন্দির ছিল। প্রথমে অধ্যাদেশ জারি হয়। পরে সংসদে আইন পাশ হয়।

• ১৯৯৪-এ সেই আইনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মামলা হলে, ইসমাইল ফারুকি মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, মুসলিমরা শুধু বাবরি মসজিদের ০.৩১৩ একর জমির উপর অধিকার দাবি করছে। মুসলিমরা জিতলে যাতে সেই অধিকার কায়েম করতে পারে, সে জন্যই আশেপাশের অতিরিক্ত জমি সরকারের হাতে থাকা দরকার। পরে পরিস্থিতি বুঝে বাড়তি জমি সরকার মালিকদের ফিরিয়ে দিতে পারে।

• ২০০৩-এ বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ঘেরা জমিতে শিলা পুজোর প্রস্তুতি শুরু করলে তার বিরুদ্ধে মামলা করেন দিল্লির মহম্মদ আসলাম ওরফে ভুরে। সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, ওই ঘেরা জমিতে কোনও ধর্মীয় আচার-অুষ্ঠান করা যাবে না।

• মোদী সরকার চাইছে, বাবরি মসজিদের ০.৩১৩ একর ‘বিতর্কিত জমি’ বাদ দিয়ে বাকি জমি আসল মালিকদের ফেরত দেওয়া হোক। বিশেষত রাম জন্মভূমি ন্যাসকে ৪২ একর ফিরিয়ে দেওয়া হোক। শুধু বিতর্কিত জমিতে যাওয়া আসার জন্য রাস্তা খোলা থাক।

• মুসলিম সংগঠনগুলির আশঙ্কা, আশেপাশে মন্দির বা কাঠামো তৈরি হলে বাবরি মসজিদের জমির অধিকার পেলেও নতুন করে মসজিদ তৈরি করা সম্ভব হবে না।

আসলাম মারা গিয়েছেন ২০১০-এ। ইলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ের ঠিক পরেই। হাইকোর্ট রায় দিয়েছিল, অযোধ্যার ২.৭৭ একর জমির তিন ভাগের এক ভাগ মুসলিমরা পাবে। বাকিটা হিন্দুরা। পরিবারের বক্তব্য, সেই রায় শুনে ভেঙে পড়েছিলেন আসলাম। কারণ, ১৯৯১-এ রামমন্দির আন্দোলন শুরু হলে ওই ২.৭৭ একর জমিতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্যও কোর্টে গিয়েছিলেন আসলাম।

সরকারি সূত্রের যুক্তি, আসলামের মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, ইলাহাবাদ হাইকোর্টে জমির মালিকানার ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত অযোধ্যার ওই এলাকায় কোনও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান চলবে না। সঙ্ঘ পরিবারের ঘনিষ্ঠ এস গুরুমূর্তির যুক্তি, ‘‘আসলামের মামলার রায়ের কার্যকারিতা ২০১০-এ ইলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ের সঙ্গেই শেষ হয়ে গিয়েছে।’’ কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে অন্যতম মামলাকারী হাজি মেহবুবের প্রশ্ন, ‘‘হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়েছে। তার শুনানি এখনও শেষ হয়নি। তা হলে ফয়সালা হল কোথায়?’’

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.