বাড়িতে থাকেন বৃদ্ধ দম্পতি। তাঁদের বাড়িতে কাজকর্ম এবং দেখাশোনা করেন এক যুবতী। সেই বাড়িতে আচমকা ইডির তল্লাশি! হুড়মুড়িয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়েন তিন জন, নিজেদের ইডি আধিকারিক বলে পরিচয় দেন। তার পরে শুরু হয় তল্লাশি। শেষ পর্যন্ত ওই দম্পতির বাড়ি থেকে লাখ লাখ নগদ এবং সোনার গয়না নিয়ে গাড়ি করে পালিয়ে যান। তবে আদতে তাঁরা কেউই ইডি আধিকারিক নন! ভুয়ো পরিচয়পত্র এবং পিস্তল দেখিয়ে লুটপাট চালানো হয় ওই বৃদ্ধ দম্পতির বাড়িতে। তল্লাশিতে নেমে পুলিশ জানতে পারে, এই গোটা ঘটনার ‘মাস্টারমাইন্ড’ ওই বাড়ির পরিচারিকাই!
দক্ষিণ-পূর্ব দিল্লির নিউ ফ্রেন্ডস কলোনির এই বাড়িতে সস্ত্রীক থাকতেন ৮৬ বছর বয়সি অবসরপ্রাপ্ত স্থপতি। সেই বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করতেন রেখা নামে এক মহিলা। পুলিশ সূত্রে খবর, গত ১১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টার দিকে তিন জন ওই বাড়িতে বলপূর্বক ঢুকে পড়েন। তাঁদের মধ্যে একজনের পরনে পুলিশ পোশাকও ছিল। বাড়িতে তখন ওই দম্পতি ছাড়াও ছিলেন রেখাও। তিন জনকে ও ভাবে ঢুকতে দেখে দম্পতির মতো তিনিও ভয় পেয়েছেন, এমন অভিনয় শুরু করেন।
বাড়িতে ঢুকে তিন জন নিজেদের ইডি আধিকারিক বলে পরিচয় দেন। জানান, তল্লাশি করা হবে। নিজেদের পরিচয়পত্রও দেখান। তবে তখন কেউ বুঝতে পারেননি, সেই সব পরিচয়পত্র ভুয়ো। তবে তল্লাশির জন্য কোনও ওয়ারেন্ট দেখানো হয়নি। কেড়ে নেওয়া হয় মোবাইল ফোনও। অভিযোগ, কারও সঙ্গে যোগাযোগে চেষ্টা করলেই গ্রেফতার করা হবে, সেই ভয়ও দেখানো হয়।
ওই তিন জন বৃদ্ধ দম্পতিকে জানান, তাঁরা যেন বাড়িতে থাকা সব মূল্যবান জিনিস এবং টাকাকড়ি এক জায়গায় জমা করেন। তল্লাশি যাতে আসল মনে হয় সেই জন্য টাকা, গয়না খাবার টেবিলে সাজিয়ে ছবিও তোলেন। জানা যায়, এই তল্লাশি অভিযানের ফাঁকে কোনও রকমে বৃদ্ধা তাঁর নাতনির সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। নাতনি পেশায় ইডির আইনজীবী। তাঁকে সংক্ষেপে বিষয়টি জানাতে, তিনি ওই ‘ভুয়ো’ আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তখনই সন্দেহ হয় তাঁর। তবে তত ক্ষণে তিন জন টাকা এবং সোনার গয়না নিয়ে গাড়িতে চেপে চম্পট দেন।
আরও পড়ুন:
স্থানীয় থানার এসএইচও-র নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনার তদন্ত শুরু করে। ডিএসপি (দক্ষিণ-পূর্ব) হেমন্ত তিওয়ারি জানান, তদন্তকারীরা সাড়ে ৩০০টির বেশি সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখেছেন। সেই সব ফুটেজ একত্রিত করে ঘটনাস্থল থেকে সন্দেহভাজনদের গতিবিধির একটি রূপরেখা তৈরি করে পুলিশ।
ওই সন্দেহভাজনেরা যে গাড়িতে করে পালিয়েছিলেন, সেই গাড়ির গতিবিধিও পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে খতিয়ে দেখা হয়। দেখা যায়, গাড়িটি গাজ়িপুর সীমান্ত পেরিয়ে উত্তরপ্রদেশে প্রবেশ করে। তার পরে গাড়িটি গিয়ে গাজ়িয়াবাদের বৈশালি সেক্টর-৪-এ গিয়ে থামে। গাড়ির অবস্থান এবং সন্দেহভাজনদের মোবাইল টাওয়ারের লোকেশন বিশ্লেষণ করেন তদন্তকারীরা। সেই সূত্র ধরে গাজ়িয়াবাদে পূজা নামে এক মহিলার বাড়িতে পৌঁছোন তাঁরা।
তদন্তে রেখার সঙ্গে পূজার যোগ খুঁজে পান তদন্তকারীরা। পূজার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশের একটি পোশাক, ওয়াকিটকি, গয়না, লাইসেন্সের মেয়াদউত্তীর্ণ একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের সময় জানা যায়, এই পুরো লুটপাটের ঘটনার পরিকল্পনা ছকেছিলেন রেখাই। কী ভাবে দিল্লির ওই দম্পতির বাড়িতে চুরি করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেন পূজার সঙ্গে। সেই পরিকল্পনায় পূজার স্বামীকেও জড়ানো হয়। তিনি আইটিবিপিতে কর্মরত ছিলেন। এ ছাড়াও, উপদেশ সিংহ থাপা নামে এক প্রাক্তন সেনাও জুড়ে যান এই ষড়যন্ত্রে। মণীশ নামে একজনকে নিয়োগ করা হয়।
রেখা উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলার বাসিন্দা। গত দু’বছর ধরে দিল্লির ওই দম্পতির বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করেন। তিনিই ওই দম্পতির দৈনন্দিন কাজকর্ম, তাঁরা কখন কী করেন— তার বিস্তারিত তথ্য উপদেশ, মণীশদের দিয়েছিলেন। তার পরই সুযোগ বুঝে ইডির আধিকারিক সেজে ওই দম্পতির বাড়িতে লুটপাট চালানো হয়। অভিযুক্তদের গ্রেফতার করেছে পুলিশ।