৪ মার্চ থেকে ৯ এপ্রিল। রাজ্য জুড়ে প্রায় ২৭০টি সভা, ১৬০ কিলোমিটার পদযাত্রার পরে ভোট প্রচারের শেষ দিনে নিজের কেন্দ্র জালুকবাড়িতে প্রথমবার মাত্র ছ’মিনিটের ভাষণ। তার মধ্যেও দু’মিনিট কেটে গেল কান্নায়। গত ১৫ বছর ধরে জালুকবাড়ির বিধায়ক থাকা হিমন্তবিশ্ব শর্মা দলনেতা অমিত শাহের পাশে দাঁড়িয়ে কান্নাভেজা গলায় বলেন, ‘‘জালুকবাড়িতে আমি ভোট চাইতে পারব না। শুধু আপনারা আগের মতো আমায় ভালবাসা দিন।’’
তা ভালবাসা তিনি বরাবরই এখানে পেয়ে এসেছেন। ভোটের লড়াইয়ে নামার আগেই পাণ্ডু-মালিগাঁওয়ের বাঙালি এলাকার প্রতি ঘরে গৃহকর্তার নামে পুজো বা বিহুর সময় ছোট উপহার আসত। প্রেরক নেহাতই ছাত্রনেতা হিমন্তবিশ্ব শর্মা। সেই দূরদর্শী পদক্ষেপের জোরেই বাঙালি-বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম শরিক হয়েও আজ পর্যন্ত জালুকবাড়ির মানুষের কাছে তাঁর কোনও বিকল্প নেই। এমনকী জালুকবাড়ি কেন্দ্রের ভোটারদের একটা বড় অংশই জানেন না, হিমন্তের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের প্রার্থী কে। অন্য দলের প্রার্থীদের কথা তো বাদই দেওয়া যায়।
এক সময় সাইকেলে প্রফুল্ল মহন্তর হয়ে প্রচারপত্র বিলি করত ছেলেটি। কটন কলেজের বিতর্ক প্রতিযোগিতার সেরা ছাত্রটির খেলায়ও সমান আগ্রহ ছিল। কিন্তু ছাত্র-রাজনীতির সূত্র ধরেই আলফার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা বাড়ে বলে অভিযোগ। তোলা আদায় থেকে অস্ত্র রাখার বিভিন্ন ঘটনায় পুলিশের চোখ পড়ে হিমন্তের উপরে। তারপরেই হিতেশ্বর শইকিয়ার হাত ধরে হিমন্তের কংগ্রেস রাজনীতিতে প্রবেশ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এমএ হিমন্ত আইনের পাঠ শেষ করে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত গৌহাটি হাইকোর্টে প্র্যাকটিসও করেছেন। সওয়াল করার সেই দক্ষতা অসমবাসী পরের ১৫ বছর ধরে বিধানসভা ও জনসভাগুলিতে দেখেছে।
২০০১ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত জালুকবাড়ি থেকে জিতে আসা হিমন্ত এলাকার উন্নয়ন শুধু নয়, এলাকার যুবকদের হাতে কাজ তুলে দেওয়াতেও সফল। কাছে টেনেছেন বিভিন্ন সংগঠনকে। আসুর পরিচয় ঝেড়ে এলাকার বাঙালিদের কাছেও হিমন্ত ঘরের ছেলে হয়ে গিয়েছেন। ২০০২ সাল থেকে ২০১৪ পর্যন্ত রাজ্যের বিভিন্ন দফতরের মন্ত্রিত্ব সামলানো হিমন্তের বিরুদ্ধে দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। লুই বার্জার ও সারদা কেলেঙ্কারিতে তাঁর নাম জড়ালেও কোনও অভিযোগ প্রমাণ হয়নি। আলফা একাধিকবার দাবি করেছে, হিমন্ত তাদের হয়ে টাকা আদায় করত। উজানি অসমে বিরোধী ছাত্রনেতাদের হত্যার ঘটনাতেও নাকি হিমন্ত ও সর্বানন্দ জড়িত বলে আলফা দাবি করেছে। কিন্তু তাতেও হিমন্তের জনপ্রিয়তায় এতটুকু চিড় ধরেনি। মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈয়ের সঙ্গে দু’বছরের টানা বিরোধের পর কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন হিমন্ত। তাঁকে অনুসরণ করে জালুকবাড়ির প্রায় ৯০ শতাংশ কংগ্রেসিও বিজেপিতে যোগ দেন।
রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে গুয়াহাটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ভোলবদল, যোরহাট, বরপেটা, তেজপুরে মেডিক্যাল কলেজ গড়া ও আরও পাঁচটি মেডিক্যাল কলেজের কাজ শুরু করা এবং শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে টেট পরীক্ষার ব্যবস্থা করে ৫০ হাজার শিক্ষককে নিযুক্তি দেওয়া হিমন্তেরই কৃতিত্ব।
এই নির্বাচনে হিমন্তই বিজেপির সবচেয়ে ব্যস্ত তারকা প্রচারক। তাই তিনি নিজের কেন্দ্রে একদিনও সময় দেননি। তাঁর প্রচারের দায়িত্ব নেন স্ত্রী রিণিকি ভুঁইঞা শর্মা। আজ শেষ দিনের প্রচারে জালুকবাড়িতে ভাষণ দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে হিমন্ত বলেন, ‘‘আমি যখন শূন্য ছিলাম, তখন আপনারাই আমায় পরিচয় ও সম্মান দিয়েছেন। আমি যেখানেই মারা যাই না কেন আমার সৎকার যেন এখানেই করা হয়।’’ হিমন্তের এই কথায় ভিড়ও চোখ মুছেছে।