E-Paper

বিবেচনাধীনদের ভাগ্য ঝুলেই, কোর্টে ঠেললেন জ্ঞানেশ

নির্বাচন কমিশন সূত্রের ব্যাখ্যা, সবটাই এখন সুপ্রিম কোর্টের উপরে নির্ভর করছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সেই কারণেই এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি।

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১৬ মার্চ ২০২৬ ০৮:৪৪
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার।

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। ফাইল চিত্র।

পশ্চিমবঙ্গে ভোটের আগে যদি ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় থাকা ৬০ লক্ষ ভোটারের সকলের ভাগ্য নির্ধারণ না হয়, তা হলে তাঁদের কী হবে? পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে আজ এই মূল প্রশ্নের কোনও উত্তর দিলেন না মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। এ বিষয়ে তিনি বল ঠেলে দিলেন সুপ্রিম কোর্ট তথা বিচার বিভাগের দিকে।

রবিবার নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গ-সহ পাঁচটি বিধানসভার দিনক্ষণ ঘোষণা করেছে। এই প্রথম কোনও রাজ্যের অসম্পূর্ণ ভোটার তালিকা নিয়েই নির্বাচন কমিশন ভোট ঘোষণা করে দিল। জ্ঞানেশ কুমার অবশ্য বলেছেন, নিখুঁত ভোটার তালিকা তৈরির জন্যই এসআইআর। সাংবাদিক সম্মেলনে আনন্দবাজারের তরফে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি কি আশা করছেন যে ভোটের আগে ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় থাকা ৬০ লক্ষ ভোটারের নথি খতিয়ে দেখে তাঁদের ভোটার তালিকায় রাখা বা না রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজ শেষ হয়ে যাবে? যদি না হয়, তা হলে বাকি ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারদের কী হবে? জ্ঞানেশ কুমার সরাসরি এর উত্তর না দিয়ে বলেছেন, ‘‘বিচারকরা প্রতিটি নাম একটি একটি করে খতিয়ে দেখছেন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, যে সব নামে তাঁরা অনুমোদন দেবেন, সে সব অতিরিক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় যোগ হবে।’’

নির্বাচন কমিশন সূত্রের ব্যাখ্যা, সবটাই এখন সুপ্রিম কোর্টের উপরে নির্ভর করছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সেই কারণেই এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি। সুপ্রিম কোর্টই তথ্যগত অসঙ্গতির তালিকায় থাকা ভোটারদের দাবি খতিয়ে দেখে পশ্চিমবঙ্গের জেলা স্তরের বিচারক নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছে। প্রতিবেশী রাজ্য থেকে বিচারক নিয়োগ করতে বলেছে। গোটা বিষয় দেখভালের দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে দিয়েছে। অতিরিক্ত তালিকা বা সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট কখন বের হবে, সেই সুপারিশও হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি করবেন। ফলে নির্বাচন কমিশনের কার্যত কোনও দায় নেই। ভোটের আগে যদি দেখা যায় তখনও বহু ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারের ভাগ্য নির্ধারণ বাকি, সে ক্ষেত্রে কী হবে— সেই সিদ্ধান্তও সু্প্রিমকোর্ট নেবে।

এসআইআর মামলার সঙ্গে যুক্ত আইনজীবীরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, গত ১০ মার্চ সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত মন্তব্য করেছিলেন, ভোটের আগে যদি কোনও ভোটারের যোগ্যতা নিয়ে সংশয় কেটে যায়, তা হলে তিনি ভোট দিতে পারবেন। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেছিলেন, ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা হয়নি। ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা হলে, তখনও পর্যন্ত কতখানি কাজ এগিয়েছে, আদালত সেই পরিস্থিতি খতিয়ে দেখবে।আগামী ২৪ মার্চ সুপ্রিম কোর্টে ফের শুনানি রয়েছে।

নির্বাচন কমিশন আজ পশ্চিমবঙ্গে ২৩ এপ্রিল ও ২৯ এপ্রিল, দু’দফায় ভোটের যে নির্ঘণ্ট ঘোষণা করেছে, তাতে ৬.৪৪ কোটি ভোটার ধরেই নির্বাচন ঘোষিত হয়েছে। এসআইআর-এর আগে রাজ্যের মোট ভোটার ছিল প্রায় ৭.৬৬ কোটি। খসড়া তালিকা থেকে প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম বাদ পড়ায় ভোটার সংখ্যা ৭.০৮ কোটিতে পৌঁছয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে ৬.৪৪ কোটির মতো ভোটারের নাম ছিল। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এখনও পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ভোটার সংখ্যা ৬.৪৪ কোটি জানিয়ে বলেছেন, অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশিত হলে তা এই চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় যোগ হবে। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের সময় তথ্যগত অসঙ্গতি বা লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি-র তালিকায় প্রায়৬০ লক্ষ ভোটারের নাম ‘বিবেচনাধীন’ ছিল।

সাধারণ নিয়মে মনোনয়ন জমার শেষ দিন পর্যন্ত ভোটার তালিকায় নতুন নাম যোগ হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে ২৩ এপ্রিল প্রথম দফায় ১৫২টি বিধানসভা কেন্দ্রের ভোট হবে। তার মনোনয়ন জমার শেষ দিন ৬ এপ্রিল। তার পরে ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় ১৪২টি কেন্দ্রে ভোটের মনোনয়ন জমার শেষ দিন ৯ এপ্রিল। কমিশন সূত্রের খবর, ৬০ লক্ষ ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারের মধ্যে এখনও পর্যন্ত প্রায় ১৫ লক্ষ নামের নিষ্পত্তি হয়েছে। আরও প্রায় ৪৫ লক্ষ বাকি। এসআইআর মামলার আইনজীবীদের মতে, ২৪ মার্চের শুনানিতে কলকাতা হাই কোর্ট বা নির্বাচন কমিশনের তরফে সুপ্রিম কোর্টকে জানাতে হবে, কত ভোটারের ভাগ্য নির্ধারণ বাকি এবং কত দিনের মধ্যে কাজ শেষ হতে পারে। সেই অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যাঁরা বাদ পড়বেন, তাঁদের ভোটের আগে আপিল ট্রাইবুনালে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে কি না, সে প্রশ্নও রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টকেই বলতে হবে, ভোটগ্রহণের আগে কত দিন পর্যন্ত অতিরিক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় নাম যোগ করা যাবে।

আর একটি বিকল্প হল, কিছু দিনের জন্য ভোট পিছিয়ে দেওয়া। নির্বাচন কমিশনের আজকের নির্ঘণ্ট অনুযায়ী ৪ মে ফল ঘোষণা হবে। বিধানসভার মেয়াদ ৭ মে শেষ হচ্ছে। ফলে ভোট পিছিয়ে দিলে কিছু দিনের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে ‘কেয়ারটেকার সরকার’ হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে বলতে পারে সুপ্রিম কোর্ট। তবে সে ক্ষেত্রে রাজ্যপালের ক্ষমতা বেড়ে যাবে। আইনজীবীদের মতে, একবার নির্বাচন কমিশন ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা করে দেওয়ার পরে সেই সম্ভাবনাখুবই কম। ফলে সব কিছুই এখন ২৪ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট কী বলছে, তার উপরে নির্ভর করছে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Election Commission of India Gyanesh Kumar Supreme Court of India

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy