স্বাধীনতার প্রায় ৭০ বছরের মাথায় নতুন করে ঠিকানা পেয়েছেন দু’পক্ষের ছিটমহলের বাসিন্দারা। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে হস্তান্তর সংক্রান্ত সমস্ত কাজ। প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষের ঠিকানা চূড়ান্ত করাটা ভারত ও বাংলাদেশ প্রশাসনের মুকুটে সাফল্যের পালক জুড়লেও, প্রদীপের তলায় অন্ধকার কিন্তু রয়েই গিয়েছে। এক সময়ে রুটি-রুজির টানে ছিটমহল থেকে বেরিয়ে এসে যাঁরা দিল্লি চলে এসেছিলেন, এত কিছুর পরেও তাঁদের অধিকাংশই কিন্তু আজও রয়ে গেলেন ঠিকানাবিহীন।
যেমন তসলিম শেখ। পেশায় রিকশাচালক। বাড়ি দিল্লির ওখলার যোগবাই এক্সটেনশনের বস্তিতে। ৩০ বছর আগে কোচবিহারের ছিটমহল ছেড়ে পেটের ধান্ধায় চলে এসেছিলেন দিল্লি। তারপর থেকে দিল্লিতেই। বিয়ে করেছেন। হয়েছে সন্তানও। কিন্তু নতুন মানচিত্রে তাঁর পৈত্রিক বাড়ি এখন পড়েছে বাংলাদেশের ভাগে। দু’পক্ষের বাসিন্দারা কোথায় যাবেন তা জানতে যখন সমীক্ষার কাজ শুরু হয়েছিল, তখন রুজি-রোজগার ছেড়ে সশরীরে গিয়ে নিজের ইচ্ছার কথা জানাতে পারেননি তিনি। শুনেছেন তাঁর জন্মভিটে এখন বাংলাদেশে। ক্রমশ বুঝতে পারছেন, ভবিষ্যতে চাইলেও আর ফিরে যেতে পারবেন না সেখানে। তসলিম তবু সমীক্ষার কথা জানতে পেরেছিলেন, অনেকে তো সেই খবরটুকুও পাননি। সব শেষ হয়ে যাওয়ার পরে শুনছেন, পৈত্রিক জমিজমা সবই এখন বাংলাদেশে।
ফলে নিজের পরিচয় ঠিক কী, কোন দেশের বাসিন্দা তাঁরা, তা নিয়ে দোটানায় ভুগছেন রিয়াজ বা মহম্মদ আসগরেরা। ভারত না বাংলাদেশ, কোন দেশের বাসিন্দা তাঁরা তা নিয়ে সংশয়ের মধ্যে তাঁরা এখন কোনও ভাবে আঁকড়ে ধরতে চাইছেন দিল্লির পরিচয়কেই। দীর্ঘ দিন দিল্লিতে থাকতে থাকতে আধার বা ভোটার কার্ড বানিয়ে নিয়েছেন অনেকেই। সেটাই আপাতত ভরসা তাঁদের। তবে তাতেও অবশ্য পুলিশের জুলুম কিছু কমেনি। দিন দু’য়েক আগেই যোগবাই বস্তিতে দিল্লি পুলিশের বাংলাদেশি সেলের আচমকা অভিযানের পরে আতঙ্ক আরও বেড়ে গিয়েছে বাঙালি অধ্যুষিত ওই মহল্লায়। নিয়াজ বললেন, ‘‘আমাদের আধার কার্ড রয়েছে। বাচ্চারা যারা এখানে জন্মেছে তাদের জন্মের শংসাপত্র রয়েছে। তা-ও পুলিশ আমাদের বাংলাদেশি বলে যখন-তখন হুজ্জুতি চালায়। স্থানীয় পরিচয়পত্র দেখানো সত্ত্বেও তাঁদের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যে কোনও পরিচয়পত্র দেখানোর জন্য চাপ দিচ্ছে পুলিশ। কোথা থেকে, কী ভাবে তা জোগাড় হবে কিছুই বুঝতে পারছি না।’’