Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৮ মে ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

কেজরীবালের ধর্নায় কি বদলাবে দিল্লির ভাগ্য

দিল্লির আপ সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রের একটানা দ্বন্দ্ব আমাদের কিছু মৌলিক সাংবিধানিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একটি নির্বাচিত সরকারের

উজ্জ্বল কুমার চৌধুরী
১৬ জুন ২০১৮ ১৮:৪২
Save
Something isn't right! Please refresh.
অরবিন্দ কেজরীবাল।

অরবিন্দ কেজরীবাল।

Popup Close

সরকারি আমলাদের 'অন্যায্য' ধর্মঘটে সহায়তা দেওয়া এবং বিল আটকে রাখার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীবাল এবং তার তিন সহকর্মীর উপ-রাজ্যপাল অনিল বৈজলের বাসভবনে ধর্না কর্মসূচি শুধুমাত্র প্রতীকী নয়। এর প্রভাব আরও সুদূরপ্রসারী হতে পারে।

বিষয়টা একটু বিশদে বোঝার চেষ্টা করা যাক। গত তিন মাস ধরে দিল্লি সরকারের অনেকগুলো জনহিতকর প্রকল্প আমলাদের অসহযোগিতার জন্য আটকে রয়েছে। দিল্লি সরকারের স্কুলগুলোতে প্রায় পাঁচশোটি ‘মহল্লা ক্লিনিক’ খোলা, ব্যয়বহুল চিকিৎসা সংক্রান্ত পরীক্ষাগুলোকে সাধারণ মানুষের উপযোগী করার জন্য সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো এবং বাড়ি-বাড়ি রেশন পৌঁছে দেওয়া-সহ বেশকিছু পরিষেবা দেওয়ার প্রক্রিয়া সরকার ভালোভাবেই শুরু করছিলো। দুঃখের বিষয় আমলাতন্ত্রের জেদে আজ এই প্রকল্পগুলো বিশ বাঁও জলে। আমরা কিন্তু শুধু সেই সিদ্ধান্তগুলোর কথা বলছি যেগুলো অনেক আলাপ-আলোচনা পরে উপরাজ্যপাল মঞ্জুর করেছিলেন। এছাড়াও প্রায় চোদ্দটি অন্য প্রকল্প এখনও উপ-রাজ্যপালের অনুমোদনের অপেক্ষায়। এদেশে আমলাদের ধর্মঘট অবৈধ। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কার্যত সেই পরিস্থিতিরই সম্মুখীন হয়েছে দিল্লি সরকার। অরবিন্দ কেজরীবাল এবং আপ নেতৃত্ব কিন্তু পুরো বিষয়টিকে একটা জন আন্দোলনের রূপ দেয়ার চেষ্টা করছে। এখন যে আন্দোলন সামাজিক মাধ্যমে সীমাবদ্ধ, তা যদি অদূর ভবিষ্যতে একটি সত্যিকারের আন্দোলনের রূপ নেয়, আমরা কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ আশা করতে পারি।

দিল্লির আপ সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রের একটানা দ্বন্দ্ব আমাদের কিছু মৌলিক সাংবিধানিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একটি নির্বাচিত সরকারের কি প্রকল্প তৈরী করার এবং সেই প্রকল্পগুলোকে বাস্তবায়িত করার অধিকার নেই? আমলারা কি শুধুমাত্র কোনও নির্বাচিত সরকারকে হেয় প্রমাণ করার জন্য নিজেদের দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারেন? এর চেয়েও বড়ো প্রশ্ন, দেশে নির্বাচনের মতো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কী প্রয়োজন, যদি একটি নির্বাচিত সরকারকে অনির্বাচিত, মনোনীত পদাধিকারীর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়?

Advertisement

আরও পড়ুন: বিদায় বুখারি, বৃষ্টিভেজা গ্রামের পথে মানুষের ঢল

চলুন দিল্লির প্রশাসনিক প্রক্রিয়াটি একটু বোঝার চেষ্টা করি। দিল্লি রাজ্যটি একটি নির্বাচিত সরকারের শাসনাধীন। কিন্তু দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি মনোনীত উপরাজ্যপালের অধীন, সাউথ দিল্লি মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (এসডিএমসি) কেন্দ্রের শাসনাধীন, দিল্লির সমস্ত জমি কেন্দ্রীয় নগরোন্নয়ন মন্ত্রকের, দিল্লি পুলিশ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন, দিল্লি ক্যান্টনমেন্ট কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীন এবং নাগরিক উন্নয়ন পৌরশাসনাধীন। এইরকম একাধিক শাসন ব্যবস্থা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির বাড়তি সুযোগ তৈরি করে। আশা করা যেতে পারে যে ভারতবর্ষের সর্বোচ্চ আদালত দিল্লির নির্বাচিত সরকার এবং উপরাজ্যপালের দায়িত্ব এবং কর্তব্য খুব শীঘ্রই বিভাজন করে দেবে। এই বিষয়ে আপ সরকারের আবেদন এখনও আদালতের বিচারাধীন। এর দ্রুত ফয়সালা খুব জরুরি। একটি নির্বাচিত সরকারের কাজ করার সুযোগ সংকুচিত হলে গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যেই ভাঙন ধরে।



গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই বার আপের এই ধর্নাকে অনেকগুলো আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল নৈতিক সমর্থন দিচ্ছে।

যদি গত কয়েকদিনের ঘটনাবলীকে যদি একটু বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে আমরা বুঝব, আপ সরকারের জন্য এই ধর্না একটা সুবর্ণ সুযোগ। আপ চাইলেই বর্তমান কেন্দ্র-রাজ্য দ্বন্দ্বটিকে একটি পরিপূর্ণ রাজনৈতিক এবং সাংবিধানিক আন্দোলনের রূপ দিতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই বার আপের এই ধর্নাকে অনেকগুলো আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল নৈতিক সমর্থন দিচ্ছে। এসপি, আরজেডি, জেডিইউ, জেডিএস, আএলডি, এনসিপি, টিএমসি, টিডিপি, টিআরএস, ডিএমকে, সিপিআই এবং সিপিএম সরাসরি সমর্থন দিচ্ছে এই অভূতপূর্ব রাজনৈতিক প্রতিবাদকে। কংগ্রেস যদিও পরিষ্কারভাবে কেন্দ্রের সমর্থনে। প্রাক্তন বিজেপি অর্থমন্ত্রী যশবন্ত সিনহা আপের এই প্রতিবাদে শরিক হয়েছেন। অন্য অসন্তুষ্ট বিজেপি নেতারাও এই প্রতিবাদে যে কোনও সময় শরিক হতে পারেন। এদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন শত্রুঘ্ন সিনহা।

একদা কোনও এক জানুয়ারির শীতের রাতে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীবাল রেলভবনের বাইরে ধর্নায় বসেছিলেন। সেই ২০১৪ সালে কেজরীবাল পুলিশের অসহযোগিতার বিরুদ্ধে আন্দোলনে শুরু করেছিলেন। তখন কেন্দ্রে ইউপিএ সরকার। প্রতিবাদের কারণ ছিল, দিল্লি পুলিশের কিছু কর্মকর্তার কার্যকলাপ। যারা নাবালিকা ধর্ষণ, মাদক-পাচার এবং দেহব্যবসার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতে অস্বীকার করেছিলেন। সে সময়, কয়েকটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল এই প্রতিবাদকে অরাজকতা বলে অভিহিত করেছিল।

আপ সরকার পরে পদত্যাগ করে যখন কেন্দ্র জনলোকপাল বিলকে অনুমতি প্রদান করতে অস্বীকার করে। পরে আপ ৬৭-৩ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতা ফিরে পায়। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করে কেজরীবাল এবং তাঁর সহকর্মীরা ফের আর একটি ধর্নায় সামিল হয়েছেন। উপরাজ্যপালের বিরুদ্ধে লড়াই কার্যত এনডিএ সরকারে বিরুদ্ধে লড়াই। যদিও এবার কংগ্রেস ছাড়া পুরো বিরোধী পক্ষ আপকে সমর্থন করছে। তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কেজরীবাল সমর্থিত ফেডারেল ফ্রন্ট এবারে হালে পানি পেয়েছে। আপ একটি সত্যিকারের অকংগ্রেস এবং অসংঘি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেকে স্থাপন করতে পেরেছে।

আরও পড়ুন: খুশির ইদেও পাকিস্তানের গুলি, ওয়াঘায় বন্ধ মিষ্টি বিনিময়

যদিও কংগ্রেস বৃহত্তর অর্থে বিজেপির বিরুদ্ধে, তবুও দলটি আপকে রাজনৈতিক ‘অচ্ছুৎ’ বলে মনে করে। কারণগুলি খুব স্পষ্ট। আপ দিল্লিতে কংগ্রেসকে জোর ধাক্কা দিয়েছিল। পঞ্জাবে কংগ্রেসের প্রধান বিরোধী আপ। এছাড়াও আপ সেই সমস্ত রাজ্যে নিজের অবস্থান শক্ত করছে, যেখানে লড়াইটা প্রধানত কংগ্রেস এবং বিজেপির মধ্যে। তাই সীমিত পরিসরে দেখতে গেলে, আপ কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু কংগ্রেস যদি ২০১৯-এ বিজেপিকে সরাতে চায়, তাহলে দলটিতে নতুন করে ভাবতে হবে। কংগ্রেসের আপ-বিরোধিতা আঞ্চলিক দলগুলোকে অস্বচ্ছন্দ করে তুলতে পারে। এই রাজনৈতিক নাটকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে কংগ্রেসেরই। কংগ্রেস দিল্লির পরিপূর্ণ রাজ্য হওয়ার ন্যায্য দাবি থেকে সরে এসেছে। যদিও একদিন শীলা দীক্ষিত এই দাবির সবচাইতে বড়ো সমর্থক ছিলেন। বিজেপিও এই বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল একসময়।

পঞ্জাবে হারের পর আপ একটি বিকল্প শাসন মডেল তৈরির চেষ্টা করেছিল। বিজেপি মডেল থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এই মডেল স্বাস্থ্য এবং শিক্ষাভিত্তিক। কিন্তু যেভাবে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার দিল্লি সরকারের কাজ প্রতিনিয়ত পণ্ড করে চলেছে তাতে প্রমাণ হয়, রাজ্য সরকারকে খারিজ করাটা বাহুল্য মাত্র। আর দিল্লির মতো আধা রাজ্যে এই কাজটি আরও সহজ।

গোয়া, মেঘালয় এবং মিজোরামে পিছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় আসার পরে এবং কর্ণাটক বিপর্যয়ের পরে বিজেপি আঞ্চলিক দলগুলির সমর্থন কোনোদিনই পাবে না।

আমরা যা-ই বলি, দিল্লির জনগণই ঠিক করবে আপের ভবিষ্যৎ কী। আমরা কি আগামী নির্বাচনে গণতন্ত্রের বিজয় দেখব? 'দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভারত' আন্দোলনে আমরা দিল্লির ইতিবাচক ভূমিকা দেখেছি। দিল্লিকে পূর্ণ রাজ্যের সম্মান দিতে একই ভূমিকা হয়তো নেবে দিল্লির জনসাধারণ।

(লেখক দিল্লির পার্ল একাডেমির স্কুল অফ মিডিয়ার প্রধান । অভিমত সম্পূর্ণভাবে লেখকের নিজস্ব।)



Something isn't right! Please refresh.

Advertisement