মানসের বাঁশবাড়ি রেঞ্জে তখন কুসুম-রোদে পেখম মেলেছে ময়ূরের দল। সরু জলধারার এ পারে হাতি শিবির। ও পারে কোর এলাকায় পায়চারি করছে জোড়া গন্ডার। জলের ধারে চিতাবাঘের থাবার ভিজে ছাপ। কিন্তু আজ আলসেমির ঠাঁই নেই হাতিদের ইস্কুলে। বন শিবিরের দাওয়ায় পাতা হয়েছে সার সার বেঞ্চ। টাঙানো হয়েছে বোর্ড। ব্যতিক্রমী পাঠশালায় মাহুতরা শিখলেন হাতিদের বশীকরণ মন্ত্র!
এশিয় হাতির অন্তত এক তৃতীয়াংশই এখন পোষা। তাই, বুনো হাতি পোষ মানানোর যে পদ্ধতি, সেই একই কঠোরতা পোষা হাতির শাবকদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হলে সাজার আতিশয্য ঘটতে বাধ্য। তাই কাঁটাযুক্ত দণ্ড, জোর করে কাজ করতে বাধ্য করানোর মতো নিষ্ঠুর পদ্ধতি বাদ দিয়ে, কণ্ঠ নির্দেশ, হাতের সংকেত, লাঠির ছোঁয়া আর পুরস্কার— এই চার ধাপে হাতিদের বশ করার পদ্ধতি মানস ও কাজিরাঙার মাহুতদের শেখালেন অস্ট্রেলিয়ার হেল্প ফাউন্ডেশনের হাতি বিশষজ্ঞরা। সহায়তায় ওয়াইল্ডলাইট ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া।
মানসের বাঁশবাড়ি রেঞ্জে হওয়া এই প্রশিক্ষণ শিবিরে হাতি বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু ম্যাকলিন বোঝান, হাতি অনুভূতিসম্পন্ন, সামাজিক ও বুদ্ধিমান প্রাণী। তাই দুষ্টু বাচ্চাকে যেমন মেরে মানুষ করাটা কোনও কাজের কথা নয়, তেমনই হাতি শাবকদেরও শাস্তি দিয়ে নয়, শেখানো উচিত আদর ও উৎসাহ দিয়ে।প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধুনিক প্রাণী আচরণবিজ্ঞানকে একত্র করে শুরু হওয়া এই নতুন প্রশিক্ষণ উদ্যোগে পোষা হাতি ও বিশেষ করে তাদের শাবকদের আরও মানবিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পদ্ধতি শিখলেন ৩৬ জন মাহুত।
মাহুতের পেশা একসময় গর্বের, ঐতিহ্যের হলেও আজ বহু জায়গায় মাহুতরা আর্থিকভাবে দুর্বল, সামাজিকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। তার উপর কাজের ঝুঁকি প্রবল। গত দুই দশকে ভারতে হাতির হানায় অনেক মাহুত মারাও গিয়েছেন।
ডব্লুটিআইয়ের পশু চিকিৎসক ভাস্কর চৌধুরি বলেন, বন্য হাতি ধরা ও প্রশিক্ষণের প্রথা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এই হাতি পোষ মানানোর ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত মাহুতদের জন্য প্রশিক্ষণের কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই। তা ছাড়া হাতিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি বন্য হাতিদের জন্যেই তৈরি। কিন্তু এখনকার সব বাচ্চা হাতিই পোষা হাতিদের সন্তান। তাই তাদের ক্ষেত্রে এত কঠোরতার দরকার পড়ে না। ভয় ও শাস্তির উপরে নির্ভরশীল পদ্ধতির বদলে এখন হাতি ও মাহুতের মধ্যে বিশ্বাস ও বোঝাপড়ার সম্পর্ক গড়ে তোলা দরকার।
এই কর্মসূচির অধীনে মানস ও কাজিরাঙার বাছাই মাহুতদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘মাস্টার মাহুত’ হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। পরে তাঁরাই শেখাবেন বাকি মাহুতদের। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মাহুতদের নেতৃত্বে আছেন কাজিরাঙার কাসেম আলি ও মনোজ দোর্জি, এবং মানসের রামানুজ ও আলম আলি।
হেল্প ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মার্ক ট্রেলিং জানান, হাতি প্রশিক্ষণের জন্য বিশ্বের প্রথম মোবাইল অ্যাপও তৈরি করা হয়েছে- যেখানে অ্যানিমেশনের মাধ্যমে হাতিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার আধুনিক পদ্ধতি শেখানো হয়। এ বছরই সেই অ্যাপে যুক্ত হচ্ছে হিন্দি ও অসমিয়া ভাষা।