Advertisement
E-Paper

জীবিকার সন্ধানে রাতে

মায়ানগরীতে রাতে কারা জেগে থাকে? চোর-গুন্ডা, অন্ধকার গলিতে হারিয়ে যাওয়া মেয়েরা? এই বৃহৎ জন অরণ্যে যারা একা বা হঠাৎই একা হয়ে যান তদেরই কেউ কেউ রাতে এসে যখন মেরিন ড্রাইভের কুইন্স নেকলেস অথবা ওরলি সি ফেস-এ বসেন তখন কেউ কেউ বেরিয়ে পড়েন জীবিকার খোঁজে। লিখছেন পৌলমী সরকাররাতে কালো সমুদ্রের জলের উপর যখন চাঁদের আলো ঢেউ খেলে যায় কালোর উপর রূপোলী রং চিক চিক করে ওঠে তখন কানের পাশ দিয়ে দুহাতের আঙ্গুলের ফাঁকে দুটো করে চারটে কাঁচের শিশিতে ঠোকা ঠুকি করে টিং টিং শব্দ তুলে হেঁটে যায় চম্পিওয়ালা - তেল মালিশ। সমুদ্রের দিকে ঘুরে বসে থাকা উদাসী মনের মানুষটার মনে ওঠে ‘লাখ দুখোঁকি এক দবা হ্যায়, কিউ না আজমায়ে, কাহে ঘবরায়ে, কাহে ঘবরায়ে।’

শেষ আপডেট: ১০ মে ২০১৫ ০০:০৩

রাতে কালো সমুদ্রের জলের উপর যখন চাঁদের আলো ঢেউ খেলে যায় কালোর উপর রূপোলী রং চিক চিক করে ওঠে তখন কানের পাশ দিয়ে দুহাতের আঙ্গুলের ফাঁকে দুটো করে চারটে কাঁচের শিশিতে ঠোকা ঠুকি করে টিং টিং শব্দ তুলে হেঁটে যায় চম্পিওয়ালা - তেল মালিশ। সমুদ্রের দিকে ঘুরে বসে থাকা উদাসী মনের মানুষটার মনে ওঠে ‘লাখ দুখোঁকি এক দবা হ্যায়, কিউ না আজমায়ে, কাহে ঘবরায়ে, কাহে ঘবরায়ে।’ চাম্পিওয়ালা একটা, আধটা ধন্ধা পেয়ে যায়। রাস্তার উপর দিয়ে একটা দুটো ট্যাক্সি বেরিয়ে যায় মাথায় মালপত্র চাপিয়ে রেল স্টেশন বা বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে। বেরিয়ে আসে বাড়ির থেকে বৃহ্নমুম্বই মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের ঠিকে কর্মীরা ইঁদুর মারার উদ্দেশ্যে।

প্যায়াসা ছবিতে মালিশওয়ালা আবদুল সাত্তার অর্থাৎ জনি ওয়াকারের আবির্ভাব বোধহয় একদম সঠিক সময়ে হয়েছিল। ছবিতে যখন একটা গম্ভীর উদাস ভাব তখন আবদুল সাত্তারের চমকপ্রদ আগমন। এইরকমই বাস্তবেও রাতের মুম্বইতে মালিশওয়ালারা তার সঠিক খদ্দেরকে চিনে নিতে ভুল করেনা। চার থেকে ছ'ইঞ্চি মাপের বোতলগুলো আঙ্গুলের ফাঁকে ধরা থাকে ঠিক যেমন কলকাতার বাসের কন্ডাক্টর ধরে থাকে টিকিটের গুচ্ছ। চম্পিওয়ালার পকেটেও থাকে কয়েকটা বোতল। সাধারণভাবে দেখলে মনে হয় দেশি পানীয় বোতল রাস্তা দিয়ে ফেরি করে যাচ্ছে।

রাত ন'টা বাজলেই তেল মালিশওয়ালারা রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে তেলের বোতল হাতে নিয়ে। এটা পুরনো মুম্বইএর একটা সংস্কৃতি। শুধু মেরিন ড্রাইভ বা ওরলি সি ফেসই নয় এরা ঘুরে বেড়ান গ্রান্ট রোড, ল্যামিঙ্গটন রোড, মুম্বই সেন্ট্রাল, তারদেও, গামদেবি, কোলাবা, ভেন্ডিবাজার, নাগপাড়া, মদনপুরা এলাকাতেও। দক্ষিণ মুম্বইএর ধনীরা যান আজকাল স্পাতে। তাই এদের ব্যবসা অনেকটাই মার খাচ্ছে। শুক্র, শনি ও রবিবার এদের ব্যবসা একটু ভালো চলে। কিন্তু এদের ব্যবসার বড় খদ্দের হল এই সব অঞ্চলের মধ্যবিত্তরা। মাথায় তেল দিয়ে মালিশ করার সাথে সাথে দেহেও মালিশ করে দেয় চাইলে। কি তেল দিয়ে এই মালিশ করেন এই চম্পিওয়ালারা? তুলসী, লেবু বা অশ্বগন্ধার তেল থাকে তাদের সঙ্গে। তিন রকমের এই তেলের প্রত্যেকটাই রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বাড়ায়। রক্তে শ্বেত কণিকাও বাড়ায়। রাতের খাওয়া হয়ে গেলে মালিশ নিতে আসেন অনেক মুম্বইকরই। জানিয়েছিল ওরলি সি ফেসের এক চম্পিওয়ালা। ধরা যাক তার নাম আবদুল সাত্তার।

আবদুল থাকে ওরলির পাহাড়ের গায়ে চলে। বাড়িতে আছে মা আর বোন। বাবা ছোটবেলা থেকেই নিরুদ্দেশ। বাড়ির পেশা এটাই। আবদুল জানিয়েছিল গরমকালেই কিছুটা ব্যবসা হয়। বর্ষায় খুব কষ্ট। মেরিন ড্রাইভ, ওরলি সি ফেসের বসার জায়গাগুলো ফাঁকাই থাকে। তাই বর্ষায় কাজ প্রায় বন্ধই থাকে। আর শীতে তো সমুদ্রের ধারে রাতে হাওয়া খেতে কেউ বড় একটা আসেনা তাই তেলের শিশি নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াতে হয়। কোন দিন খদ্দের পায় আবার কোন দিন খালি যায়। পঞ্চাশ টাকা থেকে দুশো টাকা পর্যন্ত রোজগার হয়। আর কোনদিন ভাগ্য প্রসন্ন হলে পাঁচশো টাকা পর্যন্ত হয়। আবুদল বলেছিল বেশিরভাগ লোকই আজকাল মাথায় শুধু চম্পি করতে চায়। কেউই আর পুরো দেহ মালিশ করতে আসেনা। এরা শরীরের মালিশ করে দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো চালনা করে দেয়। কম্পিউটারের সামনে বসে বসে কাঁধ দুটো সামনে ঝুঁকে পড়ে এরা সেখানকার মাংসপেশি পুনরায় সঞ্চালন করে। আবদুলের মালিশ করার তেল আবদুলের মা বানিয়ে দেয়। আবদুলকে চম্পি করা ছাড়াও আর একটা কাজ করতে হয়। নয়তো শুধু চম্পি করে সংসার চালানো সম্ভব নয়। দিনের বেলা ওরলির একটা সেলুনে চুল কাটার কাজ করে আবদুল। রাতে চম্পির কাজ করে বাড়ি ফিরতে হয়ে যায় রাত বারোটা। যদি কোন খদ্দের পায় তবে তাহলে আরও দেরি হয়।

ছোটবেলায় পড়া, ইঁদুর ছানা ভয়ে মরে, ঈগল পাখী পাছে ধরে। রাত একটা থেকে তিনটে- এই সময়টায় ইঁদুর তার গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে খাবারের সন্ধানে। কারণ দিনের বেলা বের হলে কাক চিল তাদের তিষ্ঠতে দেয়না। ইঁদুরের প্রভাব ও প্রতিপত্তি খুব বেশি এই মুম্বই শহরে। গণেশের বাহন বলেই কি? ইতিহাস বলে বহুবার এ শহর প্লেগে আক্রান্ত হয়েছে। অনেক পুরনো বাড়ির ভিত নড়িয়ে দিয়েছে এই ইঁদুররা গর্ত করে তার বাসা বানিয়ে। শহরের মানুষকে সুস্থ রাখতে বৃহ্নমুম্বই মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের কাজ হল তাই শহরের ইঁদুর নাশ করা। যারা মুম্বইয়ে ইঁদুর মেরে শহরকে সুস্থ রাখে তাদের জীবিকা অর্জনের পথটা খুব সহজ বা সুস্থ নয়। রাত দশটার পর কিছু মানুষ বেরিয়ে পরে ইঁদুর মারতে। তাদের হাতে থাকে একটা লাঠি আর একটা টর্চ। অনুসন্ধানী চোখ সহজেই খুঁজে পায় পুরনো বাড়ির ভিতের কাছে দেওয়াল ঘেঁষে থাকা ইঁদুরের গর্ত অথবা ময়লার স্তূপে খাবার খুঁজতে আসা ইঁদুর। মানুষ যখন সারা দিনের কাজের পর গভীর ঘুমে মগ্ন তখন বিলাস উভারে, মিলিন্দ গণপত, তুষার তিরাইএর মত মানুষরা কাজে নামেন। শুরু হয় জীবিকার জন্য ইঁদুর সন্ধান। ইঁদুর শিকারির লাঠির আগাটা ধাতু দিয়ে মোড়া থাকে। ইঁদুরের গর্তের সামনে এসে লাঠি দিয়ে ধাতব শব্দ করলে ইঁদুর তার গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে। তারপর ইঁদুরের চোখের উপর টর্চ দিয়ে আলো ফেলেন। কয়েক সেকেন্ডের জন্য ইঁদুরটি বিহ্বল হয়ে পড়ে। ঐ সময়ের মধ্যেই অন্য হাতে ধরে থাকা লাঠি দিয়ে ইঁদুরকে আঘাত করেন। ইঁদুরটাকে মারতে পারলে ভাল নয়তো ফসকে পালিয়ে যায়। মরা ইঁদুর বস্তায় তুলে নেন। বিলাস উভারে একদিনে দুশো দশটা ইঁদুর মেরে ছিলেন লোয়ার প্যারেল এলাকা থেকে। সেই রেকর্ড এখনও কেউ ভাঙ্গতে পারেনি। বিলাস উভারের মত মানুষরা প্রতিরাতে ইঁদুর ধরে ফেলেন ঠিকই কিন্তু কাজটা খুব সহজ নয়। অনেক সময় শিকারিদের পায়ে লাফিয়ে ওঠে ইঁদুর আর ইঁদুরের শরীর থেকে বেরিয়ে আসা তরল বর্জ্য পদার্থ চামড়ায় লেগে ঘা সৃষ্টি করে আবার কখনও ময়লার গাদায় ইঁদুর খুঁজতে গিয়ে কামড়ও খায় ইঁদুর শিকারিরা। অনেক সময় ময়লার গাদায় তাদের পা পিছলেও যায়। বিলাস উভারে, মিলিন্দ গণপতরা যথেষ্ট গর্বিত তাদের কাজের সাফল্যের জন্য। এ শহরে অনেক দিন প্লেগ হয়নি। কিন্তু সমাজে এরা কতটা মর্যাদা পান? কাজ করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়লে ভালো চিকিৎসা কি জোটে এদের কপালে? এদের মাস মাইনে পাঁচ হাজার টাকা। তাও একজন ইঁদুর শিকারিকে সূর্য ওঠার আগে পর্যন্ত তিরিশটা ইঁদুর ধরতে হয়। কম হলে সেই রাতের মজদুরি কাটা। মুম্বইএর ইঁদুর শিকারিদের নিয়ে সাম্প্রতিক অতীতে একটা তথ্য চিত্র হয়েছে। তথ্যচিত্রটা পুরষ্কারও পেয়েছে। কান চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয় তথ্যচিত্রটি। ইঁদুর মারার লোক চেয়ে বিজ্ঞাপন দিলে স্নাতক স্তরের ছেলেরাও আবেদন পত্র পাঠায়। দেশের বেকার সমস্যা এতটাই বেশি। পশু প্রেমীরা এইভাবে ইঁদুর মারা নৃশংসতা বলে মনে করেন। তারা বলেন ইঁদুর ধরে নিয়ে তাদের এক সাথে ধীরে ধীরে মেরে ফেলা উচিত। কিন্তু নগরপালিকা এ ভাবে ইঁদুর নাশ করা ছাড়া কোন উপায় নেই বলে মনে করে।

বর্ষায় চম্পিওয়ালাদের কাজ প্রায় বন্ধ থাকে। কিন্তু একজন ইঁদুর শিকারিকে বেরোতেই হয়। কারণ বর্ষাকালেই রোগ জীবাণু বেশি ছড়ায়। বর্ষায় ভিজে ভিজে চলে ইঁদুর মারার কাজ। ইঁদুরগুলো এ সময়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকে থাকে। সুরেশ কাম্বলে ও তার সহকর্মীকে অপেক্ষা করতে হয় বৃষ্টিটা একটু ঝড়ে যাবার জন্য। এ সময় বাড়িগুলো থেকে মাখন লাগানো রুটির টুকরো, দু এক টুকরো পেঁয়াজ জানলা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। ইঁদুর খাবারের লোভে বেরিয়ে আসে বাড়ির ভেতর থেকে আর ধরা পড়ে যায় ইঁদুর শিকারির হাতে। কোন সময় লাঠির আঘাতে ফসকে গিয়ে ইঁদুর লাফিয়ে উঠলে কাম্বলে তার দক্ষ হাতে লেজটা ধরে ফেলে। তারপর লাঠির আঘাতে পিটিয়ে মেরে ফেলে। কাম্বলে জুতো চটি কিছু পড়েনা। শব্দকে এড়াবার জন্য।

সপ্তাহের ছ’রাতই এদের বেরিয়ে পড়তে হয় ইঁদুর ধরতে। মুম্বইতে ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসছে ইঁদুরকে পিটিয়ে মেরে শেষ করার প্রথা। নিজেদের অসুস্থ করে সুস্থ রাখেন শহরবাসীকে এরা। তবুও যে পরিমাণ ইঁদুর এ শহরটাতে আছে তার অর্ধেকও মার পড়ে না। বন্দর শহর মুম্বই। প্রতিদিন ডকে জাহাজ এসে ভেড়ে। সেই সঙ্গে আমদানি হয় ইঁদুর। আর আছে মুম্বইএর অগণিত চল। যেগুলো ইঁদুরদের সংখ্যায় বেড়ে ওঠার স্বর্গ। তাই মুম্বইতে ইঁদুর কিছুতেই কমবে না। শহরের মাত্র দুই তৃতীয়াংশই মারা পড়ে ইঁদুর শিকারিদের হাতে। বাকিরা মারা যায় ইঁদুর মারা বিষে বা অন্যান্য কারণে। মিউনিসিপালিটির যে ক'জন এই পেশায় যুক্ত আছে তারা শুধু দক্ষিণ মুম্বইএর ইঁদুর মারার পক্ষে যথেষ্ট। শহরতলির দিকে এ কাজ হয়ই না।

সমস্যাটা সেই আদি। ভারতবর্ষের অপর্যাপ্ত জনসংখ্যা। আর সেই তুলনায় রোজগারের পথ কম। মুম্বই শহরটা ধনীদের। তাদের খেয়ালেই চলে শহরটা। দেহের ম্যাসাজের জন্য সবাই আজকাল পাড়ি দেয় সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক। অল্প টাকার চম্পিতে যে সেই ঝক ঝক তক তকে ভাবটা নেই। কারও মনে পড়েনা যে ‘ইস্ চম্পিমে হ্যায় বড়ে বড়ে গুণ’। তবু মুম্বইএর মত শহরে বেঁচে থাকতে গেলে আগাছার মত মানুষদের শহরটার নিজস্ব কতকগুলি শর্ত মেনে নিতে হয়। তাই শহরটাকে সুস্থ রাখার আগে শুধু নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে এ শহরে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রতিদিন রাতে জেগে কাউকে তিরিশটা প্রাণী হত্যা করতে হয়। রাতের কালো আকাশটা থেকে যখন নিঃশব্দে তারা খসে পড়ে ঘুমের আবেশে খদ্দের তার চম্পিওয়ালার মাথায় বিলি কাটতে থাকা আঙ্গুলগুলোকে থামিয়ে দিয়ে বাড়ি ফেরার উদ্যোগ করে। ঘোড়ার পায়ে ক্লপ ক্লপ শব্দ তুলে ধীরে কোন ঘোড়ার গাড়ি যাত্রি নিয়ে কোলাবার দিক থেকে গোলদেউলের অন্ধকার গলিতে মিলিয়ে যেতে থাকে। পুলিশের গাড়ি টহল দিয়ে যায়। চম্পিওয়ালা সমুদ্রের হাওয়া গায়ে মাখেনা। বাড়ি ফিরে শেষ রাতে যদি পিঠটা একটু টান করতে পারে তাই জোরে জোরে পা চালায়। ইঁদুর শিকারির ছুটি হয় না। জেগে থাকে মুম্বই জীবিকার সন্ধানে।

mumbai rat hunters rat hunter rat killer men mumbai rat problem poulami sarkar
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy