Advertisement
E-Paper

পিচ না বুঝে সন্ত্রাস-রব মাঠে মারা গেল ব্রিকসে

ঘরোয়া মাঠে যেটা সম্ভব হয়েছে, ঠিক সেটা বড় ম্যাচেও অনায়াসে করা যাবে— এমন হিসেবই কষেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী! আর সেই পরিকল্পনামাফিক হৈ হৈ করে তৈরি হয়েছিল সাউথ ব্লক।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০১৬ ০২:৪৭

ঘরোয়া মাঠে যেটা সম্ভব হয়েছে, ঠিক সেটা বড় ম্যাচেও অনায়াসে করা যাবে— এমন হিসেবই কষেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী! আর সেই পরিকল্পনামাফিক হৈ হৈ করে তৈরি হয়েছিল সাউথ ব্লক। ব্রিকস সম্মেলনের শেষে দেশের কূটনীতির কর্তারা কবুল করছেন, পিচ বুঝতে ভুল হওয়ায় মোদী সরকারের এই কৌশল সম্পূর্ণ মুখ থুবড়ে পড়ল। এবং এতটাই যে, আমেরিকাও এখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নিরন্তর পাকিস্তান-বিরোধী প্রচার নিয়ে খুব একটা গা করছে না। বরং এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে বলা হলে প্রসঙ্গটি কার্যত এড়িয়েই গিয়েছেন হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র।

দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে লাগাতার দৌত্যের মাধ্যমে ইসলামাবাদের সার্ক সম্মেলন সফল ভাবে সার্বিক বয়কট করানো সম্ভব হয়েছিল। গোষ্ঠীর প্রায় প্রত্যেকটি দেশ আলাদা করে বিবৃতি দিয়ে পাকিস্তানের মদতে সন্ত্রাসের নিন্দা করেছিল। তখনই স্থির হয়, সার্কের পরে এ বার গোয়ায় ব্রিকস মঞ্চকেও ব্যবহার করা হবে পাকিস্তানকে আরও একঘরে করে ফেলতে। সম্মেলনের ৪৮ ঘণ্টা ধরে তারই প্রবল চেষ্টা চালিয়ে গেল দিল্লি। কিন্তু ঘটল প্রত্যাশার ঠিক উল্টোটা। সাপ বেঁচেই রইল। কিন্তু ভেঙে গেল লাঠি!

ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চিন দশ বছর আগে ‘ব্রিক’ গোষ্ঠী গড়েছিল একটি বিশেষ লক্ষ্যকে সামনে রেখে। পরে ২০১০-এ দক্ষিণ আফ্রিকা এতে যোগ দেওয়ায় নাম পাল্টে ‘ব্রিকস’ করা হলেও, গোষ্ঠীর মূল লক্ষ্যটি বদলায়নি। তা হল, পরস্পরের মধ্যে সহযোগিতা বাড়িয়ে এই গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলির বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গতি আনা। কিন্তু এ বারের সম্মেলনকে ভারত যে ভাবে পাকিস্তান-কেন্দ্রিক করে তুলেছিল তা যে বাকি সদস্যদের মোটেই পছন্দ হয়নি, এ বারের ব্রিকস ঘোষণাপত্রই তার বড় প্রমাণ। ১০৯ পাতার গোয়া ঘোষণাপত্রে সীমান্তপারের সন্ত্রাস বা পাকিস্তান সম্পর্কে একটি শব্দও ব্যবহার করা হয়নি।

সূত্রের খবর, ভারতের পক্ষ থেকে প্রবল চেষ্টা ছিল যাতে ‘সন্ত্রাসবাদের স্বর্গোদ্যান’ অথবা ‘সীমান্তপারের সন্ত্রাসের’ প্রসঙ্গ যৌথ বিবৃতিতে থাকে। কিন্তু সন্ত্রাসের প্রশ্নে পাকিস্তানের নাম করে বা সরাসরি তাদের দিকে আঙুল তুলে কোনও মন্তব্য বিবৃতিতে রাখার ঘোর বিরোধিতা করেছে অন্য দেশগুলি। বরং অভিযোগ উঠেছে, একটি বহুপাক্ষিক মঞ্চকে কার্যত নিজস্ব দ্বিপাক্ষিক সমস্যার মঞ্চে পরিণত করল ভারত। শুধু চিন-ই নয়, রাশিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলির পক্ষ থেকেও ঘরোয়া ভাবে জানানো হয়েছে, ভারতের এই অতিরিক্ত পাক-বিরোধী প্রচারের ফলে সম্মেলন তার মুখ্য উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়েছে। কূটনীতি-বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে ভারতের নিজস্ব বিদেশনীতিও বিশ্বের সামনে কিছুটা খাটো হয়ে গেল।

দু’দিনের সম্মেলনে নয়-নয় করে ছ’বার পাকিস্তানের মদতপ্রাপ্ত সন্ত্রাসবাদের কথা বলেছেন মোদী। এবং এতটাই চড়া উচ্চারণে, যে গুরুত্বহীন হয়ে যায় অন্যান্য ব্রিকস-কর্মসূচি। আঞ্চলিক ভাবে এবং বৃহত্তর ক্ষেত্রে ভারতকে অর্থনৈতিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরা, গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলির মধ্যে সব রকম যোগাযোগ বাড়ানো, শক্তিক্ষেত্রে বিপুল চাহিদা মেটানোর জন্য আলাপ-আলোচনা করা— এই সমস্ত কিছুই অনুপস্থিত থেকে গেল এ বারের সম্মেলনে।

উরি হামলার নিন্দা বা ভারতীয় সেনার ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’-কে সমর্থন করাই শুধু নয়, আমেরিকা সরাসরি ওই অভিযানের পাশে থেকে থেকেছে। কিন্তু ব্রিকস সম্মেলনে মোদীর পাক-বিরোধী মন্তব্য নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে গত কাল হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব জোশ আর্নেস্ট কার্যত পাশ কাটিয়ে যান। আমতা আমতা করে বলেন, ‘‘তিনি ঠিক কী বলেছেন জানা নেই। তবে এটা বলতে পারি, আমরা সব সময়েই ভারত-পাকিস্তানকে শান্তিপূর্ণ পথে ও আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটাতে উৎসাহ জুগিয়ে এসেছি।’’ প্রাক-উরি পর্বে আমেরিকা এ ভাবেই অভিভাবক সুলভ পরামর্শ দিত দু’দেশকে। এবং একই সঙ্গে আর্থিক ও সামরিক সাহায্য জোগাত পাকিস্তানকে।

এই পরিস্থিতি কেন হল? কার ব্যর্থতায়? এ সব নিয়ে সাংবাদিক বৈঠকে প্রশ্ন করা হলে দৃশ্যতই আজ অস্বস্তিতে পড়ে যান বিদেশসচিব এস জয়শঙ্কর এবং সচিব (অর্থনৈতিক সম্পর্ক) অমর সিংহ। পরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদেশ মন্ত্রকের এক কর্তা বলেন, ‘‘একটা বিষয় হিসেবের মধ্যে রাখা হয়নি উরি কাণ্ডের পরও পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক মহড়া করে রাশিয়া তাদের পক্ষপাত স্পষ্ট করে দিয়েছে। কান দেয়নি ভারতের আপত্তিতে। আর চিনও ইসলামাবাদের পাশে থাকারই বার্তা দিয়ে গিয়েছে।’’

তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, যে চারটি দেশকে সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানকে একঘরে করার ছক করেছিল ভারত তার দু’টি ঘোষিত ভাবেই পাকিস্তানের সঙ্গে রয়েছে। বাকি রইল দু’টি দেশ— ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা, যাদের সঙ্গে পাক-সন্ত্রাসের দূরদূরান্তের কোনও সম্পর্ক নেই। পিচ না বুঝে বল ফেলায় যা হওয়ার সেটাই হয়েছে।

terrorism BRICS Modi government
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy