প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যখন ইজ়রায়েলের পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে যে কোনও পরিস্থিতিতে সে দেশের পাশে থাকার বার্তা দিচ্ছেন, তত ক্ষণে আমেরিকার সাহায্য নিয়ে ইরানের উপর হামলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ফেলেছে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকার। কূটনৈতিক শিবিরের বক্তব্য, নয়াদিল্লিকে অন্ধকারে রেখে মোদীর সফরকে ঘিরে যে উৎসবের চিত্রনাট্য তৈরি করেছিল তেল আভিভ, ভূরাজনীতির দিক থেকে তাতে ভারতের লাভের থেকে চাপই বেশি হল শেষ পর্যন্ত।
পরিস্থিতি এখন এমন যে, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় শাসক আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত হওয়ার পর রীতিমতো কিংকতর্ব্যবিমূঢ় দেখাচ্ছে ভারতকে। আগামী দশ দিনের মধ্যে তেলের সঙ্কট নেই, এই আশার কথা শোনানো হচ্ছে বটে। কিন্তু সেটা দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তি দিতে পারছে। নিশ্চিত করেই বলা যায়, আগামী দিনে কূটনীতির সরু রজ্জুর উপর দিয়ে হাঁটতে হবে মোদী সরকারকে। যার এক দিকে থাকবে ইজ়রায়েল-আমেরিকা, অন্য দিকে ইরান এবং আরব বিশ্ব।
‘বিশ্বগুরু’র ভাবমূর্তি কাজে লাগিয়ে ঘরোয়া রাজনীতিতে বহু ক্ষেত্রেই ভোটের ফসল তুলতে দেখা গিয়েছে নরেন্দ্র মোদীকে। কিন্তু সাম্প্রতিক অতীতে, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় ইনিংসে সেই ভাবমূর্তিতে বারবার দাগ লাগছে বলে মনে করা হচ্ছে। তার মাত্রা এতটাই যে, বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের জাতীয়তাবাদী বয়ানও বিশেষ কাজে আসছে না। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস গত কাল থেকেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে ময়দানে। দলের প্রধান মুখপাত্র জয়রাম রমেশ একটি দীর্ঘ বিবৃতি পোস্ট করেছেন সমাজমাধ্যমে। সেখানে আমেরিকার সঙ্গে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা, ভারত-পাকিস্তানের সংঘর্ষে মধ্যস্থতা করার দাবি, ভারতের উপর শুল্ক চাপানোর হুমকির সামনে মোদীর মূক হয়ে থাকাকে তুলে ধরেছেন তিনি। ইজ়রায়েল প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, ‘‘প্রধানমন্ত্রী মোদী ফেব্রুয়ারির ২৫-২৬ ইজ়রায়েল গেলেন। সেটা এমন একটা সময়, যখন গোটা বিশ্ব জানে আমেরিকা-ইজ়রায়েল সামরিক হামলা চালাতে চলেছে ইরানের উপরে। সেখানে সরকারের বদল অনিবার্য। মোদী ইজ়রায়েল ছাড়ার দু'দিনের মধ্যেই আক্রমণ শুরু হল। সে দেশের পার্লামেন্টে তাঁর বক্তৃতা নৈতিক ভাবে কাপুরুষতার এক লজ্জাজনক উদাহরণ হয়ে রইল। ইরানের উপর হামলার যে প্রতিক্রিয়া মোদী সরকারের কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে, তা ভারতের মূল্যবোধ, নীতি ও স্বার্থের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।"
ইরানে আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের হামলার ঘটনার পর কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরাও। এক্স হ্যান্ডলে তিনি বলেছেন, ‘‘বিশ্বের তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশের নেতাদের দ্বারা সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতৃত্বকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা ও অসংখ্য নিরপরাধের প্রাণ যাওয়া অত্যন্ত নিন্দনীয় ও ঘৃণ্য। এই ঘটনার জন্য যে কারণই প্রচার করা হোক না কেন, তা তীব্র নিন্দনীয়।’’ তিনি বলেছেন, ‘‘আশা করি, ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী ও আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে নতজানু হওয়ার পরে আমাদের প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট দেশগুলিতে থাকা ভারতীয়দের নিরাপদে দেশে ফেরাতে সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন।’’ পাশাপাশি সুর চড়িয়েছে অন্য বিরোধী দলগুলিও। আপ নেতা সঞ্জয় সিংহের কথায়, ‘‘মোদীজির আজ হলটা কী! আপনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মারা যাওয়ায় জাতীয় শোক ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু সে দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় শাসকের হত্যার পর শোক জানাচ্ছেন না! আমেরিকার এর পিছনে রয়েছে বলে? এমন কাপুরুষ প্রধানমন্ত্রীর প্রয়োজন নেই যিনি ট্রাম্পের পুতুল।’’
রাজনৈতিক মঞ্চে বিরোধীরা হাওয়া গরম তো করবেনই। কিন্তু ভূকৌশলগত ক্ষেত্রেও ভারতের সমস্যা এ বার বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দীর্ঘ টানাপড়েনের পর ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতির চিহ্ন দেখা যেতে শুরু করেছিল সবে। উভয়ের আঞ্চলিক স্বার্থই তার সঙ্গে যুক্ত। তেল এবং গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রে পশ্চিম এশিয়া ভারতের নির্ভরযোগ্য উৎস। বিপুল সংখ্যক ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই অঞ্চলে রয়েছেন, যাঁদের ভাল থাকা সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি মুদ্রা রোজগারেরও অন্যতম ক্ষেত্র। সুতরাং ইজ়রায়েলের সঙ্গে ভারতের বিশেষ কৌশলগত সম্পর্ক যেমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই জিসিসি (গাল্ফ কোঅপারেশন কাউন্সিল)-ভুক্ত ছ’টি রাষ্ট্রের মধ্যে পাঁচটি রাষ্ট্রের সঙ্গেই ভারতের কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। শুধু শক্তি কেনাবেচা নয়— প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা, বিনিয়োগ, সংযোগ, প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও সেই সম্পর্ক এখন গভীর। পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতির কারণে ভারত পশ্চিম এশিয়া ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডরের কাজ পিছিয়ে গিয়েছে। এই অঞ্চলে পুরোদস্তুর যুদ্ধ শুরু হলে তা একেবারেই অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। পাকিস্তানকে এড়িয়ে পশ্চিম এশিয়ায় বাণিজ্য করতে হলে ইরানের সঙ্গে চাবাহার বন্দরের কারণে কার্যকরী সম্পর্ক রেখে চলা প্রয়োজন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)