×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৫ জুন ২০২১ ই-পেপার

দেশ

নেই লোহার গারদ, স্রেফ চাষ করেই বছরে দু’কোটি আয় করেন এই জেলের বন্দিরা

নিজস্ব প্রতিবেদন
২৭ জুন ২০২০ ১৪:৩২
এ জেলখানা যেন প্রকৃত অর্থেই সংশোধনাগার। সাজাপ্রাপ্তদের প্রথাগত ভাবে কুঠুরিতে বন্দি করে রাখা হয় না। জেলের বিস্তীর্ণ এলাকায় চাষ করে বেড়ান তাঁরা। তবে সেখানে তাঁদের থাকার জন্য রয়েছে ডর্মিটারি।

কেরলের নেত্তুকালথেরিতে রয়েছে এই ‘ওপেন’ জেল। যা তিরুঅনন্তপুরম থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে। সুন্দর আবহাওয়ার এই পাহাড় ঘেরা গ্রামের অন্যতম আকর্ষণ এই জেল।
Advertisement
প্রায় ৪৭৪ একর এলাকা নিয়ে তৈরি হয়েছে এই জেল। বিস্তীর্ণ জমিতে হয় চাষ। তাছাড়া ডেয়ারি, পোলট্রি ফার্ম এবং মাছের চাষও হয় এই জেলের ভিতর। এই সব কিছু মিলিয়ে প্রতি বছর দু’কোটি টাকা রোজগার করেন বন্দিরা।

১৯৬২-তে তৈরি করা হয়েছিল এই জেল।  সে রাজ্যের বিভিন্ন জেলে থাকা বন্দি যাদের ব্যবহার খুব ভাল। তাঁদের এনে রাখা হয় এখানে।
Advertisement
নেত্তুকালথেরিতে রয়েছে ২৭৪ একর জমি। সেখান থেকে আট কিলোমিটার দূরে থেভাঙ্কর গ্রামে রয়েছে বাকি ২০০ একর। বনবিভাগ এই  ২০০ একর জমি দিয়েছিল জেল কর্তৃপক্ষকে।

এই জমির মধ্যে ২০০ একর জমি জুড়ে চাষ করা হয় রবার। ২০ একর জমি জুড়ে রয়েছে সবজির বাগান। সেখানে অর্গ্যানিক ফার্মিংয়ের মাধ্যমে পালং শাক, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ঢ্যাঁড়স, বিন, শশার চাষ করা হয়। জেলের খাবারের জন্য এই সবজিই ব্যবহার করা হয়। অতিরিক্ত সবজি বিক্রি করে বছরে ১০ লক্ষ টাকা রোজগার হয় জেল কর্তৃপক্ষের।

তবে ২০০ একর জমিতে রবার চাষই ভরাট করে জেলের কোষাগার। প্রতিদিন প্রায় এক হাজার রবার শিট তৈরি হয়। প্রতি বছর প্রায় এক কোটি টাকা আসে এই চাষ থেকে।

চাষের পাশাপাশি প্রচুর গবাদি পশুও রয়েছে জেলে। ৫০টি গরু, ৫০টি ছাগল, ২০টি মোষ ছাড়াও একটি পোলট্রি ফার্ম রয়েছে সেখানে। এই পোলট্রি ফার্মের ডিম বিক্রি করে বছরে ছ’লক্ষ টাকা ঘরে তোলে জেল কর্তৃপক্ষ।

নিকটবর্তী একটি খাল থেকে সেচের মাধ্যমে আনা জল ব্যবহৃত হয় চাষের কাজে। আর জলাশয়েই রুই, কাতলা, তেলাপিয়ার মতো মাছ চাষ করা হয়।

এই সব বিভিন্ন কাজের জন্য প্রতিদিন ২৩০ টাকা করে দেওয়া হয় বন্দিদের। তাঁরা যখন জেল থেকে ছাড়া পান, তখন একেবারে সেই টাকা দেওয়া হয় তাঁদের।

ওপেন প্রিজনের ডেপুটি ইনস্পেক্টর জেনারেল ও সুপারিন্টেন্ডেন্ট সাম থাঙ্কায়ন জানিয়েছেন, ‘‘এখানে জেলের ভিতর আমরা যে ব্যবস্থা তৈরি করেছি, তা বন্দিদের গঠনমূলক কাজ উৎসাহিত করে। তাঁরা যখন কাজের সরাসরি যুক্ত হন, তখন জেলেবন্দি হয়েও তাঁদের মধ্যে অনন্য অনুভূতি কাজ করে।’’

তবে চাইলেই সবাই এই জেলে আসতে পারেন না। বন্দিদের রীতিমতো সিলেকশন করে এই জেলে আনা হয় বলে জানিয়েছেন  সাম। এ ব্যাপারে তিনি বলেছেন, ‘‘সেন্ট্রাল প্রিজন সুপারিন্টেন্ডেন্ট, জোনাল ডিরেক্টর জেনারেল অব পুলিশ, চিফ ওয়েলফেয়ার অফিসারদের নিয়ে তৈরি করা হয় কমিটি। তিন বছর সেন্ট্রাল জেলে কাটানো বন্দি, যাঁরা শৃঙ্খলাপরায়ণ তাঁদের বাছাই করে আনা হয় এখানে।’’

ওপেন জেল শুধু গঠনগতভাবেই মুক্ত নয়। সেখানকার পরিবেশও যথেষ্ট মুক্তমনা। কাজের বাইরে জেলের মধ্যে নিজেদের মতোই হেঁটে চলে বেড়ান বন্দিরা। বন্দিদের অবসর যাপনের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থাও রয়েছে ওই জেলে। সেখানকার লাইব্রেরিতে রয়েছে ২০ হাজারেরও বেশি বই।

করোনাকালে মাস্ক ও স্যানিটাইজারের চাহিদা বেড়েছে দেশ জুড়ে। তাই এ সময় ওই সব তৈরির কাজও শুরু করেছেন বন্দিদের একাংশ।

এ ভাবেই বন্দিদের বিচ্ছিন্ন নয়, সমাজের মূলস্রোতে ফেরানোর কাজ চলছে কেরলের মুক্ত জেলে। আর কাজের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা বাড়িয়ে জেল-পরবর্তী জীবনে সুস্থভাবে বাঁচার দিশা খুঁজছেন বন্দিরা।