দীপাবলির পরেই বাংলা, তামিলনাড়ু ও কেরলে ভোটার তালিকার বিশেষ আমূল সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া শুরুর তোড়জোড় চলছে নির্বাচন কমিশনে। বিহারে এসআইআর নিয়ে দেশ জোড়া বিতর্কের মধ্যেই এ বার ওই উদ্যোগ ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠল কেরলে। দক্ষিণী ওই রাজ্যের বিধানসভায় সর্বসম্মত প্রস্তাব পাশ হল এসআইআর-এর পদ্ধতি ও উদ্দেশ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। তারই পাশাপাশি কমিশনের কাছে এসআইআর পিছিয়ে দেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন কেরলের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) রতন ইউ কেলকর। সে রাজ্যে স্থানীয় প্রশাসনের নির্বাচন-পর্ব মেটার আগে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ করায় সমস্যার কথা জানিয়েছেন তিনি।
বাংলার মতোই কেরলেও ২০২৬ সালে একই সময়ে বিধানসভা নির্বাচন। রাজ্য রাজনীতিতে পরস্পরের যুধুধান হলেও এসআইআর-প্রশ্নে অবশ্য বিধানসভার অন্দরে হাত মিলিয়েছে শাসক ফ্রন্ট এলডিএফ এবং বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ। অধিবেশনে এই সংক্রান্ত প্রস্তাব পেশ করেছিলেন দেশের একমাত্র বাম-শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন। বিজেপি-শূন্য বিধানসভায় শাসক ও বিরোধীর সমর্থনে প্রস্তাব পাশ হয়েছে সর্বসম্মত ভাবেই। তবে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের আনা দু’টি সংশোধনী গ্রহণ করেছে সরকার পক্ষ। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংখ্যালঘু, তফসিলি জাতি ও জনজাতি, মহিলা এবং অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল অংশের মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। বিহারের অভিজ্ঞতার পরে দেশ জুড়ে এসআইআর নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিহারের পরে ভোট-মুখী তিন রাজ্য কেরল, তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গকে এসআইআর-এর জন্য বেছে নেওয়ায় কমিশনের ‘উদ্দেশ্য’ নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি ওই প্রক্রিয়া নিয়ে তাড়াহুড়ো না-করার দাবি তোলা হয়েছে প্রস্তাবে।
প্রস্তাব পাশের পরে মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ন বলেছেন, ‘‘এসআইআর নিয়ে সারা দেশের মতো এই রাজ্যও উদ্বিগ্ন। সর্বসম্মত প্রস্তাবে সেই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কমিশনের কাছে আমরা আবেদন জানাচ্ছি, স্বচ্ছতা এবং মৌলিক অধিকার রক্ষা নিশ্চিত করুন। তাড়াহুড়ো করে এমন কোনও পদক্ষেপ যেন না হয়, যার ফলে ভোটারের আস্থা নষ্ট হবে।’’
বিধানসভায় এই উদ্যোগের আগে এসআইআর প্রসঙ্গে সর্বদল বৈঠক ডেকেছিলেন কেরলের সিইও। সেই বৈঠকে বিজেপি ছাড়া সব দলই ভোটার তালিকা সংশোধনের এই বিশেষ প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন ও আপত্তি তুলেছে। এসআইআর শুরু করার সময়ে ২০০২ সালের ভোটার তালিকাকে (বাংলার মতো কেরলেও শেষ বার এসআইআর হয়েছিল ২০০২ সালে) ভিত্তি ধরার সিদ্ধান্তেরও বিরোধিতা করছেন শাসক বাম ও বিরোধী ইউডিএফ নেতৃত্ব। তাঁদের দাবি, বাড়ি বাড়ি গিয়ে যখন ভোটারের অস্তিত্ব যাচাই করা হবে, তা হলে ২০২৪ সালের তালিকা ধরে কাজ করতে অসুবিধা কোথায়? যাঁদের জন্ম ১৯৮৭ সালের আগে, তাঁদের বাবা-মায়ের নাগরিকত্বের নথি চাওয়ারও বিরোধিতা করেছেন তাঁরা। এই দুই প্রশ্নই বিধানসভার প্রস্তাবেও রাখা হয়েছে।
সর্বদল বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলির মতামত নেওয়ার পরে কেরলের সিইও কেলকর কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে বলেছেন, রাজ্যে এর পরে পুরসভা, পঞ্চায়েতের মতো স্থানীয় প্রশাসনের ভোট হবে। যা শেষ করতে হবে ২১ ডিসেম্বরের মধ্যে। এই সময়ে এসআইআর করতে হলে ভোটের কাজে কর্মী পাওয়া মুশকিল, দলগুলির সহযোগিতাও মিলবে না। কেলকরের মতে, এসআইআর সম্পূর্ণ করতে সব মিলিয়ে তিন মাস সময় লাগে। সে ক্ষেত্রে জানুয়ারির গোড়ায় কাজ শুরু করলেও ভোটের আগে মার্চে ওই প্রক্রিয়া গুটিয়ে আনা যাবে। কমিশন অবশ্য এখনও এই ব্যাপারে বক্তব্য জানায়নি। অন্য দিকে, কমিশনের তরফে বলা হয়েছে, বিহারের বিধানসভা ভোট এবং অন্যান্য রাজ্যের উপনির্বাচনে মোট ৪৭০ জন কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হবে। দায়িত্ব দেওয়ার আগে সম্ভাব্য পর্যবেক্ষকদের আগামী ৩ অক্টোবর দিল্লিতে কমিশনের দফতরে ডাকা হয়েছে। পরের দিন, ৪ তারিখ বিহারে যাওয়ার কথা কমিশনের পূর্ণ বেঞ্চের।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)