আন্তর্জাতিক সমুদ্র-আইন মেনে নয়, হরমুজ় প্রণালীকে ব্যবহার করা হচ্ছে যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলির একে অন্যের কাছে সুবিধা আদায় করার অস্ত্র হিসেবে। এমনটাই মনে করছে কূটনৈতিক শিবির। দৌত্যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বা ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে এ কথাই বোঝানোর চেষ্টা করছে ভারত। বলা হচ্ছে, হরমুজ় প্রণালীকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে প্রয়োগ না করতে। সে ক্ষেত্রে কোনও পক্ষই নেওয়া সম্ভব হবে না ভারতের।
ভারত তার ব্যবহৃত এলপিজি-র প্রায় ৬০ শতাংশ অন্য রাষ্ট্র থেকে আমদানি করে। আবার এই আমদানির প্রায় ৯০ শতাংশ হরমুজ় প্রণালীর মধ্য দিয়ে আসে। ফলে এই প্রণালী ব্যবহারে শর্ত ও জটিলতা এসে গেলে তা শুধু সমুদ্রেই আটকে থাকবে না— পণ্য পরিবহণের খরচ, পরিকাঠামোর খরচ, গৃহস্থালিতে জ্বালানির খরচে দ্রুত বড় রকমের প্রভাব ফেলবে। উদ্বেগ বাড়বে দেশের নাগরিকের। ইসলামাবাদে ইরান-আমেরিকা কথাবার্তা ব্যর্থ হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তেহরান এবং ওয়াশিংটন উভয়েই হরমুজ়কে কাজে লাগাচ্ছে নিজেদের দর-কষাকষিরঅস্ত্র হিসেবে।
উভয়ের উদ্দেশ্য যদিও ভিন্ন বলেই মনে করছে ভারত। ইরান তাদের ভৌগোলিক অবস্থানকে যুদ্ধের কাজে লাগাতে চাইছে। আমেরিকার উদ্দেশ্য, ইরানকে সমুদ্রপথে একঘরে করে প্রয়োজনীয় ছাড় আদায় করা, সেই সঙ্গে বাজার যাতে মুখ থুবড়ে না পড়ে, সে দিকেও খেয়াল রাখা। এক পক্ষ উপকূলের নৈকট্যের সুযোগ নিতে চাইছে, অন্য পক্ষ তাদের নৌবহরের বিস্তৃত পাল্লার সুযোগ নিতে চাইছে। তবে উদ্দেশ্য হলেও দু’টি দেশই এই অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ প্রণালীকে রাজনীতির অস্ত্র করছে।
নয়াদিল্লির বক্তব্য, এখানেই আন্তর্জাতিক আইনের শাসন প্রয়োজন। আমেরিকা কখনওই ইউএনক্লস-এ (ইউনাইটেড নেশনস কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য সি) যোগ দেয়নি। ইরান প্রাথমিক ভাবে সই করলেও তাতে আনুষ্ঠানিক সিলমোহর দেয়নি। তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপুঞ্জের ওই সনদে রয়েছে ১৭২টি দেশ। বিদেশ মন্ত্রকের মতে, ভারতের কাছে হরমুজ় কেবলমাত্র স্থানীয় নিরাপত্তা করিডর নয়। এটি একটি আন্তর্জাতিক প্রণালী, যেখানে কোনও শক্তিশালী রাষ্ট্রের খবরদারি চলে না। আর তাই আমেরিকা বা ইরান, কারও ভাষ্যই ভারতের কাছে গ্রহণীয় নয়।
হরমুজ় প্রণালী দিয়ে বড় মাপের তেল আমদানি করে ভারত। ফলে সেখানকার প্রণালী যাতে আইনের পথে চলে এবং উন্মুক্ত, পক্ষপাতহীন থাকে তা নিয়ে যথেষ্ট মাথাব্যথা রয়েছে সরকারের। সংঘাত এবং উত্তেজনার দোহাই দিয়ে আন্তর্জাতিক এই জলপথে পাহারাদারি সংক্রান্ত ইরানের ভাষ্য মেনে নিতে পারছে না নয়াদিল্লি। অন্য দিকে, আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে নৌ-শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিশেষ বিশেষ জাহাজকে আটকে দেওয়ার আমেরিকার নীতিকেও সমর্থন করছে না। এ কথা স্পষ্ট ভাবে দু’টি দেশের কাছেই পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে বিদেশ মন্ত্রক।
পাশাপাশি, এই ইউএনক্লস-এর অন্তর্ভুক্ত শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলির সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করার কথা ভাবা হচ্ছে। বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রের আমদানি-নির্ভর দেশগুলিকে এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এই প্রয়াসের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ় প্রণালীকে উন্মুক্ত এবং অবাধ রাখা, বিশেষ কিছু শক্তির যাতে সেটি কুক্ষিগত না হয়, তার চেষ্টা করা। প্রসঙ্গত, এই ধরনের সমন্বয় বা সহযোগিতার দিশা ওই সনদের ৪৩ নম্বর ধারাতে দেওয়া রয়েছে। নিরাপত্তার বিষয়টি অগ্রাহ্য করা নয়, কিন্তু নিরাপত্তাকে অজুহাত করে তাতে বৈষম্য যাতে তৈরি করা না হয়, সেটা নিশ্চিত করাই এখন অগ্রাধিকার।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)