E-Paper

বন্দে মাতরম্‌ মন্ত্রে সিঁদুরের উদ্‌‌যাপন

পহেলগাম হামলার পাল্টা পাক ভূখণ্ডে ভারতের হামলায় বায়ুসেনার যুদ্ধবিমান আর ড্রোনের বড় ভূমিকা যেমন ছিল।

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:২৮
প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে ‘নাগ’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা।

প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে ‘নাগ’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। পিটিআই।

যা প্রত্যাশিত ছিল, দৃশ্যত হলও তা-ই। ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজ জুড়ে রইল ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সাফল্যের ঘোষণা। কখনও তার প্রদর্শন রাজধানীর কর্তব্য পথ বেয়ে গড়িয়ে যাওয়া ট্যাবলোয়, কখনও আকাশ ফুঁড়ে উড়ে যাওয়া যুদ্ধবিমানের মহাগর্জনে, কখনও ব্রহ্মস, আকাশ-এর মতো ক্ষেপণাস্ত্রেরপ্রকাশ্য উপস্থিতিতে।

পহেলগাম হামলার পাল্টা পাক ভূখণ্ডে ভারতের হামলায় বায়ুসেনার যুদ্ধবিমান আর ড্রোনের বড় ভূমিকা যেমন ছিল, তেমনই ভারতের মাটিতে পাক হামলা প্রতিহত করেছিল ভারতের আকাশ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। সেনার তিন বাহিনীর যৌথ ট্যাবলোতে সেই বহুচর্চিত ‘এস-৪০০’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার মডেল, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যাকে বলে থাকেন সুদর্শন চক্র। ট্যাবলোর দু’টি ভাগ। সামনের দিকে এস-৪০০, আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র, উড়ন্ত রাফাল যুদ্ধবিমানের মডেল। অন্য দিকে হামলায় জ্বলন্ত ইমারতের মডেল। স্পষ্টতই, পাক জঙ্গি ঘাঁটির প্রতীকী মডেল সেটি। ট্যাবলোর সামনে লেখা ‘ভিকট্রি থ্রু জয়েন্টনেস’— একযোগে কাজ করে জয়। আর একটি ট্যাবলোয় কাচের ঘরের মধ্যে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর ‘ইন্টিগ্রেটেড অপারেশনাল সেন্টার’ বা অভিযানের যৌথ রণকৌশল কেন্দ্রের মডেল। কম্পিউটারের পর্দার সামনে ব্যস্ত সেনাকর্তারা। ভাষ্যকার তখনও মনে করালেন ‘সিঁদুর’-এর কথা। ট্যাবলোয় ঘুরন্ত সুবিশাল একটি ‘সুদর্শন চক্র’ও রয়েছে।

বিশাল এক বর্শার ফলার মতো বিন্যস্ত হয়ে, ‘অপারেশন বজরঙ্গ’ ফর্মেশনে উড়ে এল ছ’টি রাফাল যুদ্ধবিমান। একটি রাফাল খাড়া ৯০ ডিগ্রি কোণে উঠে গেল আকাশে। বায়ুসেনার ‘ধ্রুব’ হেলিকপ্টার ‘সিঁদুর’-এর পতাকা বয়ে নিয়ে এল। গত বছরে ভারত-পাক সংঘর্ষের পরেই গঠিত হয় সেনার ‘ভৈরব’ লাইট কমান্ডো ব্যাটেলিয়ন। সেই ‘ভৈরব’ বাহিনী, ‘সূর্যাস্ত্র’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, ড্রোন-প্রযুক্তিতে বলীয়ান নতুন ‘শক্তিবন’ রেজিমেন্ট, সেনার ঘোড়সওয়ার বাহিনী, কুকুর, চিল, ব্যাকট্রিয়ান উটের মতো ‘নীরব যোদ্ধারা’— এ বারের কুচকাওয়াজের অনেক কিছুই ‘প্রথম’।

ইতিমধ্যে বায়ুসেনা সমাজমাধ্যমে প্রকাশ করেছে ‘অপারেশন সিঁদুর ফর্মেশনে’ আরও একঝাঁক যুদ্ধবিমানের উড়ানের ভিডিয়ো। লক্ষ্যণীয় হল, ভিডিয়োর সেই উড়ন্ত বিমানগুলির ডানার তলায় ক্ষেপণাস্ত্রের ‘ছকভাঙা’ উপস্থিতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুসেনা বার্তা দিল, এমন ক্ষেপণাস্ত্রই আঘাত হেনেছে পাক জঙ্গি ঘাঁটিতে।

সশস্ত্র বাহিনীর সমরাস্ত্রের পাশাপাশি আত্মনির্ভর, প্রযুক্তি- গবেষণায় আগুয়ান ভারতের প্রদর্শন বরাবরই থাকে প্রজাতন্ত্র দিবসে। কিন্তু এ বারের কুচকাওয়াজে চোখে পড়ার মতোই উপস্থিতি ‘সিঁদুর’-এর। এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ও তাঁর রচিত বন্দে মাতরম্‌-এর। মূল মঞ্চের ঠিক সামনেই আঁকা বঙ্কিমের মুখ। বন্দে মাতরম্‌-এর সার্ধশতবর্ষের ঘোষণা। দর্শকাসনের পিছনে ফ্লেক্সে ছাপা বন্দে মাতরম্‌-এর প্রথম দু’টি স্তবক। তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যে দু’টি স্তবককে জাতীয় গান হিসেবে গ্রহণের পরামর্শ দেওয়ায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে গেরুয়া শিবির কাঠগড়ায় তুলে ফেলেছিল বলে বিরোধী শিবিরের অভিযোগ। পশ্চিবঙ্গের ট্যাবলোর ‘থিম’ও ‘বন্দে মাতরম্’। তাতে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, ক্ষুদিরাম বসু, মাতঙ্গিনী হাজরার মূর্তি। ব্রিটিশ পুলিশের অত্যাচারের অভিনয়। আবার কেন্দ্রীয় একাধিকমন্ত্রকও ট্যাবলো সাজিয়েছিল ‘বন্দে মাতরম্’-এর সুরে। পশ্চিমবঙ্গের ট্যাবলো যখন যাচ্ছে, আঙুল দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে কিছু একটা বলছিলেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডের লেয়েন। এ বারের কুচকাওয়াজের দুই প্রধান অতিথি উরসুলা এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিয়ো কোস্তা। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ভবনের ঐতিহাসিক ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে তাঁরা এসেপৌঁছন অনুষ্ঠান মঞ্চে।

তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, আজই প্রকাশ্যে এসেছে একটি গবেষণাপত্র। ‘সেন্টার ফর মিলিটারি হিস্ট্রি অ্যান্ড পারস্পেক্টিভ স্টাডিজ়’ নামে সুইৎজ়ারল্যান্ডের একটি সংস্থার এই গবেষণাপত্রটি বলছে, আকাশপথে দেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রশ্নে এই মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতীয় বিমানবাহিনীর অবস্থানই শীর্ষে। আর ঠিক এই কারণেই মাত্র চার দিনের সংঘর্ষের পরেই দিল্লির কাছে ‘সংঘর্ষবিরতি’র আবেদন রেখেছিল ইসলামাবাদ। রিপোর্টের বক্তব্য, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির বায়ুসেনার দক্ষতা এবং ক্ষমতার মতো গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলিকে সামনে এনেছে ‘অপারেশন সিঁদুর’।

কুচকাওয়াজ শেষের পরে বরাবরের মতোই দর্শকাসনের সামনে গিয়ে হাত নাড়েন মোদী। প্রধানমন্ত্রীর মাথায় ছিল মেরুন পাগড়ি। তাতে সোনালি ময়ূরপুচ্ছের নকশা।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Republic day new delhi

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy